রেলপথ সংস্কারের অভাবে পাথর পরিবহনে দ্বিগুণ ব্যয়

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:৪১ এএম

দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া পাথরখনি পর্যন্ত রেলপথের ৭০টি সিøপার চুরি হয়েছিল ২০১১ সালে। সেই থেকে ১০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল এই খনির পাথর রেলপথে পরিবহনের কাজ। বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ খরচে সড়কপথে পরিবহন করা হচ্ছে খনিটিতে উৎপাদিত পাথর। যদিও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, খনির ৮০ ভাগ পাথর রেলপথে পরিবহন করার কথা।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অধীন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড থেকে পাওয়া তথ্যমতে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী খনির ৮০ ভাগ পাথর রেলপথে পরিবহন করতে হবে। কিন্তু ওই নির্দেশনা কাজে আসছে না। কারণ ২০১১ সালে পার্বতীপুরের ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া খনি পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার রেলপথের কয়েকটি জায়গার ৭০টি সিøপার (পাটাতন) চুরি যায়। এরপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় ওই পথে পাথরবাহী ওয়াগনের চলাচল। খনি পর্যন্ত ওই রেলপথের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯০ সালে। নির্মাণ শেষে ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চলে রেলপথে পাথর পরিবহন।

এ প্রসঙ্গে মধ্যপাড়া পাথরখনির উপমহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) রাজিউন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেলপথে পাথর পরিবহনে প্রতি টনে খরচ হয় মাত্র ৬০০ টাকা। অথচ সমপরিমাণ পাথর সড়কপথে পরিবহনে খরচ হয় ১ হাজার ১০০ টাকা (মধ্যপাড়া-ঢাকা)। এতে পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে। পাথর পরিবহন খাতে ব্যাপক আর্থিক অপচয় হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের মেগা প্রকল্পগুলোয় বিশে^র উন্নতমানের পাথর হিসেবে স্বীকৃত মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ রেলপথে তা পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় বড় অঙ্কের টাকা গচ্চা যাচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ বিষয়টি সুরাহার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে, কিন্তু সুরাহা মিলছে না।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড ২০২০-২১ অর্থবছরে ১২ লাখ ৮৭ হাজার টন পাথর বিক্রি করে আয় করেছে ২৯৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এ থেকে নিট মুনাফা হয়েছে ৩৩ কোটি ৫২ লাখ ২১ হাজার ৯৩২ টাকা। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২২ কোটি টাকা মুনাফা করে। খনিটি পরপর তিনবার লাভের মুখ দেখেছে। বর্তমানে খনিটিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) শতাধিক বিদেশি খনি বিশেষজ্ঞ ও অর্ধশত দেশি প্রকৌশলী এবং সাড়ে ৭০০ দক্ষ খনিশ্রমিক কাজ করছেন। যারা প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাথরখনির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেলপথে পাথর পরিবহন সাশ্রয়ী হলেও পরিবহন ঠিকাদাররা সিন্ডিকেট করে সড়কপথকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে বখরা ও বকশিশ নিচ্ছেন তারা।

ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া পাথরখনি পর্যন্ত রেলপথ সংস্কার না করার কারণ জানতে চাইলে রেলওয়ের পূর্ত বিভাগের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খনিমুখী ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথে সিøপার, ফিটিংস, পাথর কিছুই নেই। এ অবস্থায় ওই রেলপথে পাথর পরিবহন অসম্ভব। অথচ ওই রেলপথটি মেরামতে সম্ভাব্য ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও পাথরখনির ব্যাপক অর্থ সাশ্রয় হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রেলপথ সংস্কারের পাশাপাশি পাথর পরিবহন উপযোগী আরও চার সেট ওয়াগন প্রয়োজন। প্রতি সেটে ৪০টি ওয়াগন থাকে। বর্তমানে দুই সেট ওয়াগন রয়েছে, যা পর্যাপ্ত নয়।’

ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ সংস্কারে পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (সিএমই) মুহাম্মদ কুদরত ই খুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাথরখনিমুখী রেলপথটি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ সংকট সমাধানে খনি কর্র্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। তারা ব্যয় নির্বাহ করলে অতি দ্রুত রেলপথটি সংস্কার করা যাবে।’

তবে রেলপথ চালুর পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবু দাউদ মোহাম্মদ ফরিদুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত