ক্যানসার, কিডনি রোগ ও লিভার সিরোসিস প্রভৃতি ছয়টি জটিল রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর ৩০ হাজারের বেশি গরিব ও অসচ্ছল রোগীকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে সরকার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। গত কয়েক বছরে রোগীর তহবিল থেকে মোটা অঙ্কের টাকা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তছরুপ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছেসমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ২৫৯ রোগীকে অর্থ সহায়তা না দিয়ে সেই টাকায় কম্পিউটারসহ অফিসসামগ্রী কিনেছেন।
এ ছাড়া চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া জাল স্বাক্ষরে ভুয়া রোগী দেখিয়ে ও অনেককে একাধিকবার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নামে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। একই অভিযোগ রয়েছে সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ ও সাবেক সচিব মো. খায়রুল আলম সেখের বিরুদ্ধে। তারাও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগবাণিজ্য করে, ভুয়া রোগী দেখিয়ে এবং করোনাকালে প্রশিক্ষণের নামে ভুয়া বিল উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ তছরুপ করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মন্ত্রী-সচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমান অভিযোগের অনুসন্ধান করছেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে পক্ষাঘাত, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়াএই ছয় ধরনের রোগে প্রায় তিন লাখ লোকের মৃত্যু হয় এবং তিন লাখের বেশি লোক আক্রান্ত হয়। অর্থাভাবে আক্রান্ত রোগীরা এদিকে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়। অন্যদিকে তাদের পরিবার চিকিৎসাব্যয় বহন করে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সরকার এসব রোগে আক্রান্ত গরিব ও অসচ্ছল ব্যক্তিদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা দিয়ে থাকে। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। জানা গেছে, চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার জন্য প্রকৃত ও গরিব রোগীদের চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষার রিপোর্ট, চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র এবং জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের ফটোকপিসহ আবেদন করতে হয়। আবেদন যাচাই শেষে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে অর্থপ্রদান করার বাধ্যবাধকতা আছে। আক্রান্তদের সরাসরি উপজেলা সমাজসেবা ও শহর সমাজসেবা অফিসে আবেদন করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সাত কার্যদিবসের মধ্যে আবেদন যাচাই করে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকের কাছে পাঠান। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালককে সাত কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য নথি উপস্থাপন করতে হয়। পরে জেলার ডেপুটি কমিশনার ও জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকের যৌথ স্বাক্ষরে অনুমোদন হওয়ার পর তিন দিনের মধ্যে রোগীকে চেক দিতে হয়।
জানা গেছে, আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা অনুযায়ী ছয়টি রোগে আক্রান্তদের বছরে একবার অর্থসহায়তা দেওয়া যাবে। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে কয়েকজনকে একাধিকবার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ভুয়া রোগী সাজিয়ে, চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে এবং পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়াই অর্থসহায়তা দিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটও করেছে তারা।
নীতিমালা অনুযায়ী, চিকিৎসা সহায়তার জন্য অনুদান হিসেবে বরাদ্দ করা অর্থ কেবল চিকিৎসা সহায়তার ক্ষেত্রেই ব্যয় করতে হবে। সরকার আনুষঙ্গিক খাতের ব্যয় মেটানোর জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ দিয়ে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা অন্য খাতে ব্যয় করেছে।
২৫৯ রোগীর টাকা মেরে কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয় :
জানা গেছে, সরকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস প্রভৃতিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ হাজার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০ হাজার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৫ হাজার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩০ হাজারসহ মোট ৬১ হাজার রোগীর জন্য ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সেই বরাদ্দের অর্থ ২৫৯ রোগীকে টাকা না দিয়ে এক কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা টেলেক্স, ফ্যাক্স, কম্পিউটার, স্টেশনারি ক্রয় ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্মানীতে ব্যয় করেন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৫ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩০ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৯ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়।
৮১ জনকে একাধিকবার সহায়তা
নিয়মানুযায়ী, জটিল রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি বছরে একবার ৫০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা পাবেন। কেউ এক বছরে দুবার আবেদন করতে পারবেন না। কিন্তু ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮১ জনকে একবারের বেশি অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে৬৮ জনকে দুবার, ১২ জনকে তিনবার এবং একজনকে চারবার অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। ঢাকার আগারগাঁও কার্যালয়, ঢাকা জেলা কার্যালয়, যশোর, নড়াইল, রাজশাহী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এসব অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন।
রোগী নয় তবু ৩০২ জনকে অর্থসহায়তা
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ ক্যানসার রোগী হিসেবে নোয়াখালীর বাসিন্দা জিসানের রোগনির্ণয়-পরীক্ষার রিপোর্টের কপি দিয়ে চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করেন। কর্মকর্তারা তাকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দেখান। গাজীপুরের নাছিমা শাহীনের রোগসংশ্লিষ্ট টেস্ট রিপোর্ট নেই, চিকিৎসকের প্রত্যয়ন নেই; তাকেও ঢাকা অফিস থেকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়। এভাবে রোগী নয়, তবু ৩০২ জনকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, মাগুরা, খুলনা, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, মুন্সীগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলা সমাজসেবা অফিস থেকে ৫০ হাজার করে এক কোটি ৫১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
বলা আছে, প্রকৃত রোগী যেন সরকারের আর্থিক সহায়তা পায় সে জন্য রোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও রোগনির্ণয়-পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে রোগীকে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করতে হবে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কিন্তু মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অন্য রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ফটোকপি, চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া আবেদনপত্র, রোগপরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া আবেদনপত্র ও ভুয়া পরিচয়পত্রের বিপরীতে ৩০২ জনকে অর্থসহায়তা দিয়ে সরকারের এক কোটি ৫১ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করেছেন।
আবেদন ছাড়াই দুই কোটি ৯০ লাখ টাকা প্রদান
নড়াইল জেলা সমাজসেবা অফিস থেকে ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০ সালে ২৮১ জন রোগীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের নথি যাচাই করে দেখা গেছে, ৯৯ জন আবেদনই করেনি অথচ তাদের ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। একই কায়দায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে নড়াইল, বগুড়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, ঠাকুরগাঁও, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, নেত্রকোনা ও কুষ্টিয়া সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ৪৮০ জনকে ৫০ হাজার করে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তারা জালিয়াতির মাধ্যমে আবেদন ছাড়াই ৫৭৯ রোগীকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে সরকারের দুই কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি করেছেন।
সাড়ে ১৩ লাখ আত্মসাৎ
২০১৯-২০ অর্থবছরে টাঙ্গাইল, নওগাঁ, বগুড়া ও রংপুর সমাজসেবা অফিস থেকে ২৭ রোগীকে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়। আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জন রোগী শনাক্ত করবেন। কিন্তু সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নীতিমালা অমান্য করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র, প্রত্যয়নপত্র ও রোগনির্ণয়-পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়াই এ পরিমাণ অর্থ দিয়ে তা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মানিকগঞ্জ সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৯ রোগীকে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। তারা আর্থিক সহায়তা জন্য প্রতি রোগীর বিপরীতে একটি করে ছয়জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র নিয়েছেন। প্রত্যয়নপত্র যাচাইকালে দেখা গেছে, প্রতিটি প্রত্যয়নপত্রে এক চিকিৎসকের নামযুক্ত সিল থাকলেও স্বাক্ষর ভিন্ন। তারা চিকিৎসকের ভুয়া প্রত্যয়নপত্র ও স্বাক্ষর জাল করে রোগীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নামে সরকারের ৩৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা লোপাট করেছেন।
অভিযোগ মন্ত্রী-সচিবের বিরুদ্ধেও
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. খায়রুল আলম সেখের বিরুদ্ধে এতিম না থাকা সত্ত্বেও এতিমখানার নিবন্ধন, বরাদ্দগ্রহণ ও বাবার নামে ফাউন্ডেশন গঠন করে সরকারি বরাদ্দ নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে দুদকের হাতে। অভিযোগ আছে সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের বিরুদ্ধেও। মন্ত্রী থাকাকালে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করার পাশাপাশি ভুয়া রোগী সাজিয়ে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া করোনাকালে প্রশিক্ষণ কর্মর্সূচির নামেও সরকারি অর্থ লুট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে সংস্থাটির হাতে।