৩০ বছরের পুরনো প্রবিধানে আটকা শিল্পকলা একাডেমি

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ০২:৩৪ এএম

৩০ বছরের পুরনো প্রবিধানমালা এবং আইন সংশোধন না হওয়ায় শিল্পকলা একাডেমির নিয়মিত কর্মকাণ্ডে সৃষ্টি হয়েছে নানা রকম জটিলতা। পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাঝে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। একাডেমি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞ পরিচালনায় বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির মূলে রয়েছে প্রবিধান সংশোধন না হওয়া। 

১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। ১৯৯২ সালের পর আর প্রবিধানমালা সংশোধন হয়নি। কাজের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে শতাধিক নতুন পদ সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে একাডেমির কর্মযজ্ঞ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত অন্তত ৮০ শতাংশ কর্মীকে পদোন্নতি বঞ্চনাসহ নানা রকম জটিলতায় পড়তে হচ্ছে প্রবিধান সংশোধন না হওয়ার কারণে।

পদোন্নতিবঞ্চিতরা জানান, ৩০ বছরের পুরনো প্রবিধানমালায় ১ম শ্রেণির প্রোগ্রাম অফিসার, কালচারাল অফিসার, সেট ডিজাইনার, লাইট ডিজাইনার এবং ২য় ও ৩য় শ্রেণির বেশ কয়েকটি পদের পদোন্নতির কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ২০০৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর একাডেমির ৯০তম পরিষদ সভা থেকে শুরু করে অদ্যাবধি ১০৯তম পরিষদ সভায় বারবার প্রবিধানমালা সংশোধনের প্রস্তাব এলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যে ২০০৯ সালের ১৩ জুলাই ৯৭তম পরিষদ সভায় দীর্ঘদিন প্রক্রিয়াধীন থাকা প্রবিধানমালা চূড়ান্তকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময় সচিব পরিবর্তন এবং আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতায় প্রবিধান সংশোধন হয়নি। সদর দপ্তরে একাডেমির কার্যক্রম পরিচালনায় ৭১টি প্রথম শ্রেণির পদ থাকলেও গত তিন বছর ধরে ৩২টি পদই শূন্য রয়েছে। নতুন জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে প্রবিধানমালা সংশোধনের সংকটে।

১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা বিভাগে সেট ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত আছেন আলী আহমেদ মুকুল। দেড় যুগেও পদোন্নতি পাননি তিনি। আলী আহমেদ মুকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিল্পকলা একাডেমিতে ১৯৯২ সালের পর অনেকগুলো নতুন পদ যুক্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাজের পরিধিও বেড়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে ১৯৯২ সালের প্রবিধান অনুযায়ী। এ কারণে অনেকেই সারা জীবন একই পদে কর্মরত থেকে অবসরে গেছেন। সময়ের সঙ্গে একাডেমির কাজের ধরনে নতুনত্ব যুক্ত হলেও একাডেমির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে ৩০ বছরের পুরনো প্রবিধানমালায়। একাডেমির নাট্যশালায় কর্মরত ১৮ জন টেকনিক্যাল স্টাফ ও ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ১৮ বছরেও স্থায়ী হয়নি প্রবিধান সংশোধনের কারণে। এর মধ্যে একজন আছেন যিনি আর ৩ বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন। প্রবিধান সংশোধন না হলে তাকে হয়তো খালি হাতেই অবসরে যেতে হবে।

একাডেমি সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকা- আরও গণমুখী করার লক্ষ্যে সারা দেশে ৫ হাজারের বেশি জনবল সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভাগীয় শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড আরও ছড়িয়ে দিতে প্রবিধান সংশোধন করে সময়োপযোগী করা জরুরি বলে মনে করছেন একাডেমি সংশ্লিষ্টরা।

শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য রামেন্দু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রবিধান সংশোধন দ্রুত করাটা খুবই জরুরি। পাশাপাশি একাডেমির আইনও সংশোধন করা উচিত। ১৯৮৯ সালের আইন দ্বারা এখনো পরিচালিত হচ্ছে শিল্পকলা একাডেমি। ১৯৯২ সালের পর প্রবিধান সংশোধন হয়নি। আমরাও সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছি দ্রুত প্রবিধান সংশোধন করার জন্য। প্রবিধানমালা সংশোধন করা না হলে একাডেমির কর্মকাণ্ডে শৃঙ্খলা ফিরবে না।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শিল্পকলা একাডেমি আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমাকে আহ্বায়ক করে শিল্পকলা একাডেমি আইন সংশোধনের জন্য একটি উপকমিটি করা হয়েছিল। আমরা আইন সংশোধনের জন্য একটি খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু নানা কারণে আইন সংশোধন হয়নি। প্রবিধান এবং আইন সংশোধন করা হলে একাডেমির কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে মনে করি।’

একাডেমি সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে শিল্পকলা একাডেমির বেশ কিছু কালচারাল অফিসারের চাকরির মেয়াদ ১৬ বছর পূর্ণ হয়েছে। শিগগিরই প্রবিধানমালা সংশোধন করে পদোন্নতি দেওয়া না হলে অনেক কালচারাল অফিসার যাদের ইতিমধ্যে ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে তারা সারা জীবনের জন্য পদোন্নতিবঞ্চিত থাকবেন।

একাডেমি আইন ১৯৮৯ এবং প্রবিধানমালা ১৯৯২ সংশোধনের কার্যক্রম চলমান থাকায়  দ্রুত সংশোধন করে সকল ব্লক পোস্ট নির্মূল করে সকলের পদোন্নতির সুযোগের দাবি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীও মনে করেন, প্রবিধানমালা সংশোধন দ্রুত করা জরুরি। এর জন্য ব্যাহত হচ্ছে একাডেমির স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘৩০ বছরের পুরনো প্রবিধানমালায় পরিচালিত হচ্ছে একাডেমি। এতে কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। নানা রকম জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।’

এদিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন সময় সচিব পরিবর্তন হওয়ার কারণে প্রবিধানমালা সংশোধনে বিলম্ব হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রবিধানমালা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে দ্রুত সংশোধন চূড়ান্ত করার কাজ শুরু হয়েছে।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রবিধানমালা তো চাকরিবিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রাপ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দ্রুত প্রবিধানমালা সংশোধন করে সময়োপযোগী করা জরুরি। আমরা মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি, দ্রুত প্রবিধানমালা সংশোধন করা হবে। কিছুদিন আগে বাংলা একাডেমির প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমির প্রবিধানমালাও দ্রুত সংশোধন করে চূড়ান্ত করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত