পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি জীবন বীমা কোম্পানির বিপুল পরিমাণের শেয়ার কিনে মালিকানায় এসেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট গ্রুপ বেক্সিমকো। বাজার থেকে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার কিনে প্রতিষ্ঠানটিতে পরিচালক হিসেবে পাঁচজন প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন গ্রুপটি। উদ্যোক্তা-পরিচালকদের নজিরবিহীন জালিয়াতি ও লুটপাটে আর্থিকভাবে বিধ্বস্ত কোম্পানি ফারইস্ট লাইফ পুনরুদ্ধারে বেক্সিমকো গ্রুপের দুই কোম্পানিকে রাখা হয়েছে পুনর্গঠিত পর্ষদ সভায়।
সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে, যেখানে বেক্সিমকো গ্রুপ সংশ্লিষ্ট দুই কোম্পানির পাঁচ প্রতিনিধিকে পরিচালক হিসেবে রাখা হয়েছে।
প্রায় ২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও লুটপাটের ঘটনায় গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্যাহকে চেয়ারম্যান করে ১০ জন স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। এর ছয় মাসেরও কম সময়ে নতুন করে ফারইস্ট লাইফের পর্ষদ পুনর্গঠন করল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি।
সাম্প্রতিক সময়ে বেক্সিমকো গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও জুপিটার বিজনেস লিমিটেড নামের দুই কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মোট শেয়ারের ১৯ দশমিক ৮১ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। এর মধ্যে ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল ফারইস্ট লাইফের ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ ও জুপিটার বিজনেস লিমিটেড ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ শেয়ার কেনে। এরপর গত ৩০ জানুয়ারি ফারইস্ট লাইফের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে কমিশনের কাছে চিঠি পাঠায় কোম্পানি দুটি। এরপর গত ৩ ফেব্রুয়ারি ছয় ব্যক্তিকে স্বতন্ত্র পরিচালক এবং শেয়ারধারী চার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগে শর্তসাপেক্ষে সম্মতি দেয় এসইসি।
সুত্র জানিয়েছে, ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি হিসেবে এসইসির সাবেক কমিশনার ও আইডিএলসি ফাইন্যান্সের সাবেক এমডি আরিফ খান ও বেক্সিমকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা জামানুল বাহারকে ফারইস্ট লাইফের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর জুপিটার বিজনেস লিমিটেডের প্রতিনিধি হিসেবে বেক্সিমকো টেক্সটাইলের জেনারেল ম্যানেজার মাসুম মিয়া, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আলী নেওয়াজ ও ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম চৌধুরীকে পরিচালক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। বর্তমান নিয়মানুযায়ী, ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল ও জুপিটার বিজনেস ন্যূনতম চারজন করে মোট ৮ জন পরিচালক নিয়োগ দিতে পারে।
পুনর্গঠিত পর্ষদে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বতন্ত্র পরিচালকরা হলেন বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন, লাফিফা জামাল, একাত্তর মিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ও এমডি মোজাম্মেল হক, সাবেক সচিব মো. ইব্রাহিম হোসেন খান, শেখ মামুন খালেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম। এর বাইরে উদ্যোক্তা শেয়ারধারী আলহাজ মো. হেলাল মিয়া (উদ্যোক্তা শেয়ারধারী), ফারইস্ট সিকিউরিটিজের একজন প্রতিনিধিকে শেয়ারধারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের শেয়ারধারী পরিচালকদের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সম্মতি নিতে হবে বলে শর্ত দিয়েছে এসইসি। এ ছাড়া পরবর্তী সাধারণ সভায় পোস্ট-ফ্যাক্টো হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনও নিতে হবে। কোম্পানিটির পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদ কমিশনের ন্যূনতম শেয়ারধারণের নির্দেশনা অনুযায়ী শেয়ারধারী পরিচালকদের স্বতন্ত্রভাবে ন্যূনতম ২ শতাংশ এবং কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ নিশ্চিত করতে হবে। কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে থাকা সমস্ত শেয়ার লক-ইন থাকবে।
প্রসঙ্গত নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্যে জমি ক্রয় ও ব্যাংকে রাখা আমানতের বিপরীতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়াসহ বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে ২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা। দেশের বীমা শিল্পে নজিরবিহীন এই লুটপাটে সহায়তা করেছেন তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ও বিভিন্ন বোর্ড কমিটির এমডিসহ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লুটপাট চললেও জালিয়াতির প্রতিবেদন দিয়ে তা আড়াল করেছে একাধিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান।
লুটপাট ও অর্থ পাচারের ঘটনায় গত বছরের পুনর্গঠিত পর্ষদকে কোম্পানিতে সংগঠিত পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার, আর্থিক অপরাধ ও অর্থ পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ বোর্ড কমিটি ও ব্যবস্থাপনায় শীর্ষ পদগুলো পুনর্গঠনের নির্দেশনা দেয় এসইসি। এ ছাড়া মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী যৌথ তদন্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন, সিআইডি ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে চিঠি দিয়েছে কমিশন। এর বাইরে আত্মসাতে যুক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি, তাদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকা ফারইস্ট লাইফ ও অন্যান্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে থাকা বিনিয়োগ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশনাও দিয়েছে এসইসি।
