করোনাকালে দরিদ্র মানুষ আরও বেশি দরিদ্র হয়েছে, যারা দরিদ্র ছিলেন না তারাও এখন নিয়মিত উপার্জনের অভাবে দরিদ্রের কাতারে পড়ে যাচ্ছেন। শুধু করোনার কারণেই দরিদ্র হওয়া না, এর বাইরেও দেশের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের সহযোগিতা দরকার, এরা বিভিন্ন কারণে প্রান্তিক ও অসহায় অবস্থায় আছে; তাদের এই অবস্থা থেকে আপাত রক্ষা করা ও এই জনগোষ্ঠীকে পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
আগে আমাদের দেশের মানুষের দরিদ্রতার হার ও মাত্রা এত বেশি ছিল যে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশকে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হতো। পরিসংখ্যান মতে, ১৯৯০-২০০০ সালে বাংলাদেশে দরিদ্রতার হার ছিল পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি। তবে আপাতদৃষ্টিতে সেই সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, এখন আর আগের মতো মানুষকে অন্যের কাছে হাত পাততে হয় না। যদিও ভাসমান মানুষের সংখ্যা এখনো অনেক। বিভিন্ন আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ তার বয়স, লিঙ্গ পরিচয়, গ্রামীণ-শহরে অবস্থান, প্রতিবন্ধিতা, সরকারি বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার অভাব ইত্যাদি নানা কারণে প্রান্তিকতার সম্মুখীন হন। আর তাদের এই অসহায়ত্ব কমাতেই বাংলাদেশ ২০১৫ সালে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র প্রণয়ন করে। এই কৌশলপত্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের হারকে ত্বরান্বিত করা এবং দরিদ্রতা দূর করতে এর মূল কারণকে বিবেচনায় নেওয়া। এই কৌশলপত্রে দরিদ্রতা হ্রাস করতে মানুষের জীবনচক্র ভিত্তিক অসহায়ত্বসমূহকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে এই কৌশলপত্রের মাধ্যমে সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে যাতে তারা সমাজের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো মর্যাদা নিয়ে বসবাস ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। অধিকন্তু এই কৌশলপত্র সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনাকে একটি অধিকারভিত্তিক কর্মপন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দরিদ্রতার হার হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। এর পেছনে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষিতে অগ্রগতি, পোশাক খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি এবং ক্রমবর্ধমান রেমিট্যান্সের সরবরাহ দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের ওপর যে ভূমিকা রাখতে পেরেছে তা অনুমেয়। কিন্তু করোনা আমাদের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশকে আবার দরিদ্র অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই হার ৪০ শতাংশ বা তার কাছাকাছি পৌঁছেছে। যদিও ২০২১-২২ সালে বাজেটে দরিদ্রতার হার ২০.৫ শতাংশে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছ। ২০২১-২২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কারোনাকালীন সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সামাজিক সুরক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ হারে বিনিয়োগ উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় বলা হয় বর্তমানে এই খাতে সরকারি কর্মকর্তাদের অবসরকালীন ভাতা ব্যতিরেকে ১.২ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়। এতে সামাজিক সুরক্ষা খাতে নতুন বিনিয়োগের একটা বড় অংশ শিশুদের সুরক্ষায় ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশ্ন আছে। বলা হয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে যায় এবং এর উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির একটি বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে অসহায় জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনা এবং এ জন্য বিনিয়োগ করা। আমাদের দেশে সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডকে শুধুমাত্র সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম বা সেফটি নেট হিসেবে দেখা হয়। মূলত এই দৃষ্টিভঙ্গি সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম ও এর উদ্দেশ্যকে সংকীর্ণ করে। যার মাধ্যমে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কিছু আর্থিক সহযোগিতার আওতায় আনা হয়। সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারার ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। মূলত সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সামাজিক কল্যাণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি দারুণ সম্পর্ক আছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় অসহায় জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতা, অসহায়ত্ব ও প্রান্তিকতাকে বিবেচনায় নিয়ে কর্মকৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র অনুযায়ী যেসব টার্গেট ঠিক করা হয়েছে, বলাবাহুল্য তার অনেক অংশই অর্জন করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে প্রান্তিক শিশুরা, কিশোর-কিশোরীরা, যুবারা জীবনের সম্ভাবনা থেকে দূরে থেকে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে প্রবীণ জনগোষ্ঠী মর্যাদাহীন অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। শিশুদের পুষ্টিহীনতা, প্রতিবন্ধিতা, অসহায় জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ঘাটতি, বাল্যবিবাহ ও সহিংসতার শিকার হওয়া, সীমিত সামাজিক অংশগ্রহণ, মৌলিক সেবা না পাওয়া ইত্যাদির মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছে। সর্বশেষ ২০২০ এ বাংলাদেশ সরকার কর্র্তৃক প্রকাশিত জেন্ডার সংবেদনশীলতার আলোকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বিশ্লেষণ সম্পর্কিত এক প্রতিবেদন এ নারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দিতে সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম অপর্যাপ্ত, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদার বিপরীতে। এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না।
শুধুমাত্র বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রদান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মূল নিয়ামক হতে পারে না। সামাজিক সুরক্ষার জন্য চাই দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর্মসূচি ও এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ মনোযোগ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে উন্নয়ন ইস্যুর যোগসূত্র সরাসরি। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে ধনী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। এই বৈষম্য কমানোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং এ জন্য প্রগতিশীল কর কাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরও অর্থের সংস্থান করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কোনো খয়রাতি সাহায্য নয়, এটা অসহায় মানুষের রাষ্ট্রের কাছে অধিকার। এই অধিকার আদায়ে রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন কর্মসূচির সমন্বয় খুব জরুরি। সামাজিক সুরক্ষা শুধুমাত্র আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা না বরং আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি আবার সবার সামনে নিয়ে আসছে। সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার ২০১৫ সালে যে কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছিল সরকারের অষ্টম পরিকল্পনার আলোকে তার বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
