আর্থিক সেবা ডিজিটালকরণের নেতৃত্বে সরকারি সেবা ‘নগদ’

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:২৫ এএম

এখন টাকা তুলতে গিয়ে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয় না। যখন খুশি টাকা তুলি। শুক্র-শনিবার নাই। আগে তো ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরতে হতো। আবার বয়স্কভাতা তুলতে গেলে সবাই কেমন যেন একটু তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলত। মনে হয় সরকার না, আমি যেন কারও টাকা নিয়ে নিচ্ছি। রাজশাহীর পবা উপজেলার হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ৭৬ বছর বয়সী আনিসুর হাসিমুখে এভাবেই বয়স্কভাতা তোলার গল্প বললেন।

সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ট্যুরে রাজশাহী, যশোর, নাটোরে সরেজমিন বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এবং ভাতাভোগীদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের হাতের মুঠোয় ভাতা চলে আসার গল্প।

আনিসুর এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আমার হাতের মুঠোয়। কোনো ঝামেলা নাই। আর কি চাই এই বয়সে।’

শুধু বয়স্কভাতা না, এখন সব ভাতাই আসে মোবাইলে ‘নগদ’র মাধ্যমে না হয় বিকাশে। সমাজের তিন কোটি পিছিয়ে পড়া মানুষকে গত এক বছরে সাড়ে আট কোটি বার সরকারের বিভিন্ন ভাতা ও অনুদান বিতরণ করেছে নগদ। শুধু নগদ নয়, বিকাশের মাধ্যমেও সরকারি ভাতার একটা অংশ বিতরণ করা হচ্ছে।

কথা হয় রাজশাহীর পবার হুজুরিপাড়ার নহাটা পলিটেকনিক শাহমকদুম পেয়ারলেস এমবি কলেজের শিক্ষার্থী কুসুম খাতুনের সঙ্গে। তিনি  বলেন, ‘খোঁড়া পা নিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাজশাহী সদরের কৃষি ব্যাংকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা তোলা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। জন্ম থেকেই পায়ের সমস্যা। হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। এখন হাতের মধ্যেই চলে আসে ভাতা। সারা দিন লেগে যেত। এখন ‘নগদ’ অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসের নির্ধারিত সময়ে টাকা চলে আসে।’

এটা শুধু কুসুম বা আনিসের গল্প নয়। এখন গ্রামের বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও শিক্ষাভাতা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের’ রূপরেখা ঘোষণা করেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, গ্রামের মানুষের কাছে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে। বিকাশের হাত ধরে এই সেবা শুরু হলেও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশের এই সুবিধা গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ডাক বিভাগের ফিনান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’। দেশের প্রায় ৮৮ লাখ মানুষের কাছে সরকারি এই সেবাগুলো তারাই পৌঁছে দিচ্ছে।

নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের জন্যই আমরা এই ভাতা বিতরণের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আর্থিক খাতে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব। আগে বয়স্ক, প্রতিবন্ধীদের অনেক কষ্ট করে উপজেলা বা জেলা সদরে গিয়ে ব্যাংক থেকে এই টাকা তুলতে হতো। আমরা মানুষের এই কষ্ট লাঘব করতেই যার টাকা তার হাতে পৌঁছে দেওয়ার কঠিন দায়িত্বটি নিয়েছিলাম। এখন আমরা বলতে পারি, সেই কঠিন কাজটি সফলভাবে করতে পেরেছি।’

নগদ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, ডাক বিভাগের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’ চালু হওয়ার মাধ্যমেই আর্থিক লেনদেনসহ বিল প্রদান সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট খাতে ডিজিটালাইজেশনের রূপান্তর ঘটে। সরকারি এই সেবাটি একের পর এক নতুন নতুন উদ্ভাবন দিয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। ফলে সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ডিজিটাল সেবার প্রসার ঘটে এবং তাদের জীবনমানেরও পরিবর্তন ঘটে।

‘নগদ’ই বাংলাদেশের প্রথম কোনো কোম্পানি যারা গ্রাহক পরিচয় নিশ্চিত করতে ইলেক্ট্্রনিক কেওয়াইসি (ই-কেওয়াইসি) চালু করে। ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘নগদ’-এর উদ্বোধন করার সময় থেকেই ‘নগদ’ ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো কোম্পানিতে ই-কেওয়াইসির প্রচলন ছিল না।

ই-কেওয়াইসি প্রচলনের ফলে একদিকে যেমন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট খোলার জটিল প্রক্রিয়া সহজ হয়ে যায়, অন্যদিকে অ্যাকাউন্ট খোলা সংক্রান্ত খরচও এড়াতে পারে কোম্পানিগুলো। প্রথম দিকে অনেকেই এর সমালোচনা করলেও পরে একে একে সব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানি ‘নগদ’-এর উদ্ভাবনকে অনুসরণ করে। পরে ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক সেবা কোম্পানিও ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে গ্রাহক হিসাব খোলার পদ্ধতি চালু করে সাফল্য পেতে শুরু করে।

ই-কেওয়াইসি জাতীয় পরিচয়পত্রের দুই দিকের ছবি তুলে অ্যাপের মাধ্যমে আপলোড করে অ্যাকাউন্ট খোলার পদ্ধতি। কিন্তু দেশে যেহেতু স্মার্টফোনের ব্যবহার অনেক কম, সে কারণে পরে ‘নগদ’ *১৬৭# ডায়াল করে অ্যাকাউন্ট খোলার পদ্ধতি চালু করে। ফলে এখন দেশের যেকোনো মোবাইল ফোন থেকে *১৬৭# ডায়াল করে চার ডিজিটের পাসওয়ার্ড দেওয়ার মাধ্যমে ‘নগদ’-এর অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব। এটি এখনো পর্যন্ত আর্থিক খাতে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। একটি সরকারি সংস্থার মাধ্যমে এমন একটি উদ্ভাবন গোটা বিশ্বকেই চমকে দিয়েছে। সে কারণে গত বছরের শেষ দিকে ‘নগদ’ তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশ্বকাপখ্যাত ‘উইটসা’ পুরস্কার পায়।

অ্যাকাউন্ট খোলার এ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদের ‘পরিচয়’ অ্যাপের সুবিধা পেয়েছে ‘নগদ’। যেখানে কোনো গ্রাহক *১৬৭# ডায়াল করলে মোবাইল ফোন অপারেটরদের কাছে থাকা গ্রাহকের তথ্য ‘পরিচয়’ অ্যাপের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজ থেকে যাচাই করে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

বাংলাদেশের আর কোনো আর্থিক কোম্পানির পক্ষে এখনো এমন আর কোনো সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। *১৬৭# ডায়াল করার মাধ্যমে ‘নগদ’-এর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সহজ হয়ে যায়। ফলে সেবা চালুর মাত্র ৩২ মাসের মধ্যে ‘নগদ’-এর গ্রাহকসংখ্যা সাড়ে ৫ কোটি পেরিয়ে গেছে। বিস্তৃত এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর ভর করেই করোনার সময়ে ‘নগদ’-এর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য আর্থিক অনুদান ও সহায়তা বিতরণ প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজড করতে পেরেছে সরকার। ২০২০-২১ অর্থবছরে ‘নগদ’-এর মাধ্যমে সরকার তিন কোটি মানুষকে সাড়ে আট কোটিবার নানা ধরনের ভাতা, উপবৃত্তি ও অনুদান বিতরণ করেছে। যার পুরোটাই হয়েছে স্বচ্ছতার সঙ্গে।

এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের দেড় কোটি শিক্ষার্থীর মায়ের মোবাইল ফোনে চারবার করে উপবৃত্তি বিতরণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘটনা। তাছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৫৮ লাখ দুস্থ ও হতদরিদ্র স্বচ্ছতার সঙ্গে ‘নগদ’-এর মাধ্যমে ভাতা পেয়েছেন। এই দুটি কর্মসূচির মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল সেবার আওতায় নিয়ে আসে সরকার।

