দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মামলার জালে বিদ্ধ নেতাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়ে জেলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার অধিকাংশই গায়েবি মামলা। এসব মামলার বিচার শুরু হলে বিষয়টি আদালতে তুলে ধরার জন্য দলের আইনজীবীদের নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির হাইকমান্ড। গতকাল সোমবার রাতে দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেন বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি সূত্র।
গতকাল রাতে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে নিম্ন আদালতে দলের নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনা করেন এমন আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। বৈঠক শুরু হয় সন্ধ্যা ৭টায় এবং শেষ হয় রাত সাড়ে ৮টায়।
এর আগে গত ১৪, ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর এবং ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর দলের নেতাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করে বিএনপির হাইকমান্ড। সিরিজ বৈঠকে নেতারা আগামী দিনে নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে যাওয়ার পরামর্শ দেন। দলের হাইকমান্ডও আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানায়। এ অবস্থায় মামলার জালে বিদ্ধ নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে এই ভেবে যে, আন্দোলন সংগ্রাম শুরুর আগে সরকার হয়তো নেতাকর্মীদের জেলে পুড়বে। এ অবস্থায় নেতাকর্মীদের অভয় দিতে আইনজীবীদের সঙ্গে দলের হাইকমান্ডের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ছাড়াও অংশ নেন ঢাকা বারের বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা।
বিএনপির দপ্তরসংশ্লিষ্ট নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সর্বশেষ ১ লাখ ২ শতাধিক মামলায় সারা দেশের ৩৫ লাখ ৫ শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এসব নেতার অধিকাংশই মিথ্যা মামলা।’
বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকের শুরুতে দলের হাইকমান্ড আইনজীবীদের কাছে মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। আইনজীবীরা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্যান্য নেতার মামলার বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেন। এ সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আইনজীবীদের বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে হওয়া মামলাগুলো গায়েবি। এটা আপনারা যেমন জানেন তেমনি জানে দেশের জনগণ। এমন অনেক মামলা আছে যার বাদী জানেনই না ঘটনা কিংবা ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে। তাছাড়া ঘটনাস্থলে ছিলেন না এমন নেতাদের নামেও মামলা দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় আদালতে যথাযথভাবে তুলে ধরবেন। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ব্রিফ করে জনগণকে অবহিত করবেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের তৃণমূল পর্যায়ের এমন কোনো নেতা নেই যার নামে মামলা নেই। বিএনপি যখন আন্দোলন সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরনো মামলায় চার্জশিট দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। মূলত তারা আন্দোলন সংগ্রাম ভন্ডুল করার হীনপরিকল্পনা, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এসব করছে। তবে আমরা এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আন্দোলন সংগ্রাম সফল করব।’ আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
বিএনপি নেতারা জানান, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-৫ ফাতেমা ফেরদৌসের আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য নেতারা। বিস্ফোরক ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২০১৮ সালে রাজধানীর পল্টন থানায় এই মামলাটি করা হয়েছিল। মামলা নম্বর ৬(১)১৪। মামলায় দন্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৯, ৩৫৩, ৩৪১, ৩৩২, ৩০৭, ৪৩৫, ৪২৭, ১০৯, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের ৩/৬ ধারাতেও অভিযোগ করা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করে গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১৮ আগস্ট রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির নবগঠিত ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানসহ ১৫৩ নেতাকর্মীকে আসামি করে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করা হয়। একই মামলায় আসামি করা হয় ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে। অথচ তিনি তখন দেশে ছিলেন না। মামলায় পরিকল্পিতভাবে নাশকতার চেষ্টা, পুলিশের ওপর হামলা করে আহত করা এবং গাড়ি ভাঙচুর করে জানমালের ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ পুলিশ বিনা উসকানিতে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে আহত করে। পাশাপাশি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও বিস্ফোরক আইনে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন থানায় দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। অধিকাংশ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়েছে। অনেক মামলা সাক্ষ্য ও বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এসব মামলা থেকে নেতাকর্মীদের কীভাবে রক্ষা করা যায়।’
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সারা দেশে নাশকতার ঘটনা ঘটে। ওই সময় বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। ভোটের আগের মাসে ঢাকায় নাশকতার মামলা হয় ৫৭৮টি, যার মধ্যে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে ৯০ বার। আর পেট্রলবোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার অভিযোগ রয়েছে ১ হাজার ১৮৬টি।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সঙ্গে এটাই তারেকের প্রথম বৈঠক। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাহী কমিটির বর্তমান সংখ্যা ৫০২ সদস্যের। সর্বশেষ দলের নির্বাহী কমিটির সভা হয় ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
