জগতে পরিবর্তনই একমাত্র সত্য। রাজনীতিও তার ব্যতিক্রম নয়। এক সময় রাজনীতিতে মত প্রকাশ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, জনমত গঠনের চিরাচরিত যে প্ল্যাটফর্ম ছিল, তা বদলে গেছে অনেকখানি। জনমত তৈরিতে এবং পরিবর্তনে মিটিং, মিছিল, লিফলেট, দেয়াল লিখন কিংবা মানববন্ধনের চেয়েও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অনেক বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখানে প্রত্যেকে যার যার মত প্রকাশ করতে পারে এবং তা ছড়িয়েও যায় অতি দ্রুত। কয়েক বছর আগের ‘আরব বসন্ত’ কিংবা হালের ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’-এর মতো আন্দোলনেরও সূচনা হয়েছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই। সুতরাং এই মাধ্যমকে কম গুরুত্ব দেওয়ার কিংবা আরও নির্দিষ্ট করে বললে সরকারগুলোর কম ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। মাঠের বা রাজপথের রাজনীতিবিদ বলে কিছু রাজনীতিবিদকে চিহ্নিত করার একটা চর্চা আছে আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। এর মানে আমরা বুঝি। কিন্তু মাঠ শব্দটির ব্যাপ্তি এখন আর আগের জায়গায় নেই, বিস্তৃত হয়েছে ডিজিটাল মাঠ পর্যন্ত। সরকারের এই মাঠের জন্য আটঘাট বেঁধে নামাই প্রমাণ করে এই মাঠ এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই মাঠ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি চলছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে। আরেকটি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশেষ করে সরকারি দলের এই প্রস্তুতি চোখে পড়ার মতো। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি বিটিআরসি সামাজিক মাধ্যম মনিটরিংয়ের জন্য একটি সেল তৈরি করেছে এবং তাতে কর্মী নিয়োগ করেছে। বিভাগটিকে বড় করার জন্য আরও জনবল নিয়োগ করা হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য, সরকার এবং রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট এবং পোস্টদাতাকে খুঁজে বের করা।
সামাজিক মাধ্যম মনিটরিংয়ের জন্য এই সংস্থার সেল গঠন করাকে অভিনব বলে মনে হবে কারণ বেশ আগে থেকেই পুলিশ, র্যাব এবং সবগুলো গোয়েন্দা সংস্থার এই ধরনের বিভাগ আছে এবং তারা সামাজিক মাধ্যমে মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছে। তাহলে জনগণের করের টাকায় আরেকটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার এমন একটি সেল গঠনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? এর জবাব পাওয়ার জন্য সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নেওয়া যাক। কয়েক দিন আগের খবরে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক লাখ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের সমন্বয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ করছে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটি। এই লক্ষ্যে সারা দেশে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করছে দলটির এই উপকমিটি। এই কর্মযজ্ঞের উদ্দেশ্য ‘গুজব’ এবং ‘অপপ্রচার’ ঠেকানো, যদিও ‘গুজব’ এবং ‘অপপ্রচার’ এর সংজ্ঞা কারোরই জানা নেই। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সেই সভায় বলা হয়েছে, বিরোধীরা এখন রাস্তায় টিকতে না পেরে সামাজিক মাধ্যমে অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছে এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের সক্রিয়তা আরও বাড়বে। কীভাবে একের পর এক কর্মশালার মাধ্যমে ১০ হাজার ‘মাস্টার ট্রেইনার’ তৈরি করা হবে এবং তাদের মাধ্যমে ট্রেনিং দিয়ে কীভাবে এই সংখ্যা ১ লাখে নিয়ে যাওয়া হবে তার পথনির্দেশ পত্রিকায় এসেছে। তবে ঠিক কীভাবে এই অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা ‘গুজব’ এবং ‘অপপ্রচার’ ঠেকাবে, সেটার বিস্তারিত রিপোর্ট পত্রিকায় না এলেও সাম্প্রতিক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এটা আমরা যৌক্তিকভাবেই অনুমান করতে পারি।
আওয়ামী লীগের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তৈরি করা প্রসঙ্গে বিরোধী দলের রাস্তায় টিকতে না পেরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আসলে এই দেশে এখন বিরোধী দল দূরে থাকুক, নিতান্ত সামাজিক সংগঠনকেও রাস্তায় টিকতে দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষজনের নেতৃত্বে যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল এমনকি সেটাকেও রাস্তায় পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন কোনোভাবেই বিরোধী দলের কিছু ছিল না। কিন্তু সেই আন্দোলনকেও দমন করা হয়েছে ভয়ংকরভাবে। এরপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনটি কী নৃশংসভাবে দমন করা হয়েছে সেটাও নিশ্চয়ই ভুলিনি আমরা। এসব আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করায় পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগের ক্যাডাররাও রাস্তায় নেমেছিল এবং পরিচয় লুকানোর জন্য তারা হেলমেট পরে নেমেছিল এবং তাদের হাতে ছিল হাতুড়ি, লাঠি কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র। তখন থেকেই সাধারণ মানুষের কাছে এরা ‘হেলমেট বাহিনী’ হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘অক্সিলিয়ারি ফোর্স’ হিসেবে এই ‘হেলমেট বাহিনী’ই প্রথাগত মাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সরকারের হাতে রেখেছে। আওয়ামী লীগ না বললেও ‘সাইবার বাহিনী’ ডিজিটাল মাঠটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কী কী করতে পারে, সেটা আমরা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে খুব সহজে বুঝতে পারি। ব্যক্তি এবং সরকারি দলের কাছে ‘অপরাধের’ ধরন অনুযায়ী নানা রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তারা নেবে। কারও স্ট্যাটাসে ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালিগালাজ চলতে পারে। অনেকে মিলে রিপোর্ট করে কারোর ‘আইডি’ বন্ধ করে দিতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসে থাকা মানুষদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা হবে। এদের হাতের কাছে পাওয়া যায় না বলে এই ব্যবস্থা। হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন দেশে থাকা ‘গর্হিত অপরাধ করা’ মানুষদের ক্ষেত্রে দুই রকম ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ফেইসবুক স্ট্যাটাসের জেরে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে। আর অপরটি হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ফাঁসিয়ে দেওয়া।
রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা তো যে কেউ করতেই পারে। কারও তথাকথিত মানহানির জন্য নিজেকে মামলা করতে হয় না, তার হয়ে মামলা করে দিতে পারে যে কেউ। আলোচিত সাংবাদিক প্রবীর শিকদার কিছুদিন আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মানহানির মামলা থেকে মুক্তি পেলেন। যার মানহানি হয়েছে বলে এই মামলা, সেই আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ কিন্তু মামলাটি করেননি। করেছেন অন্য একজন লোক। খুব দ্রুতই এরকম অসংখ্য মামলার জালে জড়াতে দেখা যেতে পারে সরকারবিরোধীদের। সামনের নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের প্রস্তুতির আরেকটা বড় লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। পত্রিকায় এসেছে নতুন এক আইন তৈরি হচ্ছে ‘পারসোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ নামের। আইনটির প্রাথমিক তথ্য পড়ে মনে হলো ‘একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর’ প্রবচনটির কথা। এক ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের নিপীড়নেই এই দেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে আর এখন তার সঙ্গে দোসর হিসেবে আনা হচ্ছে ‘পারসোনাল ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট’। এই আইনের আওতায় বাংলাদেশের নাগরিকদের ডেটা বাংলাদেশের ভেতরে রাখার নামে ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, গুগল, টুইটার, আমাজনসহ সব টেকজায়ান্টকে বাংলাদেশে সার্ভার স্থাপন করতে হবে। আবার সেখান থেকে যেকোনো তথ্য সরকার নিতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারবে। পুরো বিষয় নিয়ন্ত্রণ করবেন সরকারের নিয়োগ দেওয়া একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার অধীনে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তথ্য সংগ্রহের কাজ করতে না পারলে এ দায়িত্ব তৃতীয় কোনো পক্ষকে দিয়ে করাতে পারবেন তারা। সরকারের জন্য কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলে বা সরকার যৌক্তিক মনে করলেই ব্যক্তিগত তথ্য হস্তগত করতে পারবে। ব্যক্তিগত তথ্যের বাইরেও প্রয়োজনে স্পর্শকাতর তথ্য নেওয়ার সুযোগ আছে। যেমন জাতিগত, ধর্মীয়, দর্শনগত ও অন্যান্য বিশ্বাস, যেমন: রাজনৈতিক মতাদর্শ, রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ, ট্রেড ইউনিয়ন, সংগঠন, বায়োমেট্রিক অথবা জেনেটিক ডেটা অথবা ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও যৌনজীবন সম্পর্কিত তথ্য।
কোনো কারণে যদি ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয় বা কোনো অসংগতি দেখা দেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আদালতে যেতে পারবেন না। তাকে অভিযোগ করতে হবে ডিরেক্টর জেনারেলের কাছেই। ডিরেক্টর জেনারেল যদি আবার দেখেন, সরল বিশ্বাসে তার অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব ফাঁস করে দিয়েছেন, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। তবে আর কেউ ফাঁস করলে ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ পাবেন। কিন্তু দেশে একটা আইন হচ্ছে যেখানে অবিশ্বাস্যভাবে সংক্ষুব্ধ মানুষের আদালতে যাওয়ার অপশন কাগজে-কলমেও রাখা হচ্ছে না! নির্বাচন নিয়ে গত কয়েক বছরে নানান অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হয়েছে এদেশের রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারের। তাই সামনের নির্বাচন ঘিরে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আছে নানা জল্পনা-কল্পনা। এই জল্পনা-কল্পনাকে অনেকটাই মূর্ত করে তুলেছে এক লাখ জনের ‘সাইবার বাহিনী’ ডিজিটাল মাঠে ছেড়ে দেওয়া, তথ্য নিয়ন্ত্রণে এবং বিরোধী মত চিহ্নিতকরণে পুলিশ, র্যাব গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিটিআরসি’র ব্যবহার, ‘পারসোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ এর নামে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সরকারের কব্জায় নেওয়া ইত্যাদি। এই দমবন্ধ করা ভীতিকর সময়ে দাঁড়িয়ে দিব্য চোখে দেখছি সামনের কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার দিনগুলোকে।
লেখক আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ
