স্বামী দাবি করে সম্পত্তি নিয়ে টানাটানি ৪ নারীর

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২২, ০২:৪১ এএম

আবিদ রেজা ছিলেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের কাপড় ব্যবসায়ী। তার গ্রামের বাড়ি পাবনার রূপপুরে। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ব্যবসার আয় থেকে বেশ কিছু স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়েছেন তিনি। রাজধানীর বনশ্রীতে আছে সাড়ে তিন কাঠার একটি প্লট। শেয়ারবাজারে লগ্নি করা আছে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন পূর্ব গোড়ানে একটি ছয়তলা বাড়ির অংশ। রূপপুরে পেয়েছেন সাড়ে তিন বিঘা জমি। দুই বছর আগে মারা যাওয়া আবিদের এই সম্পদের বণ্টন নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে জটিলতা। চার নারী নিজেকে আবিদ রেজার স্ত্রী দাবি করে চেয়েছেন সম্পদের ভাগ। পরস্পরকে তারা ‘অবৈধ স্ত্রী’ হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন। হয়েছে একাধিক মামলাও। সম্প্রতি আবিদ রেজার স্ত্রী দাবিদার চার নারী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে অসুস্থ হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি মারা যান আবিদ রেজা। তিনি যখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী, তখন থেকেই তার স্ত্রীর দাবি নিয়ে হাসপাতালে হাজির হন একে একে চার নারী। আবিদের অর্থ ও সম্পত্তির ওয়ারিশ দাবিতে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তারা। হাসপাতালেই দ্বন্দ্বে জড়ানো চার নারীর মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়ার শান্তা বেগম ও আছমা বেগম এবং মুন্সীগঞ্জের নাসরিন খান। আর আরেক নারীর নাম তাসলিমা বেগম। তবে শুরু থেকেই তিনি পাত্তা না পেয়ে নিজে থেকেই সরে গেছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জে আবিদের যে দোকান ছিল তার পাশেই ছিল শান্তার খালাবাড়ি। সেখানেই শান্তার সঙ্গে আবিদের পরিচয় ও প্রেম। ২০০৩ সালে বিয়ে করেন তারা। সেই হিসেবে শান্তা বেগম আবিদ রেজার প্রথম স্ত্রী। তাদের তিন ছেলে-মেয়েও রয়েছে। আবিদের বোন ও সন্তানদের নিয়ে তিনি থাকেন গোড়ানের বাড়িতেই। এর চার-পাঁচ বছর পর আবিদের পরিচয় হয় নাসরিনের সঙ্গে। পরে তারা বিয়েও করেন। আর ২০১৩ সালের মে মাসে বিয়ে করেন আছমা বেগম নামে আরেক নারীকে। আর আছমাকে সুই-সুতার কাজ শেখাতে আসা তাসলিমা বেগম নামের আরেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান আবিদ। নারসিন খানের দাবি, তাসলিমাকেও বিয়ে করেছিলেন আবিদ। তবে সেটি গোপনই ছিল।

জানা গেছে, আবিদ রেজার মৃত্যুর কিছুদিন পর থেকেই তার সম্পত্তি ও অর্থ প্রকৃত ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন ও সম্পত্তির দখলকে কেন্দ্র করে চার নারীর মধ্যে কোন্দল শুরু হয়। এর মধ্যে লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের কাছে থাকা আবিদ রেজার টাকা উত্তোলনের দাবি করেন প্রথম স্ত্রীর দাবিদার শান্তা বেগম। তবে সেই আবেদনে আপত্তি জানান নাসরিন খান। তিনি একাধিক মামলাও করেছেন সেই টাকার জন্য।

জানা গেছে, নাসরিন খান এখন থাকেন বনশ্রীতে। ওই প্লটের কাগজপত্র তৈরি থেকে নানা বিষয়ে দেখভাল করেছেন তিনি নিজেই। তাই নিজেকেই সেই প্লটটির মালিক হিসেবে দাবি করেছেন।

তবে শান্তা আর আছমা দুজনেই তাকে প্রতারক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, তাসলিমা নামের নারীও আরেক প্রতারক। তারা পরিকল্পিতভাবে সম্পদ দখলের পাঁয়তারা করছে। 

শান্তা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি আবিদ রেজার প্রথম স্ত্রী। আমার ঘরে তিন ছেলে-মেয়ে রয়েছে। আমি বর্তমানে আবিদ রেজার গোড়ানের ভবনেই আছি। সেখানে আবিদ রেজার বোনও থাকেন। নাসরিন নামে যে নারী আমার স্বামীর স্ত্রী দাবি করেছেন, তিনি মূলত প্রতারক। শেয়ারবাজারের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই তিনি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বউ সেজেছেন। ইতিমধ্যে ৫৫ লাখ টাকা তুলেছেন বলেও জানতে পেরেছি।

আর আছমা বেগম বলেন, আমি আবিদ রেজার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী শান্তা বেগম। তৃতীয় ও চতুর্থ স্ত্রী দাবিদার দুই নারীই প্রতারক। আছমা বলেন, শান্তা বেগম যেভাবে চান সেভাবেই তিনি রাজি আছেন। তবে নাসরিন যাতে কোনোভাবেই তাদের সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে না পারেন সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছেন।

তবে নাসরিন খান নিজেকে আবিদের বৈধ স্ত্রী দাবি করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আবিদ রেজাকে যখন বিয়ে করেন তখন তিনি জানতেন না আগের কোনো স্ত্রী ও সন্তানদের কথা। আবিদ রেজা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় বুঝতে পারেন আবিদের আরও স্ত্রী আছেন। মারা যাওয়ার পর আবিদ রেজার লাশ নিয়ে গোড়ানের বাসায় গেলে আগের দুই স্ত্রী ও আবিদের বোনের হাতে মারধরের শিকার হন তিনি। তারপর থেকে প্রাণভয়ে তিনি আর সেখানে যাননি। তার দাবি, আবিদ রেজা মারা যাওয়ার পরই শান্তা, আছমা ও তাসলিমা নামে তিন নারীর কথা শুনেছেন।

তবে নাসরিনের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শান্তা ও আছমা উল্টো অভিযোগ করে বলেন, তারাও নাসরিনের কথা জানতেন না। অর্থ ও জমি দখলের জন্যই নাসরিন আবিদ রেজার স্ত্রী দাবি করে তার সঞ্চিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া ও জমি দখলের ষড়যন্ত্র করছেন।

শান্তার ভাই জসিম ওরফে রাহুলও দেশ রূপান্তরকে বলেন, আবিদ রেজার মূলত দুই স্ত্রী। শান্তা ও আছমা ছাড়া তার জানামতে কোনো বৈধ স্ত্রী নেই। নাসরিন খান নামে যে নারী আবিদ রেজাকে স্বামী হিসেবে দাবি করছেন, সেই নাসরিন আবিদ রেজার শেয়ারবাজারের টাকা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছেন।

এ প্রসঙ্গে নাসরিন বলেন, জসিম ওরফে রাহুল আমার হাজব্যান্ড নিয়ে বহু খেলা করেছে। আমার স্বামীকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। আমি সবসময় হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা করালাম। তখন তো তাদের পাইলাম না।

তিনি বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে আবিদকে বিয়ে করি। বিয়ে করার আগে আবিদ এক কাস্টমস কর্মকর্তাকে বিয়ে করেছিলেন। সেই স্ত্রীর সঙ্গে তার বনিবনা হয়নি। দুজনের মধ্যে মারামারি হয়। সেই ঘটনার জের ধরে আবিদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়। সেই মামলার আইনি সহায়তা দিয়েছিলাম। তারপর সেই মামলা ডিসমিস হওয়ায় তাকে বিয়ে করি।

নাসরিন বলেন, দুই-তিনটা ব্যাংকের এমডি, সিটি কলেজের তিনজন প্রফেসরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। আমার আপন ভাই সচিব। আর তারা (শান্তা ও আছমা) গেছে শেয়ারবাজারের টাকা তুলতে! আমার জমি ডেভেলপার কোম্পানিকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে।

তারা বিভিন্ন ব্রোকার হাউজে গিয়ে আমার নামে অনেক অভিযোগ দিয়েছে। তারা দরখাস্ত নিয়ে দৌড়াইনি, খাইয়া পালিয়ে গেছে। আমার স্বামী আমারে নমিনি করেছে। 

নাসরিনের দাবি, আবিদ যখন অসুস্থ, তখন তার স্বামীর টাকা পয়সা আছমা ও শান্তা ভাগবাটোয়ারা করে নেন। তার ভাষ্য, সিটি ব্যাংক থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন আছমা। এছাড়া শান্তা ও আছমা মিলে গোড়ানের বাড়িসহ মোট ৩৯টি ঘরের ভাড়া তুলছেন। তাই সিটি ব্রোকার হাউজে মামলা দিয়েছি। ডিএসই, সিএসই সব জায়গায় মামলা দিয়েছি। আরও মামলার প্রস্তুতি নিয়ে এগুচ্ছি।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে আবিদ রেজার বোন শাহিনা আবিদাকে ফোন করা হলে সেটি ধরেন এক পুরুষ। নিজেকে শাহিনার স্বামী পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি বলেন, আবিদ রেজা তার স্ত্রীর বড় ভাই। তার একাধিক বিয়ের কথা তিনি শুনেছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা তার জানা নেই।

নিজের নাম বলতে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি জানান, গোড়ানের বাড়িটি মূলত তৈরি করেছেন তার ‘শ্বশুর’। তার শাশুড়িসহ ওই বাড়িটির আইনগত ওয়ারিশ আছেন ৭ জন। বাড়িটি আবিদ রেজার একার নয়। তবে শাহিনা ছাড়া অন্য ভাইবোনরা দেশের বাইরে থাকায় ওই বাড়িতে এখন শান্তা বেগম ও আছমা বেগম থাকেন। নাসরিন বা তাসলিমার বিষয়ে কোনো তথ্য তার জানা নেই বলেও দাবি করেন ওই ব্যক্তি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত