দেশের ক্রিকেট গড়ার কারিগর জালাল আহমেদ চৌধুরী

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫৭ পিএম

জালাল আহমেদ চৌধুরী। আমরা তাকে জালাল ভাই বলেই ডাকতাম। জালাল ভাইয়ের অনেক পরিচয় ছিল। নিজে একসময় ক্রিকেট খেলেছেন, ক্রিকেট খেলা শিখিয়েছেন আবার ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন। সবকিছু ছাপিয়ে তিনি আমাদের কাছে হয়ে আছেন প্রিয় জালাল ভাই হিসেবে। জালাল ভাই ক্রিকেট খুব ভালো বুঝতেন। একটা বিষয় খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমাদের দেশের ক্রিকেটাররা জালাল ভাইকে ‘স্যার’ বলে ডাকে। তার প্রতি শ্রদ্ধার জায়গাটা ছিল ওই পর্যায়ের। তিনি সবার বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেন। তাকেও সবাই শ্রদ্ধা করত।

জালাল ভাইয়ের সঙ্গে সবশেষ কথা হয়েছিল গত চার-পাঁচ দিন আগে, তিনি অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি সব বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। এবারও তেমনই হয়েছিল। তবে তার সঙ্গে যে আর কোনো দিন কথা হবে না, সেটা তখন বুঝতে পারিনি। কিছুদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। আমাদের আশা ছিল তিনি সুস্থ হয়ে ফিরবেন। আবারও আমাদের সঙ্গে ক্রিকেটের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মিলিত হবেন, আড্ডার মধ্যমণি হয়ে গল্প বলবেন। তার প্রিয় বিষয় ক্রিকেট নিয়ে লিখবেন। কিন্তু সেটি আর হবে না, সেটা ভাবতে খারাপ লাগছে। ধানম-ির ৪ নম্বর মাঠে গেলে জালাল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো। তিনি ক্রিকেটের খুঁটিনাটি বিষয়ে আলাপ করতেন। দলের খেলোয়াড়দের শক্তি ও সামর্থ্য নিয়েও কথা বলতেন। আবার কোনো খেলোয়াড় কোনো সমস্যায় পড়লেও তার খোঁজ নিতেন।

জালাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়ছিল বোধহয় জাতীয় দলের কোনো একটা ক্যাম্পে বা ওই রকম কোনো প্রোগ্রামে। এরপর তো বিভিন্ন সময়ে তাকে পেয়েছি। তবে তখন জাতীয় দলের ক্যাম্পিং অল্প সময়ের জন্য হতো তুলনামূলক, তাই খুব একটা পেতাম না তাকে। তবে তার পরামর্শ পেয়েছি প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি যখন সক্রিয় কোচ ছিলেন বা অল্প সময়ের জন্য কাজ করতেন ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে তখনো তাকে পেয়েছি। জালাল ভাই বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের সঙ্গে বেশ আন্তরিকভাবে জড়িত ছিলেন। এটা কেবলই পেশাদারির জায়গা ছিল না তার কাছে, অনেক সময় মনে হয়েছে তিনি ক্রিকেট নিয়ে দিনরাত ভাবেন, তার এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছিল ক্রিকেট।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার জালাল ভাইয়ের হাতে গড়া বলা যেতে পারে। দেশের ক্রিকেটের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল যে সাফল্য, সেই ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি বিজয়ী দলটির সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। সেই দলটির প্রাথমিক প্রস্তুতি তার অধীনেই হয়েছিল। এরপরে অবশ্য কোচ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন গর্ডন গ্রিনিজ।

গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে ঢাকা ক্রিকেট লিগে খেলেছিলেন জালাল ভাই। এরপর শুরু করেন ক্রিকেট কোচিং ও সাংবাদিকতা। বাংলাদেশের ক্রিকেট কোচ হিসেবে নিয়েছেন উচ্চতর প্রশিক্ষণ। মোহামেডান, কলাবাগানসহ বেশ কয়েকটি দলের কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। তবে তার সঙ্গে সরাসরি ক্লাব ক্রিকেটে আমার কখনো থাকা হয়নি। আমি যখন জাতীয় দলে খেলেছি তখন দেখা হলে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলতেন, ফোন করতেন। দেশের ক্রিকেট নিয়ে তিনি সব সময়ই ভাবতেন।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রাথমিক দিনগুলোতে যে কয়জন ক্রিকেট কোচ নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন, তিনি তাদের অন্যতম। অনেক কোচ আছেন, যারা খেলোয়াড়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। কিন্তু জালাল ভাই ওরকম মানুষই ছিলেন না। তিনি প্রথমে ভালোভাবে  বোঝাতে চেষ্টা করতেন। জালাল ভাইকে আমি কখনো রাগ হতে দেখিনি।

জালাল ভাইয়ের লেখার আমি ভক্ত ছিলাম। তার লেখা পড়েও অনেক সময় অনেক কিছু শিখতে পরতাম। ক্রিকেট বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল খুবই ভালো। তিনি খেলোয়াড়দের শক্তি সম্পর্কে ভালো জানতেন। কার কোনখানে শক্তির জায়গা, কোনখানে দুর্বলতা, সেসব ভালো বুঝতে পারতেন। দেশের সেরা ক্রিকেট লেখক ছিলেন তিনি। যারা সাংবাদিকতা করেন এ বিষয়ে তারা আরও ভালো বলতে পারবেন, তার লেখা দেশের ক্রিকেট সাংবাদিকতাকে কীভাবে সমৃদ্ধ করেছে। দেশের ক্রিকেটবিষয়ক যেকোনো ঐতিহাসিক তথ্য জানতে হলে সূত্র হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

একটা সময় বয়সজনিত কারণে সরাসরি কোচিং থেকে অবসরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্রিকেটকে ভালোবেসে আবার দেশে ফিরে এসেছিলেন। কয়েক বছর ধরে ফেইসবুকে খুব সক্রিয় ছিলেন তিনি। ক্রিকেট বিষয়ে অনেক লিখেছেন এখানে। এখন জালাল ভাই মারা যাওয়ার পরে ফেইসবুকে অনেকেই তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন। নানা টুকরো ঘটনা লিখছেন। জালাল ভাই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কতটা প্রভাবিত করেছিলেন এসব স্মৃতিচারণ থেকেও তা বোঝা যায়।

আগেই বলেছি, তার লেখার আমি ভক্ত ছিলাম। ক্রিকেটকে আমরা খেলা হিসেবে দেখি। জালাল ভাই শুধুই খেলা হিসেবে দেখতেন না কখনো। তিনি মনে করতেন এটা একটি শিল্প। এটা একটি জীবনবোধ। তিনি যখন লিখতেন, তখন ক্রিকেটকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতেন।

জালাল ভাই ক্রিকেটার ছিলেন, কোচ হয়েছিলেন। আবার করেছেন ক্রীড়া সাংবাদিকতা। ক্রিকেটের বিশ্লেষণে তার সমকক্ষ আরও কাউকে আমি কাছাকাছি দেখিনি। সরাসরি কোচিং কিংবা সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার পরও জালাল ভাই ক্রিকেটের সঙ্গেই জড়িয়ে থেকেছেন নানাভাবে। এই খেলাটার প্রতি তার আবেগ, ভালোবাসা আর আন্তরিকতার চিহ্ন কখনো শেষ হবে না। বাংলাদেশের ক্রিকেট এবং ক্রিকেটাররা কখনো জালাল ভাইকে ভুলতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে জালাল আহমেদ চৌধুরী, আমাদের জালাল ভাইয়ের নাম জড়িয়ে আছে, যা কখনো শেষ হওয়ার না।

লেখক :  বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক, নির্বাচক, জাতীয় ক্রিকেট দল

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত