অফিসে বসে ই-অরেঞ্জের গ্রাহক বাগাতেন সোহেল রানা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:১০ এএম

বনানী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) বরখাস্ত হওয়া সোহেল রানার সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেকশন থাকার তথ্য মিলেছে। তার সঙ্গে অপরাধীদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্য থানায় আসতেন। দীর্ঘ সময় ধরে নিজকক্ষে অপরাধীদের সঙ্গে গল্প-গুজব করতেন তিনি। আটক মডেল পিয়াসার সঙ্গেও ছিল তার গভীর সখ্য। পাশাপাশি পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে ছিল তার সুসম্পর্ক। অভিযোগ উঠেছে, তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সোহেল রানা ছিল অনেকটা বেপরোয়া। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি সংস্থা সোহেলের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়ে এসব তথ্য পেয়েছে বলে একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।

এদিকে সোহেলকান্ডে পুলিশের ইমেজ ভূলুণ্ঠিত হওয়ায় টনক নড়েছে সদর দপ্তরেরও। তাকে অবিলম্বে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা না হলে পুলিশের ইমেজ সংকটের ঢেউ যে সীমান্তের ওপারে গিয়ে ছড়াবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিষয়টি ইতিমধ্যেই ওপার বাংলার মিডিয়াতেও চাউর হয়ে গেছে। এ অবস্থায় তাকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোহেলকে ফেরত দিতে পুলিশ সদর দপ্তর দুই দফা চিঠি দিয়েছে। পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবেও তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে এখনো কিছুই জানায়নি ভারত। তবে পাওয়ার ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তর আশাবাদী।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ই-অরেঞ্জের প্রতারিত গ্রাহকরা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে অবিলম্বে তার নামে-বেনামে থাকা গাড়ি-বাড়ি ও ব্যাংকের হিসাব তলব করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি সোহেল রানা থানায় বসেই গ্রাহকদের ই-অরেঞ্জের প্রোডাক্ট কেনার কাজে উদ্বুদ্ধ করতেন। বিত্তবান-প্রভাবশালী মহলে তার অবাধ ও সর্বাত্মক যাতায়াত এবং যোগাযোগ থাকায় বেশ অনায়াসেই ই-অরেঞ্জের মার্কেটিং কাজ চালিয়েছেন। তিনি অন্তত ১০০ নারী-পুরুষকে ই-অরেঞ্জের গ্রাহক করতে সক্ষম হন। বনানী থানায় তার কাছে মামলার তদন্তের বিষয়ে যারাই যোগাযোগ করতেন তাদেরই তিনি ই-অরেঞ্জের গ্রাহক হয়ে লাভবান হওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা জোগাতেন। মামলার বাদী-বিবাদীদের অনেকেই চক্ষু লজ্জার খাতিরে তার গ্রাহক হতেন। ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এখন প্রতারিতরা মুখ খুলছেন। তুহিন নামে এক যুবক দেশ রূপান্তরকে জানান, গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকার লোকদের যাদের চিনতেন, তাদেরই এ প্রোডাক্ট কেনার জন্য পীড়াপীড়ি করতেন সোহেল রানা। এভাবেই তিনি তার চেয়ারকে প্রতারণার কাজে লাগিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনানী থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টর জানান, সোহেল রানার সঙ্গে বিতর্কিত মডেল পিয়াসারও যোগাযোগ ছিল। মাস ছয়েক আগে এক রাতে পিয়াসার আস্তানায় তার বাড়াবাড়ি দেখে দেশের শীর্ষ একজন শিল্পপতির তরুণ ছেলে আপত্তি তুলে তাকে সেখান থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে পিয়াসা নিজেই সোহেলের ক্ষমতাও কম নয় মন্তব্য করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। তিনি আরও বলেন, সোহেল রানার সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডেও কানেকশনও ছিল। গুলশান ও বনানী এলাকার অপরাধীরা তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। এমনকি তারা থানায়ও আসত। তিনি কাউকেই তোয়াক্কা করতেন না। নিজেকে খুবই প্রভাবশালী বলে জাহির করতেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও তিনি রাতে থানা ত্যাগের সময় এক সহযোগীকে নিশ্চিত করেছেন তার কিছুই হবে না। কিছুদিন মানসম্মান নিয়ে পর্দার আড়ালে থাকতে হবে।

