করোনার চিকিৎসায় তীব্র সংকট

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২১, ১২:৫২ এএম

দেশে করোনাভাইরাস মহামারী বিস্তারের সোয়া বছর পেরোল। এরই মধ্যে গত প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ভয়াবহ সংক্রামক ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ছোবলে বিপর্যস্ত পুরো দেশ। এখন এমন কোনো জেলা-উপজেলা নেই যেখানে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েনি। এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত বুধবার দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ২৩০ জন করোনা রোগী শনাক্তের যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের দিনটিতেই মৃত্যু হয়েছে ২৩৭ জনের। নতুন আক্রান্তদের নিয়ে সব মিলিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ১০ হাজার ৯৮২ জনে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ২০ হাজার ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য জনস্বাস্থ্যবিদরা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, এসব কেবল করোনা পরীক্ষা করেছেন এবং মারা গেছেন তাদের সংখ্যা; প্রকৃত চিত্রটা আরও ভয়াবহ। কিন্তু আগে থেকেই এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে এখন গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ শয্যা তো দূরে থাক হাসপাতালগুলোতে সাধারণ শয্যাও পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে চলছে রোগীর স্বজনদের আহাজারি।

ঈদের পর থেকেই ঢাকায় করোনা হাসপাতালগুলোতে সাধারণ বেড ও আইসিইউর জন্য এই হাহাকার তীব্র আকার ধারণ করে। গত তিন-চার দিনে এই সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের সামনে ‘সিট খালি নেই’ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি টানাতে বাধ্য হয়েছে। এদিকে কেবিন ও সাধারণ বেডে ভর্তি হতে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এসব হাসপাতালে আইসিইউও খালি নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানীতে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালের সংখ্যা ৪৩টি। এসব হাসপাতালে মোট ৫ হাজার ৭৯৯টি শয্যা আছে। অন্যদিকে এসব হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ৮৮৬টি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঈদের আগের সপ্তাহের তুলনায় ঈদের পর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সাধারণ শয্যায় ২২ শতাংশ এবং আইসিইউতে ৩১ শতাংশ বেড়েছে। অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, হাসপাতালগুলো থেকে সময়মতো ও সঠিক তথ্য সরবরাহ করা হয় না।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালসহ করোনা চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের পর শুরু হওয়া রোগীদের উপচেপড়া ভিড়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই সারা দেশের মফস্বল ও গ্রামাঞ্চল থেকে আসা রোগী। একই সঙ্গে এই সময়ে নারী রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। চিকিৎসকরা বলছেন, এভাবে ব্যাপক হারে গ্রামাঞ্চলের রোগী বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো গ্রামের মানুষ আক্রান্ত হলেও তা প্রকাশ করে না, টেস্টও করে না; আক্রান্ত অবস্থায় তারা ঘোরাফেরা করে। যখন অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ে তারা উপজেলা হাসপাতালে পৌঁছায় তখন তাদের আর কিছু করার থাকে না। এভাবে গ্রাম থেকে আসতে আসতে এত দেরি হয়ে যায় যে, চিকিৎসা দিয়েও আর সুস্থ করে তোলা যায় না।

রাজধানী তথা দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলোর কর্তাব্যক্তিদের এই বিশ্লেষণ থেকে সঙ্গত কারণেই কয়েকটি প্রশ্ন জাগে। প্রথমত, উপরোক্ত পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের দফায় দফায় লকডাউন ও নানা প্রকার বিধিনিষেধ কি তবে কেবলই শহরাঞ্চলগুলোতে সীমিত ছিল? গ্রামাঞ্চলের মানুষকে কেন গত এক থেকে দেড় বছরেও সচেতন করা গেল না? দ্বিতীয়ত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও বারবার বলা হলেও এই সুদীর্ঘ সময়েও কেন দেশের ৬৪ জেলায় অন্তত একটি করে হাসপাতালকেও আইসিইউ শয্যা, হাই-ফ্লো অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর জোগান বাড়িয়ে জেলার অন্তত অর্ধেক মানুষকেও চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম করে তোলা গেল না? সারা দেশের রোগীদের কেন মুমূর্ষু অবস্থায় রাজধানীতেই আসতে হচ্ছে?

গত বছরের মার্চে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার শুরু থেকেই বারবার বলা হয়েছে, দেশের মানুষকে করোনার চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে। বলা হয়েছে, প্রয়োজনে রাজধানীসহ দেশের জেলায় জেলায় ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করা হবে। ৬৪ জেলায় আইসিইউ স্থাপন, কেন্দ্রীয় হাই-ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর সরবরাহের জন্য বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হলেও তার অর্ধেকও বাস্তবায়িত হয়েছে বলা যাবে না। মহামারীর বিশেষ পরিস্থিতি সামাল দিতে করোনাযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়েও আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। ফলে এই প্রশ্ন অমলূক নয় যে, মহামারীতে দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকা বাঁচাতে সরকার লাখো-কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দিল কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য দেশের চিকিৎসাসেবা কতটা প্রণোদনা পেল? 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত