শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে পিছু হটল শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:০৯ এএম

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে চলমান আন্দোলন প্রত্যাহার করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলন প্রত্যাহারের এই ঘোষণা দেন তারা। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি তাদের সব দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়ায় তার ওপর আস্থা রেখে আন্দোলন আপাতত প্রত্যাহার করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

এর আগে গত শুক্রবার বিকেলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সিলেটে এসে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে ওইদিন রাতে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীরা জানান, তারা শনিবার বিকেলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আন্দোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন। সেই আলোচনা শেষে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবির আন্দোলন শুরুর ২৭ দিন পর গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সংবাদ সম্মেলনে এসে তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অন্যতম মুখপাত্র মুহাইমিনুল বাশার রাজ। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিদাওয়া পূরণের বিষয়ে অনড় বলেও জানান তিনি। 

এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার ২৭ দিন পর ওই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন শাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হামলায় আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন উপাচার্য। আন্দোলন প্রত্যাহারসংক্রান্ত লিখিত বক্তব্যে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্যের পদত্যাগের বিষয়ে মুহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রী আমাদের সকল দাবি মেনে নিয়ে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়ায় তাদের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে আমরা আমাদের আন্দোলন আপাতত প্রত্যাহার করে নিলাম এবং আমাদের দাবি পূরণের অপেক্ষায় থাকলাম। আমরা আগামীকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও ক্লাস-পরীক্ষা শুরু করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের ৬টি দাবি এবং দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। তিনি আমাদের সব দাবি আন্তরিকতার সঙ্গে শুনেছেন। আমাদের প্রথম দাবি ছিল ভিসির পদত্যাগ। মন্ত্রী এই বিষয়ে বলেছেন, “ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ আচার্যের কাছে উপস্থাপন করা হবে। আচার্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।” তাই আমরা আশা করছি মাননীয় আচার্য মহোদয় আমাদের শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাদের কথা বিবেচনায় রাখবেন।’

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীদের ওপর মামলার বিষয়ে মন্ত্রীকে অবগত করা হলে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের ওপর যে দুটি মামলা হয়েছে সেটা অতিদ্রুত প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করা হবে।” বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মোবাইল সিম ও মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ থাকার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, “আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে সকল নাম্বার ও মোবাইল ব্যাংকিং সচল করা হবে।” এ ছাড়া পুলিশি হামলায় আহত সজল কু-ুসহ অনশনকারী সব শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসা চলমান আছে এবং থাকবে। এ ছাড়া মন্ত্রী সজল কুন্ডুর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তার চাকরির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।’

উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল, আজ রবিবার থেকে তিনি ক্যাম্পাসে আসলে বাধা দেওয়া হবে কি না সংবাদ সম্মেলন শেষে এমন প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। এর জবাবে মুহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, ‘উনি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করলে সেটা ওনার জন্য লজ্জার হবে। এ কারণে আমরা চাই উনি চলে যাক। এই মুহূর্তে সেশনজটের একটা শঙ্কা যেহেতু তৈরি হয়েছে, তাই আমরা চাই কোনো কারণে যেন আমাদের শিক্ষা-কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।’

পুলিশি হামলায় উপাচার্যের দুঃখ প্রকাশ: শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলাকে ‘অনাকাক্সিক্ষত’ উল্লেখ করে এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার জন্য সবাইকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। গতকাল দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার মো. ইশফাকুল হোসেন। এ দিন দুপুরে শাবিপ্রিবি উপাচার্য স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠোনো হয়। এতে বলা হয়, ‘১৬ জানুয়ারি আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ যারা আহত হয়েছেন তাদের সবার প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে ঘটে যাওয়া অনাকাক্সিক্ষত এই ঘটনার জন্য আমি আন্তরিকভাবে গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি। উক্ত ঘটনার ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

সব দেয়াল লিখন মুছে ফেলার নির্দেশনা শিক্ষামন্ত্রীর: উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে নানা প্রতিবাদী স্লোগান ও গ্রাফিতি আঁকেন। এসব দেয়াললিখন ও গ্রাফিতি মুছে ফেলতে নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গতকাল  সন্ধ্যায় মন্ত্রীর বরাতে দেশ রূপান্তরকে এমন তথ্য জানিয়েছেন শাবিপ্রবি রেজিস্ট্রার ইশফাকুল হোসেন।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলার সময় দেয়াললিখন মুছে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তাই আজ (গতকাল) সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেয়াললিখন মুছতে গেলে কিছু শিক্ষার্থী এসে বাধা দেন। পরে আমরা দেয়ালের লিখন মোছার কাজ বন্ধ রাখি।’

তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র রাজ এ বিষয়ে বলেন, ‘দেয়াললিখন মুছে দেওয়ার বিষয়ে আমরা কোনো নির্দেশনা পাইনি।’

শাবিপ্রবির বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে গত ১৩ জানুয়ারি রাতে আন্দোলনে নামেন ওই হলের শিক্ষার্থীরা। এর জেরে ১৬ জানুয়ারি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠির পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড নিক্ষেপ করে পুলিশ। এরপর শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, একপর্যায়ে তারা আমরণ অনশনে বসে। ২৬ জানুয়ারি সেই অনশন ভাঙান বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক অধ্যাপক লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী ইয়াসমিন হক। অনশন ভাঙলেও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য গত শুক্রবার সকালে সিলেট যান শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত