ইউক্রেনে যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২২, ০২:৩২ পিএম

দুই পক্ষই বলছে, যুদ্ধ থামাতে তারা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। কিন্তু যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণ নেই। সমাধানসূত্রেরও কোনও আশা নেই। আজ নতুন করে ভয়াবহ হামলা শুরু করেছে রাশিয়া। কৃষ্ণসাগরের তীরে মারিউপোল বন্দরে লাগাতার গোলা ছুড়ছে তারা। খেরসন শহর দখল করে ফেলেছে রুশ বাহিনী। জ্বলছে ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভ। রাজধানী কিয়েভের বাইরে জড়ো হয়েছে ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সেনা বহর। হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, ধর্মস্থান, জনবসতি, কোনও কিছুকেই রেহাই দিচ্ছে না না রুশ সেনারা। থেকে-থেকে বিস্ফোরণের আওয়াজ, আকাশ ফুঁড়ে ওঠা অগ্নিপিণ্ড, পোড়া গন্ধ ও কালো ধোঁয়ায় দমবন্ধ করা যুদ্ধ-পরিস্থিতি।

গত মঙ্গলবার ইউক্রেন-বেলারুশ সীমান্তে শান্তি বৈঠক বসেছিল। তাতে কোনও সমাধান মেলেনি। শুধু প্রতিশ্রুতি মিলেছিল ফের বৈঠকে বসার। এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়, কবে-কখন-কোথায় ফের আলোচনায় বসবে দুই দেশ। বা তাতে আদৌ কোনও দিশা মিলবে কি না। বরং ক্রমেই তৈরি হচ্ছে নতুন জল্পনা।

স্থানীয় সংবাদ সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, ইউক্রেনের সাবেক ক্ষমতাচ্যুত রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচকে বেলারুশের মিনস্কে নিয়ে গিয়েছে রাশিয়া। তাকে ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করতে পারেন পুতিন। আজ যুদ্ধের অষ্টম দিনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক ভিডিও-বার্তায় দাবি করেছেন, তাদের দেশের ইতিহাস, মানুষ, তদুপরি অস্তিত্বকেই শেষ করে দেওয়ার লক্ষ্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের।

গত দুই দিনে ইউরোপ, আমেরিকা-সহ বহু দেশ ইউক্রেনের হয়ে সরব হতে কিছুটা মনের জোর পেয়েছিলেন জেলেনস্কি। আজ ভিডিও-বার্তায় দেখা গেল, মুখে গত কয়েক দিনের না-কাটা দাড়ি, চোখের নীচে কালি, একরাশ ক্লান্তি ও ম্লান হাসি। হতাশা প্রকাশ করে তিনি জানান, পশ্চিম আমাদের যে সাহায্য করছে, তা কোনও ভাবেই যথেষ্ট নয়। বিশ্বের উদ্দেশে তার বার্তা, ‘আর নিরপেক্ষ থাকার সময় নেই’।

জেলেনস্কি দাবি করেছিলেন, দ্বিতীয় বৈঠকে বসার আগে যুদ্ধ বন্ধ করুক রাশিয়া। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সতর্ক করেন, ‘বরাবর ইতিহাস থেকে আমরা শিখে এসেছি- কোনও স্বৈরাচারী শাসককে যদি তার হামলার মূল্য না চুকাতে হয়, তা হলে একটা তার দেশেই আগ্রাসন থেমে থাকে না’। একাধিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে রাশিয়ার উপরে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে বহু দেশ। চীন, বেলারুশ, উত্তর কোরিয়ার মতো কিছু দেশ ছাড়া তাদের সমর্থনে আর কেউ নেই। প্রায় একঘরে রাশিয়া। এমনকি নিজে দেশেও চাপে পুতিন। যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ করছেন রাশিয়ানরা। কিন্তু তবুও তিনি অনড়।

রুশ প্রেসিডেন্টের অঙ্গুলি হেলনেই আজ নতুন করে হামলার গতিবেগ বেড়েছে। কিয়েভের বাইরে জড়ো হয়েছে ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সেনা কনভয়। তারা ধীরে ধীরে রাজধানীর দিকে এগিয়ে চলেছে। অনেকেরই আশঙ্কা, ইউক্রনের বর্তমান সরকারকে ফেলে দিয়ে নিজের পছন্দের শাসককে ‘পুতুল’ হিসেবে গদিতে বসাবে ক্রেমলিন।

উত্তরের শহর চেরনিহিভে আজ দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শহরের হাসপাতালটি। ভেঙে পড়েছে হাসপাতালের মূল ভবনের একাংশ। মৃতের সংখ্যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এর বেশি কিছু জানানো হয়নি। প্রশাসনের প্রকাশ করা ভিডিও ও ছবিতে দেখা গিয়েছে, একটি পাঁচ তলা পুলিশ-ভবনেও বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে রুশ সেনা। বোমা পড়ে বাড়িটির ছাদে। উপরের তলায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে পড়ে বাড়িটির ভাঙা অংশ।

বন্দর-শহর মারিউপোলে লাগাতার গোলা ফেলছে রুশরা। শহরের মেয়র বেডিম বয়চেঙ্কো বলেন, ‘হামলা থামছেই না। রাস্তাঘাটে, বাড়িতে অনেকে জখম অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। তাদের যে হাসপাতালে নিয়ে যাব, তার উপায় নেই’। বয়চেঙ্কোর কথায়, ‘গণহত্যা চালাচ্ছে রাশিয়া’।

সাত দিনে ইউক্রেনে কত প্রাণহানি ঘটেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। জাতিসংঘের দাবি, প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। অগুণতি মানুষ মাটির নীচে লুকিয়ে রয়েছেন। ইউক্রেন বা রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে কত জন নিহত হয়েছেন, কোনও দেশই তা ঘোষণা করেনি। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইউক্রেনে ১৩৬ জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সেই সংখ্যা গত তিন-চার দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। বাস্তবে মৃতের সংখ্যা বহু গুণ বেশি। ইউক্রেন সরকার দাবি করেছে, ২ হাজারের বেশি সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

ইউক্রেনের বিখ্যাত বাবি ইয়ার হলোকস্ট মেমোরিয়ালে হামলা করা হয়েছে আজ। ক্ষতিগ্রস্ত সৌধের একাংশ। মেমোরিয়ালের দায়িত্ব থাকা এক কর্মী জানান, ১৯৪১ সালে দুদিনে ৩৩ হাজারেরও বেশি ইহুদিকে হত্যা করেছিল নাৎসিরা। মেমোরিয়ালটি ওই ইহুদিদেরই কবরস্থান।

যুদ্ধ ঘোষণার সময়ে রুশ প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন, ইউক্রেনে নব্য-নাৎসিদের অত্যাচার বাড়ছে। এ দেশকে ‘নাৎসিদের’ হাত থেকে বাঁচাতে চান তিনি। বাবি ইয়ারে হামলার পরে সেই ‘নাৎসি অত্যাচারের’ কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ইউক্রেনের এ ধরনের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থানগুলিকে আরও বেশি করে নিশানা করা হতে পারে। যেমন, সেন্ট সোফিয়া ক্যাথিড্রাল। ‘হাসিডিক ইহুদি’ গোষ্ঠীর তীর্থক্ষেত্র বলে পরিচিত উমান শহরে ইতিমধ্যেই হামলা চালিয়েছে রুশ সেনাবাহিনী।

জেলেনস্কি বলেন, ‘ওরা আমাদের ইতিহাস জানে না। ওদের কাছে শুধু নির্দেশ রয়েছে, আমাদের ইতিহাসকে, আমাদের দেশকে, আমাদের সবাইকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে হবে’।

জেলেনস্কি নিজে ইহুদি। তার পূর্বসুরিদের হত্যা করা হয়েছিল হিটলারের নাৎসি ক্যাম্পে। সে প্রসঙ্গ তুলে জেলেনস্কি আরও বলেন, ‘বাবি ইয়ারে আমরা আবার মরব। যদিও এই পৃথিবী বারবার প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না, কী ঘটছে? গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের বলছি, এটাই গুরুত্বপূর্ণ সময়, চুপ করে থাকবেন না। এই চুপ করে থাকা দিয়েই নাৎসিবাদ জন্ম নিয়েছিল। এত নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, প্রতিবাদ করুন। এত ইউক্রেনীয়কে হত্যা করা হচ্ছে, চিৎকার করুন’।

রাশিয়ান দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও জোরদার করতে নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার প্রথম সপ্তাহ শেষে দেখা যাচ্ছে, ভ্লাদিমির পুতিন যেমনটা ভেবেছিলেন অথবা তার সেনাবাহিনীর জেনারেলরা তাকে যেরকম ধারণা দিয়েছিলেন, তার চেয়েও অনেক শক্তভাবে পাল্টা লড়াই করতে শুরু করেছে ইউক্রেন। কিন্তু এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে, সেটা বলার মতো সময় এখনো আসেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভুল হিসাব-নিকাশ থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন পুতিন।

ইউক্রেনর রাজধানী কিয়েভ এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভ দখলের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। খেরসান শহর ইতিমধ্যেই রুশ বাহিনীর দখলে চলে গিয়েছে। কিন্তু রাজধানী কিয়েভ এবং খারকিভ শহরে যেমন চরম প্রতিরোদের মুখে পড়তে হচ্ছে রুশ বাহিনীকে, তেমনই দুই বন্দর শহর ওডেশা এবং মারিউপলও দখল করতে পারেনি তারা।

স্থলপথে ওই দুই বন্দর শহরে ঢুকতে না পারায় এবার জলপথে হামলা চালানোর পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল রাশিয়া। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, রাশিয়ার বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ ক্রিমিয়া থেকে ওডেশার দিকে এগোচ্ছে। বৃহস্পতিবারই ওই যুদ্ধজাহাজ থেকে বন্দর শহরে হামলা চালাতে পারে রুশ সেনারা।

রাশিয়া এখনও পর্যন্ত তার পুরো সামরিক শক্তি কাজে লাগায়নি। রাশিয়া সময় নিচ্ছে। কারণ তারা চাইছে শহরগুলো থেকে লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাক। কিংবা শহর খালি করে দিক। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে যাতে হতাহতের সংখ্যা না বাড়ে, তাই বিমান হামলা কম রেখে ইউক্রেনবাসীদের সময় দিতে চাইছে রাশিয়া।

বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে রাশিয়া। মস্কো থেকে রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিয়েভ থেকে বাসিন্দারা দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর ভ্যাসিলকিভের দিকে চলে যেতে পারবেন এবং এতে তাদেরকে বাধা দেওয়া হবে না।

আরও খবর...

এবার ইউক্রেনের দিকে এগিয়ে আসছে রুশ যুদ্ধজাহাজের বহর

যে চার পরিস্থিতিতে পারমাণবিক বোমা হামলা চালাবে রাশিয়া

যুদ্ধ আরও জোরদার করার আহ্বান জানালেন জেলেনস্কি

আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন পুতিন

রাশিয়ান বিমান বাহিনীর কী হল? বাড়ছে রহস্য!

ইউক্রেনে রক্তপাত অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানালো যুক্তরাষ্ট্র

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের প্রথম ৭ দিনে যা ঘটেছে

কিয়েভের বাসিন্দাদের চলে যেতে বলছে রাশিয়া

থমকে গেছে রুশ সেনা বহর, দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যে হুঁশিয়ারি দিলেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রাশিয়াকে যে পরামর্শ দিল চীন

ইউক্রেনের পর মলদোভায় হামলা চালাবে রাশিয়া?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত