কাপ্তাই লেকের তীর ধরে চলছে সারিবদ্ধ হাতির পাল। স্বচ্ছ কাচের মতো লেকের নীল জলে এসে পড়ছে দুপুরের আলো। শান্ত জলে ভাসছে কয়েকটি জেলে নাও। আকাশে হালকা তুলোর মতো আষাঢ়ের মেঘ। দূর-দিগন্তে মিশে গেছে ছোট পাহাড়। শিল্পীরা কল্পনায় যে নিসর্গ আঁকার কথা ভাবেন এই ছবিটা ঠিক সেই রকম। ছবিটা বিজন সরকারের তোলা। তিনি ঐতিহাসিক এই ছবিটার নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য রিলিজিয়াস ফেইথ’। যে কয়েকটা ছবির জন্য মানুষজন বিজন সরকারকে চেনে এই ছবিটা তার অন্যতম। ছবিটা শৈল্পিক দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় রেললাইনের ওপর দিয়ে ট্রেন চলছে ধীর গতিতে। আর হাতিগুলোকে মনে হয় একেকটি বগি।
এই ছবি তোলার একটি চমকপ্রদ গল্প আছে। বিজন সরকার তখন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের আলোকচিত্রী। ওই সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি বাংলাদেশ সফরে এসে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শনে যান। রাষ্ট্রপতির কাপ্তাই সফরের ছবি তোলার দায়িত্ব পান বিজন সরকার। রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পাহাড়ি এলাকার ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে ২৪টি পোষা হাতি আনা হয়। অনুষ্ঠান শেষে হাতিগুলো যাচ্ছে সীতাপাহাড় সংরক্ষিত বনের দিকে। এমন দৃশ্য বিজন সরকারের চোখ এড়ায় না। তিনি খুঁজতে থাকেন একটু উঁচু জায়গা। কাছেই ছিল পর্যটনের মোটেল। ভাগ্যক্রমে মোটেলের সামনেই ছিল একটা শিমুল গাছ। শিমুল ডালের ফাঁকে বিজন সরকার ধরলেন তার মিডিয়াম ফরমেট মামিয়া ক্যামেরাটা। সবকিছু যেন আগে থেকে ঠিক করে রাখা। দুটি ছবি তুলেই বুঝতে পারলেন প্রত্যাশিত মুহূর্তটি পেয়ে গেছেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে ছবিটা বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার জেতে। ১৯৭৭ সালের জুন মাসে জাপানের টোকিও শহরে ইউনেসকোর এশিয়া সাংস্কৃতিক কেন্দ্র দ্বিতীয়বারের মতো আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার [আককু] আয়োজন করে। সেই প্রতিযোগিতায় বিজন সরকারের ছবিটা প্রথম স্থান লাভ করে। ১৯৮০ সালে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত প্রথম কমনওয়েলথ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ফেস্টিবলে ছবিটি সার্টিফিকেট অব মেরিট পায়। ১৯৮৫ সালে ডিএফপি থেকে বাংলাদেশ : লাইফ অ্যান্ড কালচার নামে যে ফটো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়, তার দুই পৃষ্ঠা জুড়ে ছবিটি ছাপা হয়। ১৯৯১ সালে ছাপা হয় দৃক পিকচার লাইব্রেরির ক্যালেন্ডারে। এরপর কত প্রকাশনায় যে ছবিটি ছাপা হয়েছে তার হিসেব কারো জানা নেই।
কাপ্তাই লেকে তোলা হাতির ছবির বর্ণনা পাওয়া যায় আলোকচিত্রী মুনেম ওয়াসিফের নেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে। ‘ফটোগ্রাফি উইদাউট ক্যামেরা : বিজন সরকার’ শিরোনামের সাক্ষাৎকারটি ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে কামরার প্রথম খন্ডে [পৃষ্ঠ : ১০৮-১৩৯] ছাপা হয়। বিজন সরকারের কাছে মুনেম এই ছবির পটভূমি জানতে চেয়েছিলেন। বিজন সরকার বলেছেন, ‘এইটা নাইনটিন সেভেনটি ফোরে।
ইন্ডিয়ার তখনকার প্রেসিডেন্ট মিস্টার ভি ভি গিরি আসছিলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে একটা মিটিং বা কিছু করতে। আমার অন্য ছবিতেও ভি ভি গিরি আছেন। খন্দকার মোশতাক খোঁড়াখুঁড়ি করতেছে, সেই ছবিও আছে। ওই খানে হাতিগুলো যখন প্রথম আসল, মিটিং হলো, তারপর ওরা রেস্টের জন্য যাওয়া শুরু করল। তো আমিও সঙ্গে সঙ্গেই দৌড় দিলাম যে দেখি হাতিগুলো কোথায় যায়, কী করে! কাপ্তাইয়ে পর্যটনের যে মোটেলটা, ওই খানে গিয়ে আমি উঠলাম। আসলে কপালটা ভালো আর কী। দেখি যে হাতি ঢুকতেছে, অনেকখানি চলেও গেছে। আমি তাড়াহুড়া করে জায়গা ঠিক করলাম। উপরে আর নিচে শিমুল পাতা, আর মাঝখানে হাতির দল। এই জায়গাগুলোন ভেরি কুইক সিলেক্ট করে ফেলছি। যেকোনো জায়গায় যেকোনো ফটোগ্রাফার যাক, আগে দেখে কম্পোজিশনটা। তো আমি ওইখানে গিয়ে ওইটা পাইয়ে গেছি। তারপর ওইখানে লাস্ট হাতি চলে গেল। এইটা সেকেন্ড এক্সপোজার। এর আগে একটা ভালো এক্সপোজার ছিল। ওইটা পর্যটনের কে কাকে দিয়ে দিচ্ছে জানি না। অপ্রত্যাশিতভাবে যেইটা বেস্ট এক্সপোজার না, সেইটাই আমার কাছে রয়েছে।’
বিজন সরকারের এই সাক্ষাৎকার পড়ে আমার আঁশ মেটে না। ঘটনার বিস্তারিত জানতে আমি ওই সময়ের সমস্ত দৈনিক পত্রিকার পাতায় চোখ রাখি। পত্রিকার প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ৩২ জন সফরসঙ্গী নিয়ে ১৯৭৪ সালের ১৫ জুন পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন। ১৭ জুন সকালে ঢাকা থেকে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার করে তিনি কাপ্তাই যান। রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন ও জাঁকজমকপূর্ণ তোরণে কাপ্তাই পর্যটন কেন্দ্রটি সুসজ্জিত করা হয়। কাপ্তাইয়ে রাষ্ট্রপতিকে আন্তরিক সংবর্ধনা জানান তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও রাঙ্গামাটি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুদীপ্তা দেওয়ান তাকে। উপজাতীয় যুবতীরা তাদের ঐতিহ্যগত পোষাকে সজ্জিত হয়ে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতির উপর ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেন। রাষ্ট্রপতিও হাত নেড়ে হর্ষোৎফুল্ল জনতার সংবর্ধনার জবাব দেন। বিকেলে রাষ্ট্রপতি কাপ্তাই লেকে নৌবিহার করেন। লেকের নীল জলরাশি ও চারপাশের সবুজ বৃক্ষরাজি মন্ডিত পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে তিনি মুগ্ধ হন। সন্ধ্যায় পর্যটন ব্যুরো মিলনায়তনে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপজাতীয় যুবতীদের জীবনধারার আলেখ্য ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্যগীত উপভোগ করে। রাষ্ট্রপতি ও তার পত্নী সরস্বতী গিরির সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। পরদিন সকালে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় ফেরেন রাষ্ট্রপতি।
এই ছবি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম খ্যাতিমান আলোকচিত্রশিল্পী ও অভিনেতা শংকর সাওজালের কাছে। শংকর সাওজাল জানালেন, ‘জীবনের শেষ সময়ে বিজনদা পল্টনের ডেফোডিলে কালার ল্যাবে প্রায় আড্ডা দিতে আসতেন। তখন ছবি নিয়ে অনেক গল্প হতো। এক বিকেলে তিনি হাতির পালের নেগেটিভটি নিয়ে কালার ল্যাবে আসেন। প্রিন্টে দেওয়ার আগে তিনি পুরনো নেগেটিভটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখছিলেন। তখন আপন তাগিদে আমি আমার লুমিক্স-থি ক্যামেরায় এই দুর্লভ মুহূর্তের কয়েকটা ছবি তুলে রাখি।’