সূত্র জানায়, সোহেল রানার সঙ্গে  পুুলিশের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ছিল গভীর সখ্য। যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অল্প সময়ের মধ্যে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যান। সম্পদ গড়ার পাশাপাশি সোহেল রানা বিয়েতেও রেকর্ড গড়েছেন। এমনকি বনানী থানার সাবেক ওসি ফরমান আলীকে বিমানবন্দর থানায় বদলি করার সময় সোহেলই তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য বেশ দৌড়ঝাঁপ করেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। পরে তিনি গুলশান থানায় ওসি হতে চেয়েছিলেন। সেখানেও ব্যর্থ হন।

সোহেল রানার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সাবেক পুলিশ প্রধান নুরুল আনোয়ার বলেছেন, পুলিশের বিরুদ্ধে মানুষের একটা কমন অভিযোগ হচ্ছে এরা ঘুষ খায়। কিন্তু থানার চেয়ারে বসে সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা করা কিংবা প্রতারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঘটনা এই প্রথম। যেটা গোটা পুলিশ বিভাগকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সরকারের উচিত সোহেল রানাসহ এ ধরনের আরও যেসব পুলিশ সদস্য প্রাতিষ্ঠানিক অপকর্মে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। আর না হয় পুলিশকে আরও বড় খেসারত দিতে হবে। কারণ বিষয়টি শুধু দেশের ভেতরই পুলিশের বদনামি করেনি, বিদেশে ধরা খেয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বাংলাদেশ পুলিশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পুলিশের উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে ঠিক এ ধরনের ঘটনা অনেক বড় সর্বনাশ বলতে পারেন। পুলিশ টের পাবে দূরের কথা, তাদের ধারণাতেও আসেনি। একজন পরিদর্শক কী করে থানায় বসে ই-কমার্সের বাণিজ্য করতে পারেনÑ অর্ধেক দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন? কেউ অভিযোগ না করলে তো পুলিশের করোরই সন্দেহ হওয়ার কথা নয়। সাধারণত পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নাম বলেন, বদনাম বলেন, অভিযোগ বলেনÑ তা হচ্ছে টাকা-পয়সা খাওয়া, হয়রানি করা, কিংবা নারী কেলেঙ্কারি বা অন্যান্য ধরনের অপরাধ করা। সাম্প্রতিককালে পুলিশের কিছু ঘটনা কিছু সদস্য করেছে, প্রতিটিই স্বতন্ত্র। একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। কিন্তু সোহেল রানা যেটা করেছে সেটা বিশ্বের আর কোনো পুলিশ করেনি।

গতকাল মঙ্গলবার সর্বশেষ জানা যায়, সোহেল রানাকে ফেরত দিতে ঢাকা থেকে পাঠানো চিঠির এখনো কোনো জবাব দেয়নি দিল্লি।  সোহেল রানাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোকে (এনসিবি) ওই চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশের এনসিবি শাখা থেকে রবিবার ভারত এনসিবিকে চিঠি পাঠানো হয়। গতকালও আবার অতিরিক্ত তথ্য সংযুক্ত করে চিঠি পাঠানো হয়। যদিও গতকাল পর্যন্ত ভারতের এনসিবির পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুলশান ডিভিশনের পুলিশের উপকমিশনারের একটি চিঠি ডিএমপি কমিশনারের মাধ্যমে ফরওয়ার্ডিং হয়ে আমাদের কাছে এসেছে। সেখানে বরখাস্ত হওয়া সোহেল রানার ব্যাপারে মামলাসহ নানা তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। সেগুলো সংযুক্ত করে আমরা আজ (গতকাল) দুপুরে আরেকটি চিঠি দিল্লি এনসিবিকে পাঠিয়েছি। সোহেল রানা সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছেনÑ ওই দেশের আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। তবে আমরা পুলিশের পক্ষ থেকে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার, বাংলাদেশ পুলিশ টু ভারত পুলিশ সেটা আমরা করছি। যদিও সোহেল রানাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কার্যকরী উদ্যোগটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে।

জানা গেছে, গত শুক্রবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের চ্যাংড়াবান্দায় দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে ধরা পড়েন সোহেল রানা। শনিবার ভারতীয় একটি গণমাধ্যমের খবরে প্রথম ব্রেকিং নিউজ দেওয়া হয়। বিএসএফের হাতে আটক সোহেল রানা গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারী বহুল আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের পৃষ্ঠপোষক। ভারতে রিমান্ডে থাকা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা অপরাধমূলক একাধিক কাজে নিজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্বীকার করেছেন। গা ঢাকা দেওয়ার জন্যই ভারতে প্রবেশ করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত