শত শত ভারপ্রাপ্তে চলছে মাধ্যমিকের প্রশাসনিক পদ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:৫২ এএম

মাগুরা সদর উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা (প্রাথমিক বাদে) ১৭৫টি। এখানকার সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি। ফলে নিয়মিত পরিদর্শন হয় না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি তথ্য চাওয়া হলে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। শুধু মাগুরাই নয়, দেশের অর্ধেকেরও বেশি উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের পদ খালি পড়ে আছে দিনের পর দিন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত পরিদর্শন না হওয়ায় সারা দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়ার পাশাপাশি স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রভাব বিস্তার করেছে। সব মিলিয়ে মাধ্যমিকের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। গুণগত শিক্ষা বিস্তারে যা বড় বাধা।

মাউশি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৩৬৫টি উপজেলাতেই নেই সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। এসব পদের বেশিরভাগই ১১ বছর ধরে শূন্য পড়ে আছে। ৭০ উপজেলায় নেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। ৩২ জেলায় ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা দিয়ে চলছে জেলা অফিস। ৭০ উপজেলায় নেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। নিম্ন পদগুলোতেও বিরাট শূন্যতা। এমন পরিস্থিতিতে মাধ্যমিকের মাঠ প্রশাসন প্রায় পঙ্গু অবস্থায় আছে বলে স্বীকার করেছেন খোদ মাউশি কর্মকর্তারাই।

মাধ্যমিকের মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলে এলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তাদের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে তার নিচের সারির আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘শূন্য পদের বিষয়ে আমরা মাউশির কাছে তথ্য চেয়েছি। তথ্য পেলে ধারাবাহিকভাবে এসব পদ পূরণ করা হবে। তবে ১১ বছর নিয়োগ না হওয়ার ঘটনা দুঃখজনক।’

৩৬৫ উপজেলায় ১১ বছর খালি : মাধ্যমিকের মাঠ প্রশাসনে অসংখ্য পদ খালির বিষয়ে তথ্য জানতে মাউশির দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে যেন তথ্যের লুকোচুরি রয়েছে। কোনো তথ্যই দিতে চাননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। তবে মাউশিরই একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের উপজেলাগুলোতে দায়িত্ব পালনের জন্য সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে ১১ বছর ধরে নিয়োগ নেই। আগে এই পদগুলোর নাম ছিল ‘প্রকল্প উপবৃত্তি কর্মকর্তা’। ২০১০ সালে প্রকল্প থেকে সরকার ৪১৭ জন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ১৬০ জন সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ স্থায়ীকরণ করে। এরপর এই পদে আর কোনো নিয়োগ হয়নি। ইতিমধ্যে অনেকে এসব পদ থেকে অন্যত্র বদলি হয়েছেন। ফলে একে একে খালি হয়ে যায় ৩৬৫টি পদ।

জানা যায়, পদোন্নতি পেয়ে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদে যাওয়ার কথা। কিন্তু তাদের পদোন্নতির বিষয়টিও আটকে রয়েছে অজ্ঞাত কারণে। এ বিষয়ে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, সেসিপ প্রকল্প (সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম) থেকে যারা উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত আছেন, তারা শূন্য পদগুলোতে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এসব কর্মকর্তা বিদ্যালয়ের দুর্নীতিগ্রস্ত ম্যানেজিং কমিটিকে উৎসাহিত করে বলে শিক্ষকদের অভিযোগ। এমনকি এমপিও খাতেও অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন পদগুলো ফাঁকা থাকায় মাঠপর্যায়ে সরকারের শিক্ষা প্রশাসন গতি হারাচ্ছে।

৩২ জেলা ও ৭০ উপজেলায় নেই শিক্ষা কর্মকর্তা : মাউশি থেকে জানা যায়, দেশের ৩২ জেলায় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নেই। এসব পদ অনেক দিন ধরে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে চলছে। এছাড়াও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য ৭০ উপজেলায় । এ বিষয়ে মাউশির (মাধ্যমিক উইং) একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি ৫ হাজারের বেশি শিক্ষক পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র শিক্ষক হয়েছেন। আগে সুযোগ না থাকলেও এখন সিনিয়র শিক্ষকদের উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার চেয়ারে বসানোর সুযোগ আছে। এর মধ্যে অনেক শিক্ষক এই পদে আসার জন্য আবেদনও করেছেন। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর।

পদ পূরণে উদ্যোগ নেই : নিয়ম অনুযায়ী শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি দেখভাল করার কথা সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি)। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাউশি চাইলেও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের দিয়ে শূন্য পদ পূরণ করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে বেশকিছু বাধা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী জেলা বা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদে যান সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদও দীর্ঘদিন যাবৎ খালি রয়েছে। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে। এ প্রসঙ্গে যশোরের সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্বাস উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধুমাত্র কর্মকর্তা নয়, চতুর্থ শ্রেণির একাধিক কর্মচারীর পদ এ জেলায় (যশোর) দীর্ঘদিন শূন্য আছে। আর জনবল ঠিকঠাক না থাকলে জনবল কাঠামোতে এর প্রভাব পড়বে।’

শূন্য পদে নিয়োগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা) মাহবুব হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ গোলাম ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষা প্রশাসনের  মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার পদ খালি আছে এ কথা সত্য, তবে পদগুলোতে কাজের ঘাটতি হচ্ছে না। কেউ না কেউ দায়িত্ব পালন করছে।’

দীর্ঘ সময় ধরে পদ শূন্য থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকদের জেলা উপজেলায় যাওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যায়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে হেড টিচারের পদেও লোক নেই। সহকারী প্রধান শিক্ষকদের এ পদে আসতে এখনো বাধা আছে। সিনিয়র শিক্ষকদেরও কিছু বাধা আছে। এসব জটিলতা দূর করতে কিছু কাজ চলছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত