কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ভীষণ অসুস্থ

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২১, ০৭:৪৫ পিএম

উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ভীষণ অসুস্থ। সোমবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তার ছেলে ইমতিয়াজ হাসান এ তথ্য জানিয়েছেন।

গত এক মাস ধরেই হাসান আজিজুল হক ‘ভীষণ অসুস্থ’ বলে তিনি ওই ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন।

হাসান আজিজুল হকের অসুস্থতার বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার বিকেলে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইমতিয়াজ হাসান বলেন, ‘বাবার তেমন কোনো উন্নতি নেই। বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স ওনার মূল সমস্যা। এ ছাড়া হার্টের সমস্যা আছে। পড়ে গিয়ে কোমরেও আঘাত আছে। ডায়াবেটিস আছে, প্রচুর ওষুধ খেতে হয়। শারীরিক অবস্থা খারাপ। ছয়-সাতজন চিকিৎসক চিকিৎসা দিচ্ছেন।’

ইমতিয়াজ হাসান তার বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।

ইমতিয়াজ হাসান লেখেন, ‘‘আব্বাকে নিয়ে কখনো কিছু লেখা হয়ে ওঠে না। বাকি দুনিয়ার কাছে যে রূপেই পরিচিত হন, বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আমার জন্য নিরন্তর বিস্ময় সৃষ্টি করে চলেছেন আমার বাবা। মোটের ওপর গল্পকার হিসেবেই সবাই চেনেন হাসান আজিজুল হককে। ২০০৬-এ তার বহু প্রার্থিত উপন্যাস ‘আগুনপাখি’ শেষ করে আত্মজীবনীতে হাত দিলেন। ধরে নিয়েছিলাম, আব্বার হাতে আর নতুন কোন তাস নেই! কিন্তু আশি পেরোনোর পরেও কলম থেকে নতুন নতুন কাজ বের করে আমায় অবাক করেছেন।

লিখেছেন অনুবাদগ্রন্থ (আর্নেস্ট হেমিংওয়ে: কিলিমানজারোর বরফপুঞ্জ ও অন্যান্য গল্প), ভ্রমণবৃত্তান্ত (লন্ডনের ডায়েরি) আর কবিতার বই (সুগন্ধি সমুদ্র পার হয়ে)। ‘বাপ, তোর সোনার কলম হোক’ -মায়ের দোয়া ফলেছে তার জীবনে। মানুষের দোয়াও পেয়েছেন নিশ্চয়।’’

তিনি লেখেন, ‘মাঝে মাঝে সে প্রমাণ পাই যখন ভাড়া মেটানোর সময় বৃদ্ধ অটোচালক হঠাৎ তার কুশল জানতে চেয়ে চমকে দেন অথবা শহরের রাস্তায় অচেনা কেউ এগিয়ে এসে তার কথা জানতে চান। আম্মা মারা যাওয়ার পর থেকেই সবার মাঝে থেকেও আব্বা বড় একা, তাকে আরো একা করে দিয়েছে কোভিড-১৯ অতিমারী। ছেলেবেলা থেকে দেখে আব্বার ভাত-তরকারির সাথে সাথে মানুষের সঙ্গ-হাসি-গল্প-গান দরকার হয়। সঙ্গত কারণেই এ সময় সেটা পাচ্ছেন না। কভিডের মরণকামড় এড়িয়ে অন্যান্য বার্ধক্যজনিত সমস্যা সামাল দেয়া কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা ভুক্তভোগীরা জানেন।’

ইমতিয়াজ হাসান আরো লেখেন, ‘আব্বা বয়সের ভারে শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন অনেকটা, মনটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছে একটু। আড়ালেও কি চলে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে? গত এক মাস যাবৎ তিনি ভীষণ অসুস্থ, ছোট একটি শিশুর মতোই আমাদের ওঁর পরিচর্যা করতে হয়। পরিবারের মানুষ আর গুটিকয়েক শুভানুধ্যায়ী ছাড়া আর কেউ সে কথা জানেন না। অনেকেই হয়তো মন চাইলেও তার খবর নিতে পারেননি বা যোগাযোগ করতে পারছেন না। সে জন্যই এটুকু লেখা। আপনাদের দোয়ায়, প্রার্থনায় তাকে রাখবেন।’

এই পোস্টে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ডা. মোজাম্মেল হোসেন সাজ্জাদ বকুল বলেন, ‘মৌলি, স্যার আড্ডা মিস করায় আরো দ্রুত যেন বুড়িয়ে গেলেন। আশি পেরোনোর পরেও যে প্রাণবন্ত ভাব ছিল, করোনার পর আমাদেরও বাসায় যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই প্রাণবন্ত ভাব অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন বলে ফোনে কথা বলে মনে হয়। কিছুদিন পরপর আমাকে ফোন করে বাসায় যাওয়ার জন্য স্যার যেভাবে বলেন তাতে খুব কষ্টই লাগে। কিন্তু কী করব? নিরুপায় যে। গত মাসেও আমাকে ফোন করে খুব করে যেতে বললেন। এ-ও বললেন, তুমি গেটে এসে আমাকে ফোন দেবে। আমি বেরিয়ে তোমাকে বাসায় ঢুকিয়ে নেব। আমার নতুন ফ্ল্যাটে আসার জন্য কতো ইচ্ছাই না ছিল স্যারের। কতবার যে ফোন করে আমার ফ্ল্যাটের খোঁজ নিলেন! সেটাও হলো না করোনার জন্য। করোনা আমাদের কত কিছুই না কেড়ে নিল। তবে স্যার সুস্থ হয়ে উঠুন। করোনা বিদায় নিক। আবার জমিয়ে আড্ডা হবে স্যারের সাথে’।

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। সে অনুযায়ী বয়স ৮২ পেরিয়েছে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩১ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৪ সালে অবসর নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শিক্ষকদের আবাসন এলাকা ‘বিহাস’- এ নিজ বাড়িতেই বসবাস করছেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত