বিশ্ব ক্যান্সার দিবস: ক্যান্সার আমাকে কী শিখিয়েছে

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:৫৭ এএম

ক্যান্সার আমার জীবনে অনেকটা এলার্ম ক্লকের কর্কশ ধ্বনির মতোই ছিল। ব্যস্ততা যখন আমাকে ব্যস্ত রাখত সব সময়, দু দণ্ড বসে গান শোনা কিংবা পাখির কলতান শোনার সময় হতো না, ঠিক তখন ৪র্থ পর্যায়ে ওভারিয়ান ক্যান্সার বিরাট এক ধাক্কা দিল আমাকে। আমার পরিবার, প্রিয়জন এতটাই ভেঙ্গে পড়ল যে আমি খুব দ্রুত মেনে নিলাম পরিস্থিতি।

ক্যান্সার আমাকে সাহসী করেছে, করেছে বাস্তববাদী। সাহিত্যে পড়া আমি আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে কষ্টকর চিকিৎসা পদ্ধতি কেমো, সার্জারি, চিকিৎসা পরবর্তী জটিলতা, অনিশ্চয়তাকে মেনে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চলেছি। একটুতেই হতাশায় ভোগা আমি, স্কুল-কলেজের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় একদম শেষে আসা আমি, মূহুর্তে হয়ে গেলাম সাহসের প্রতীক।

ক্যান্সার আসলে আমাকে বুঝিয়েছিল জীবন ভীষণ মূল্যবান, সময় সবচেয়ে দামী। আমি প্রকৃত অর্থে জীবনকে উপভোগ করা শুরু করি ক্যান্সার ধরা পড়ার পর। ক্যান্সার আমাকে শিখিয়েছে Self Care is a necessity not a luxuary.  আমি আমার নিজের ছোট ছোট শখগুলো পূরণ করি অপরাধবোধকে ভ্রূ কুঁচকে। পরিবার, প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানো আমার কাছে অনেক বেশি জরুরী এখন।

ক্যান্সার আমাকে শিখিয়েছে আবেগের প্রকাশ করতে। আমি সাহসী, প্রচণ্ড ইতিবাচক মানসিকতার, অনেকের প্রেরণার উৎস এই চিত্রটা সম্পূর্ণ সঠিক না–এটা মুদ্রার এক পিঠ, অন্য পিঠে আমিও ভয় পাই, বাচ্চাদের চিন্তায় অস্থির এক মা সারারাত অনিদ্রায়, অস্থিরতায় পার করা একজন ক্যান্সার যোদ্ধা। কেমোর পরে যেদিন চুলগুলো সব কেটে ফেলতে হল আমি ব্যাকুল হয়ে কেঁদেছি। পার্লারের অন্য মহিলারা চোখে পানি নিয়ে সান্তনা দিয়েছিল। এখন যদি  কখনও পার্লারে যাই হ্যাপি নামের যে মেয়েটি আমার চুল কেটেছিল তাকেই কাছে ডাকি। হিম শীতল অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে আমারও বুক টিপ টিপ করেছিল, গলা শুকিয়ে আসছিল, প্রিয় মুখগুলো আর দেখতে পারবো কি না এই অনিশ্চয়তায় চোখে ভিজে আসছিল। প্রাণ খুলে হাসতে যেমন আমরা অস্বস্তিবোধ করি না, তেমনি গলা ছেড়ে কাঁদতে ও আমার এখন অস্বস্তি হয় না কারণ এ আমার স্বাভাবিক আবেগ। আমি Super Human নই যে সব সময় পজিটিভই থাকব। আমি জানি চোখ মুছে আমি আবার উঠে দাঁড়াব। ক্যান্সার আমার জীবনের গল্পের একটা অধ্যায় কোনো অবস্থাতেই পুরো গল্পটি নয়।

ক্যান্সার আমাকে মানিয়ে নিতে শিখিয়েছে। জীবন যাপন, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম,শরীরচর্চার মধ্যমে চিকিৎসা পরবর্তী নিজের জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে। যখন ভাবছি আবার ফিরব শিক্ষকতায়, জীবন হবে আগের মতো তখন আবার ফিরে এলো ক্যান্সার দ্বিতীয় বারের মতো লিভারে। ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলাম কিছুটা সময় নিয়ে স্থির হলাম আবার। কষ্টকর চিকিৎসা নেয়ার মত জন্য প্রস্তুত হলাম।

ক্যান্সার আমাকে শিখিয়েছে তোমার সামনে বরাবর দুটি রাস্তা থাকবে তুমি কী করবে সেটা তোমাকে ঠিক করতে হবে। আমি শুধু জানতাম ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে আবার উঠে দাঁড়ান ছাড়া আমার সামনে অন্য কোন বিকল্প থাকতে পারে না।

ক্যান্সার আমাকে শিখিয়েছে পৃথিবীটা ঠিক ২+২=৪ এমন জায়গা না। এখানে ধরেই নিতে হয় ২+২=৫ হয় অর্থাৎ ভাল করলেই ভাল হবে আর মন্দ কাজ করলেই মন্দ হবে। এমন সহজ-সরল সমাধান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় না। তাই কেন আমি? কী হলে কী হতো, কিংবা আমার কী অপরাধ ছিল। এই অর্থহীন চিন্তাগুলোকে সরিয়ে আবার শুরু করি এই ভাবনাটা  আমাকে টেনে এনেছে এতটুকু।

২য় দফায় চিকিৎসার পরও শরীরে রয়ে গেছে একটা ছোট নডুল। বেচারাকে দমিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন আমাকে ১২টা ট্যাবলেট খেতে হয়। চলবে যত দিন আছে দেহে প্রাণ। শরীরে সামান্য কোনো সমস্যা হলেই আতঙ্কিত হই আবার। চিকিৎসাটা যেখানে শেষ হয় সেখান থেকে শুরু হয় সাপলুডু খেলা।

ক্যান্সার আমাকে শিখিয়েছে থেমে যাওয়া, জিরিয়ে নেয়ায় কোন সমস্যা নেই। কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়া কোন সমাধান হতে পারে না। চিকিৎসা শেষে আমি আমার শিক্ষকতা পেশায় ফিরতে পারিনি। কোভিডে বিশ্ববাসীর মতো আমিও গৃহবন্দী। মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত আমি। মনকে শক্ত করতেই মনোবিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকলাম। Online এ ৬ মাসের  Clinical Mental Health এর ওপর কোর্স করলাম। ছোট ২টা Cancer Counseling এর ওপর কোর্স করলাম। নিজের চারপাশে পরিচিত, অপরিচিত ক্যা›সার যোদ্ধাদের মনবল বাড়ানোর কাজে ব্যস্ত পার করি দিনের কিছুটা সময়। আমি এখন নিজের চুল বিহীন ছবি কিংবা শরীরে দীর্ঘ ক্ষত চিহ্ন নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগি না। একজন ক্যান্সার যোদ্ধাকে বলি এ আমার যুদ্ধে পাওয়া ক্ষত যা আমার বীরত্বের সাক্ষী। আজ আমি সত্যিই বিশ্বাস করি নিজেকে নিয়ে আমি যা ভাবি আসলে আমি তাই।

ক্যান্সার যোদ্ধা থেকে ক্যান্সারকে জয় করার চেষ্টা এরপর নিজেকে একজন ক্যান্সার কাউন্সিসলর হিসাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা জীবন আমার কাছে একটা থ্রিলার। পরতে পরতে বিস্ময়। আমি জানি একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে সবার মত আমিও চলে যাব এটাই স্বাভাবিক, তাই মৃত্যু নিয়ে অস্বাভাবিক আতংক কিংবা মৃত্যুকে মহিমান্বিত করার কোন ইচ্ছাই আমার নেই। আমার ছোট ছোট পদচিহ্নগুলো পৃথিবীর বুকে ছোট মেঠো পথ হয়ে যদি থেকে যায় তাই বা কম কী।

ক্যান্সার আমাকে কৃতজ্ঞ হতে শিখিয়েছে-আমি কৃতজ্ঞ বিধাতার কাছে সবকিছুর জন্য। যা শিখেছি সব জীবনে অক্ষরে অক্ষরে মানার মতো সুবোধ, মেধাবী ছাত্রী আমি নই তবুও চেষ্টা করি-এতটুকুই। প্রতিদিন ঘুম ভেঙ্গে কাজী নজরুলের কবিতার লাইন আওড়াই-          

‘‘তুমি শুদ্ধ কর আমার জীবন আমি প্রতিটি ভোরের মতো

 আবার নতুন হয়ে উঠি

 হই সূর্যদ্বয়’’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত