রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহকে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ায় লাম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইস্ট-ওয়েস্ট ১ নম্বর ব্লকে মুহিবুল্লার অফিসে এ ঘটনা ঘটে। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইট সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন তিনি। রোহিঙ্গা প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও জেনেভা সফর করেন। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট কুতুপালং শিবিরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গার গণহত্যাবিরোধী যে মহাসমাবেশ হয়েছিল, তা সংগঠিত করেছিলেন মুহিবুল্লাহ।
এদিকে এ ঘটনায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয়রা বলছেন, প্রত্যাবসনবিরোধীরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, উগ্রবাদী সংগঠন আরসা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, আল-ইয়াকিন নামে রোহিঙ্গাদেরই একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাজ।
ওই ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) পুলিশ সুপার নাইমুল হক জানান, গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা মুহিবুল্লাহর নিজ অফিসে ৫ রাউন্ড গুলি করে। এ সময় ৩ রাউন্ড গুলি তার বুকে লাগে। এতে তিনি ঘটনাস্থলে পড়ে যান। খবর পেয়ে এপিবিএন সদস্যরা গুলিবিদ্ধ মুহিবুল্লাহকে উদ্ধার করে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরান জানান, এপিবিএন ও পুলিশ সদস্যরা হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছেন।
উখিয়া থানার ওসি সঞ্জুর মোর্শেদ জানিয়েছেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহর মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
মুহিবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মুহিবুল্লাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। বিষয়টি মুহিবুল্লাহ তার ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনবিরোধী একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মুহিবুল্লাহকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করছেন তারা।
রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ জোবাইর বলেন, ‘মুহিবুল্লাহ নিহত হওয়ার পর উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গাদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ ঘটনায় আমরা শঙ্কিত। আমরা খুবই আতঙ্কে আছি।’
কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের সাধারণ রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মিয়ানমারের আরাকানে ফিরে যেতে ইচ্ছুক। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের চেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন মুহিবুল্লাহ।
তাকে রোহিঙ্গারা ‘মাস্টার মুহিবুল্লাহ’ বলে ডাকত। মিয়ানমারে থাকতে তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট কুতুপালং শিবিরে রোহিঙ্গাদের এক বিশাল সমাবেশ করেই তিনি আলোচনায় আসেন। গণহত্যাবিরোধী ওই সমাবেশ বিশ^বাসীর নজর কেড়েছিল। ওই সমাবেশে মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, নিরাপত্তা, রাখাইনে ফেলে আসা জন্মভিটা ফেরতসহ সাত দফা পূরণ না হলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এখনো ওই দাবিতে অনড় রয়েছে রোহিঙ্গারা।
২০১৯ সালের ১৭ জুলাই রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, ‘আমরা (রোহিঙ্গারা) দ্রুত মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। এ বিষয়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাই।’
এর আগে তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় আট লাখ রোহিঙ্গা। সেই সময় বাস্তুচ্যুত অন্য রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এ দেশে এসেছিলেন মুহিবুল্লাহ। তবে অনেকের ভাষ্য, অনেক আগে থেকেই তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করতে কক্সবাজারে আসেন।