এর বাইরে এক দশকের বেশি সময় ধরে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাতে চলে আসা মনোপলি ‘নগদ’-এর মাধ্যমেই ভাঙতে পেরেছে সরকার। যার মাধ্যমে এই খাতের লেনদেনে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুরু থেকেই ডাক বিভাগের এই মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসটি সেন্ড মানি বা টাকার লেনদেনকে ফ্রি করেছে। একইভাবে সব ধরনের পরিষেবার বিল ফ্রি-তে দেওয়ার প্রচলন করে ‘নগদ’। তাছাড়া এক বছরেরও বেশি সময় আগে ‘নগদ’ ক্যাশ-আউট চার্জ হাজারে ৯ টাকা ৯৯ পয়সায় (ভ্যাটসহ ১১ টাকা ৪৯ পয়সা) নামিয়ে আনে। অথচ বাজারের বিদ্যমান ক্যাশ-আউট চার্জ হাজারে ২০ টাকা। কম খরচে বা নিখরচায় সেবা দেওয়ার কারণে একচেটিয়া দাপট নিয়ে চলা কোম্পানিও গ্রাহক খরচ কিছুটা হলেও কমাতে বাধ্য হয়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাতে এটিও সরকারের অনেক বড় সাফল্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এক হিসেবে দেখা গেছে, কেবল গত এক বছরেই বাজারে প্রচলিত সেবার খরচের তুলনায় ‘নগদ’-এর মাধ্যমে যারা সেবা নিয়েছেন তাদের এক হাজার কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সংস্থার মাধ্যমে চালু হওয়া একটি সেবা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের দিনবদলের ক্ষেত্রে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক সেবার কারণেই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘নগদ’ এখন দৈনিক গড়ে ৭০০ কোটি টাকার লেনদেন করছে। ইতিমধ্যে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়ে ওঠা কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ‘নগদ’ জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও রাখছে অবদান। অচিরেই ‘নগদ’-এর মাধ্যমে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি লেনদেন করা সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছেন সেবাটির সঙ্গে জড়িতরা। আর্থিক সেবা ডিজিটাল করতে সরকারের অপর একটি উদ্ভাবন ‘এক পে’। নগদ ‘এক-পে’র মাধ্যমে সেবা বিল প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজতর করেছে।

জানা গেছে, দেশে এখন এমএফএসে অ্যাকাউন্ট ১২ কোটির মতো। এর মধ্যে সক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৫ কোটির বেশি। ‘বিকাশের’ মাধ্যমে খোলা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৬ কোটির মতো, আর ‘নগদের’ অ্যাকাউন্ট সাড়ে ৫ কোটি। রকেটের মাধ্যমে খোলা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা আড়াই কোটির মতো। তবে একজন গ্রাহক একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারেন। দেশের সব মানুষের হাতে এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

‘নগদের’ প্রধান গণযোগাযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরুতে অনেকেই নগদের ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়ার সমালোচনা করলেও এখন সব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানি, ব্যাংক ও আর্থিক কোম্পানিগুলো ‘নগদ’-এর উদ্ভাবনকে অনুসরণ করছে।’

দেশের অধিকাংশ লোকের কাছে স্মার্টফোন না থাকায় তারা এই ই-কেওয়াইসি সুবিধা নিতে পারেছেন না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘নগদ মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি নতুন সুবিধা চালু করেছে। এতে একজন সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীও তার মোবাইল থেকে অ্যাকাউন্ট খুলে এই সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।’

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যাকাউন্ট খোলার এ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদের ‘পরিচয়’ অ্যাপের সুবিধা পেয়েছে ‘নগদ’। যেখানে কোনো গ্রাহক *১৬৭# ডায়াল করলে মোবাইল ফোন অপারেটরদের কাছে থাকা গ্রাহকের তথ্য ‘পরিচয়’ অ্যাপের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজ থেকে যাচাই করে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।’ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নজরে আসায় একটি ‘স্টেট অব দ্য আর্ট’ উদ্ভাবন হিসেবে স্বীকৃতিস্বরূপ ‘নগদ’ গত বছর প্রথম বাংলাদেশি এমএফএস হিসেবে ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যালায়েন্সের (ডব্লিউআইটিএসএ) গ্লোবাল আইসিটি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২০ অর্জন করেছে বলেও জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত