সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি বেসরকারি ঋণে

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২১, ১২:২০ এএম

করোনা মহামারীর মধ্যে প্রণোদনার ঋণ ছাড়া ব্যাংকের নিয়মিত ঋণ বিতরণে তেমন অগ্রগতি নেই। এ কারণে প্রতি মাসেই বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি কমছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৭.৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এত কম প্রবৃদ্ধি সহসা দেখেনি বাংলাদেশ। গত এপ্রিলে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.২৯ শতাংশ। আর গত বছর মে মাসে এ খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.৮৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান ঘেঁটে এ তথ্য জানা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও জানান, এত কম প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা দেখেননি।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৪ সালে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা ২০০৯-১০ অর্থ বছরের ২৪ শতাংশে উন্নীত হয়। টানা প্রায় ১০ বছর বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্ক বা ১০ শতাংশের ওপর ছিল। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে প্রথমবারের মতো তা ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে নেমে আসে। ধারাবাহিকভাবে এ প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে গত বছর এপ্রিলে ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসে। ওই মাসে বেসরকারি ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে যায়। গত বছর জুনে তা আরও কমে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে। এরপর বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য ওঠানামার মধ্যে থাকলেও গত মে মাসে তা ৮ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, গত মে মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি না থাকলেও সরকারের ঋণে ২১.৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। গত এপ্রিলে সরকারি খাতের ঋণে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১.১৬ শতাংশ। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে সরকারের নিট ঋণ ১০ শতাংশীয় মাত্রার বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত মে মাস শেষে বেসরকারি খাতের ঋণের স্থিতি ছিল ১১ লাখ ৭১ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে সরকারি খাতের নিট ঋণের স্থিতি ১ লাখ ৯৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।

বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে গত জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ ছিল ১৪.৮ শতাংশ এবং সরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ ছিল ৩১.৭ শতাংশ। সেই হিসাবে ওই সময়ের মুদ্রানীতির এ দুই খাতের ঋণের প্রক্ষেপণের তুলনায় অর্জন অনেক দূরে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গতবার মুদ্রানীতির বিবরণী ঘোষণার জন্য কোনো অনুষ্ঠান করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবার অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে করোনা মহামারীর বিধিনিষেধ না তুলে নেওয়া হলে অনুষ্ঠান হবে না।’

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের মুদ্রানীতির কাজ চলছে জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময়ের আয়োজন করছি। এখনো নতুন কোনো বিষয় মুদ্রানীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’ সবকিছু ঠিক থাকলে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মুদ্রানীতির বিবরণী ঘোষণা করবেন গভর্নর ফজলে কবির। তবে আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি নির্ভর করছে করোনা মহামারীর সংক্রমণের প্রকোপের ওপর।

ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বেশিরভাগ ঋণই যাচ্ছে প্রণোদনার আওতায়। ফ্রেশ বা নতুন ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে অনেকেই আগ্রহ পাচ্ছেন না। কেননা করোনা মহামারী যতদিন যাচ্ছে ততই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মার্চে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর থেকে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ৪.৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের মতো প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকগুলো।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ প্রকাশনায় কভিড-১৯ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণ কাক্সিক্ষত হারে বাড়েনি। তবে প্রণোদনার ঋণ নিয়েছে অনেক ব্যবসায়ী।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এখন তো একটি অস্বাভাবিক সময়। এরকম সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ খুব বাড়ে না। কেননা তারা শঙ্কিত থাকে যে ব্যবসা হবে কি হবে না। এ কারণে সবাই কোনোরকমে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় রয়েছেন। নতুন করে কোনো উদ্যোগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা ভাবছেন না অনেক ব্যবসায়ী।’ গত বছর এপ্রিল থেকে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে ব্যবসার জন্য তুলনামূলক কম খরচে ঋণ নিতে পারছেন ব্যবসায়ীরা। তবে করোনার মধ্যে ব্যবসা বাড়াতে না পেরে অনেকেই এ সস্তার সময়ে ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে মনে করেন এ ব্যাংকার।

এদিকে ব্যবসায়ী নেতারা নতুন ঋণ নেওয়ার থেকে পুরনো ঋণ খেলাপি না করার বিষয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। এফবিসিসিআইর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন সম্প্রতি গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে দেখা করে খেলাপির ছাড় ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আহ্বান জানান। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করেও চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেয়। এ বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ২০ শতাংশ বকেয়া ঋণ পরিশোধ করা ব্যবসায়ীদের জন্য এখন খুবই কঠিন। তাছাড়া ব্যবসায়ীরা খেলাপি হয়ে পড়লে ব্যাংকের কোনো লাভ নেই। উল্টো প্রভিশনের খরচ বাড়বে। সেক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার স্বার্থে এই সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত