১১৫ কোটি ব্যারেল তেল উধাও!

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০৬:০০ এএম

হরমুজ প্রণালী আবারও উন্মুক্ত হয়েছে- এই সুখবরটি বিশ্ববাসীর জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও, তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলতি সপ্তাহে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ফলে দীর্ঘ চার মাস বন্ধ থাকার পর মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের পথটি খুলেছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই উদ্যোগ হয়তো অনেকটা দেরিতে নেওয়া হয়েছে।

অ্যানালিটিক্স ফার্ম কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ১১৫ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হারিয়ে গেছে। এই ঘাটতি বিশ্ববাজারকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং পরিস্থিতি এখন চূড়ান্ত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ ১৯৯০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি রিজার্ভ ৪৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বাণিজ্যিক মজুদগুলোও এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ভার্সাইয়ে জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল মজুদের এই নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‌‌‘যদি আপনারা বিশৃঙ্খলা দেখতে চান, তবে জেনে রাখুন, আমাদের মজুদ আর মাত্র চার সপ্তাহ চলবে।’

ট্রাম্পের এই আশঙ্কা অমূলক নয়। যদিও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার পর তেলের দাম কিছুটা কমেছে- যুদ্ধে অস্থিরতার সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যেখানে ১২৬ দশমিক ৪১ ডলারে পৌঁছেছিল, তা এখন ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে কিন্তু তেল উত্তোলনের প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।

হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া মানেই তেলের সরবরাহ রাতারাতি স্বাভাবিক হওয়া নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালীতে বসানো মাইন অপসারণ, খালি ট্যাংকারগুলোর ওই অঞ্চলে ফিরে আসা, নতুন করে উৎপাদন শুরু করা এবং সবশেষে তেল গন্তব্যে পৌঁছানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।

ওকলাহোমার কুশিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল হাবগুলো এখন ‘অপারেশনাল স্ট্রেস’ বা চরম চাপের মুখে রয়েছে। কুশিংয়ের তেল সংরক্ষণাগারের তলানিতে জমে থাকা অবশিষ্টাংশ এবং পাইপলাইনের নিম্নচাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্বজুড়ে এমন অনেক সংরক্ষণাগারই এখন ফুরিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি এই প্রণালী দ্রুত খুলে না দেওয়া হতো, তবে তা এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনত।

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দামের গতিপ্রকৃতি নিয়ে দুই ধরনের মতামত পাওয়া যাচ্ছে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের গ্লোবাল কমোডিটি স্ট্র্যাটেজির প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, ‘বাজার এখন অনেক বেশি আশাবাদী। সবাই মনে করছে সমস্যা মিটে গেছে। কিন্তু বাস্তব লজিস্টিক চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে। সরবরাহ ব্যবস্থা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার পথটি দীর্ঘ।’

কেপলারের ম্যাট স্মিথ মনে করেন, গ্রীষ্মকালীন মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের চড়া দামের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে যে সময় লাগবে, তার আগেই মজুদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, যদি আজ থেকে প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বেশি উৎপাদন করা শুরু হয়, তবুও হারিয়ে যাওয়া ১১৫ কোটি ব্যারেল তেল পুনরুদ্ধার করতে অন্তত এক বছর সময় লেগে যাবে।

তবে বিপরীত মতও রয়েছে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্যাপিটাল অ্যাডভাইজার্সের সিইও জে হ্যাফিল্ডের মতে, ওপেকের সদস্য দেশগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে উদগ্রীব, যা তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ম্যাককুয়ারি গ্রুপের কৌশলবিদ বিকাশ দ্বিবেদীর মতে, বিশ্ববাজারের মজুদ কমে গেলেও তা এখনো পুরোপুরি শূন্য হয়নি। তিনি মনে করেন, সরবরাহকারীরা এখন পুনরায় ক্রেতাদের কাছে তেল নিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামবে, যা পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করতে পারে।

সবমিলিয়ে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, তা কাটিয়ে ওঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা ও মজুদের অভাব। আগামী কয়েক সপ্তাহ বাজারের বাস্তব চিত্রই বলে দেবে বিশ্ব কত দ্রুত এই জ্বালানি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

সূত্র: সিএনএন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত