ওমিক্রন ঠেকাতে আবার আগের অবস্থায় যাচ্ছে দেশ

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২২, ০১:৩০ এএম

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন ও করোনার ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে আবার পুরনো বিধিনিষেধের পাশাপাশি নতুন বিধিনিষেধ দিতে যাচ্ছে সরকার। এ দফায় নতুন বিধিনিষেধের মধ্যে হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে এখন থেকে করোনার টিকা সনদ রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। পাশাপাশি আবার আগের মতো যানবাহনে অর্ধেক যাত্রী ও মাস্ক বাধ্যতামূলক এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান সীমিত করার সিদ্ধান্ত আসছে। এবারও এসব বিধিনিষেধ মানতে আগের মতোই জরিমানা ও শাস্তিসহ নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।

গত সোমবার এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এসব বিধিনিষেধ আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় সেখান থেকে সরে এসে এখন আগামী সাত দিনের মধ্যে এসব বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সরকারের এসব সিদ্ধান্তের কথা নতুন করে জানান। এর আগে তিনি সোমবার আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় নেওয়া এসব সিদ্ধান্তের কথা বলেছিলেন। গতকাল নতুন করে বাস্তবায়নের সময় কমানোর কথা জানান।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘এসব বিষয়ে ১৫ দিন সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন সাত দিন সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তা মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে বলা হয়েছে এবং তিনিও একমত হয়েছেন। কারণ ১৫ দিন অনেক লম্বা সময়। এজন্য সাত দিন পরে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যাবে। এখানে সবার সহযোগিতা দরকার।’

গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর বিকেলে তথ্য অধিদপ্তরের এক তথ্য বিবরণীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৫ দফা নির্দেশনার কথা জানানো হয়। তবে এসব নির্দেশনায় রেস্তোরাঁয় খাবারের সময় টিকা সনদ রাখা ও যানবাহনে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী বহনসহ সরকারের নতুন বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ নেই।

রোগী বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল প্রস্তুত আছে বলে দাবি করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে রোগী যাতে না বাড়তে পারে, সে বিষয়ে খেয়াল রেখে চলার জন্য সবাইকে অনুরোধ করেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সব জায়গায় যেন স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়। সবকিছু একটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলতে হবে। সেই নির্দেশনা সাত দিন পরেই পাওয়া যাবে।’

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ওমিক্রন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যেই দেশে বিদেশফেরত ও তাদের সংস্পর্শে যাওয়া ১০ জনের মধ্যে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে। বিদেশফেরত আক্রান্ত ইউরোপ, আমেরিকা ও জিম্বাবুয়ে ভ্রমণ করেছেন। ইতিমধ্যেই ঢাকায় ওমিক্রনের গুচ্ছ সংক্রমণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি যে হারে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে শিগগির ওমিক্রনের গণসংক্রমণ বা সামাজিক সংক্রমণের আশঙ্কাও করছেন তারা।

করোনার ডেল্টা ধরনের দাপটে গত বছর মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু, রোগী শনাক্ত ও শনাক্তের হার বেড়েছিল। তবে আগস্টে দেশব্যাপী করোনার গণটিকা দেওয়ার পর সংক্রমণ কমতে থাকে। গত ডিসেম্বরের প্রথম কয়েক সপ্তাহ ধরে করোনা শনাক্ত ১ শতাংশের ঘরেই ছিল। কিছুদিন ধরে সংক্রমণে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রোগী ও শনাক্ত হার হয়েছে।

যেসব বিধিনিষেধ নতুন করে আসছে : এ ব্যাপারে গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাস, ট্রেন ও লঞ্চে মাস্ক ছাড়া চলা যাবে না। যদি কেউ চলাচল করে, তাহলে জরিমানার মুখে পড়তে হবে। এছাড়া যানবাহনে যাত্রী পরিবহন ধারণক্ষমতার অর্ধেক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

রেস্তোরাঁ-হোটেলে মাস্ক পরে যেতে হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মাস্ক ছাড়া গেলে দোকানদার এবং যিনি যাবেন, তার জরিমানা হতে পারে। দোকান খোলা রাখার সময়সীমাও রাত ১০টার পরিবর্তে ৮টা পর্যন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়েও প্রস্তাব করা হয়েছে।’

জাহিদ মালেক বলেন, ‘এখন থেকে রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে টিকা কার্ড দেখাতে হবে। হোটেলে মাস্ক পরে যেতে হবে। শুধু খাওয়ার সময় মাস্ক খুলে খেতে পারবেন এবং পরে আবার মাস্ক পরে চলে আসতে হবে।’

আপাতত স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘করোনার সংক্রমণ বেশি বাড়লে স্কুল খোলা রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখনো সেই সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ সেই পরিস্থিতিও এখনো দেশে হয়নি।’

তবে এখনই লকডাউন দেওয়ার কোনো চিন্তাভাবনা নেই জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এখনো লকডাউনের চিন্তা করা হচ্ছে না। তবে যদি পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যায় এবং সংক্রমণ বেড়ে যায়, তাহলে লকডাউনের বিষয়টি বিবেচনায় আছে। এছাড়া সীমান্তের বন্দরগুলোতে স্ক্রিনিং জোরদার করা হয়েছে এবং কোয়ারেন্টাইনের সময় পুলিশি পাহারা থাকবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৫ নির্দেশনা : করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন ঠেকাতে সারা দেশে ১৫ দফা নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এসব নির্দেশনায় সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জনসমাগমে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার ও রেস্তোরাঁয় মানুষের উপস্থিতি ধারণক্ষমতার অর্ধেকের মধ্যে সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। তধ্য অধিদপ্তর এক তথ্য বিবরণীতে এ নির্দেশনা কথা জানায়।

নির্দেশনাগুলো হচ্ছে : ১. ওমিক্রন আক্রান্ত দেশ হতে আসা যাত্রীদের বন্দরসমূহে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং জোরদার করতে হবে। ২. সকল ধরনের (সামাজিক/রাজনৈতিক/ধর্মীয়/অন্যান্য) জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে হবে। ৩. প্রয়োজনে বাইরে গেলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে বাড়ির বাইরে সর্বদা সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরাসহ সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। ৪. রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার ব্যবস্থা ধারণক্ষমতার অর্ধেক বা তার কম করতে হবে। ৫. সকল প্রকার জনসমাবেশ, পর্যটন স্থান, বিনোদন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার, সিনেমা হল/থিয়েটার হল ও সামাজিক অনুষ্ঠানে (বিয়ে, বৌভাত, জন্মদিন, পিকনিক, পার্টি ইত্যাদি) ধারণক্ষমতার অর্ধেক বা তার কমসংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করতে পারবে। ৬. মসজিদসহ সকল উপাসনালয়ে মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। ৭. গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। ৮. আক্রান্ত দেশসমূহ থেকে আসা যাত্রীদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে। ৯. সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (সকল মাদ্রাসা, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়) ও কোচিং সেন্টারে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। ১০. সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সেবাগ্রহীতা, সেবাপ্রদানকারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সর্বদা সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরাসহ সকল স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। ১১. যারা এখনো কভিড-১৯-এর টিকা গ্রহণ করেননি টিকাকেন্দ্র গিয়ে তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। ১২. করোনা উপসর্গ/লক্ষণযুক্ত সন্দেহজনক ও নিশ্চিত করোনা রোগীর আইসোলেশন ও করোনা পজিটিভ রোগীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা অন্যান্যদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ১৩. কভিড-১৯-এর লক্ষণযুক্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রাখা এবং তার নমুনা পরীক্ষার জন্য স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে সহায়তা করা যেতে পারে। ১৪. অফিসে প্রবেশ এবং অবস্থানকালীন বাধ্যতামূলকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ১৫. টিকা নেওয়া থাকলেও বাইরে বের হলে অবশ্য মাস্ক পরিধান করতে হবে।

এসব নির্দেশনা মানতে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য কিছু নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেখানে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ রোগ নিয়ন্ত্রণ ও কমাতে কমিউনিটি পর্যায়ে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সচেতনতা তৈরির জন্য মাইকিং ও প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে মসজিদ/মন্দির/গির্জা/প্যাগোডার মাইক ব্যবহার করা যেতে পারে এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর/ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

নির্দেশনাগুলো দেশব্যাপী কঠোরভাবে পালনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ সবার প্রতি আহ্বান জানায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত