ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে রাশিয়ার ৪০ মাইল দীর্ঘ সেই সেনা বহর। রাশিয়ার এই সামরিক বহর আজ সহ চার দিন ধরে কিয়েভ অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো শহরটিতে পৌঁছাতে পারেনি।
কিয়েভ ও অন্যান্য শহরে ইউক্রেনীয় সৈন্য এবং সাধারণ জনগণের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে তাদের অগ্রযাত্রা কিছুটা থমকে গেছে বলে ব্রিটিশ ও মার্কিন সামরিক গোয়েন্দারা জানিয়েছেন।
রাশিয়া ইউক্রেনর কৃষ্ণ সাগরের বন্দরনগরী খেরসন দখলে নেওয়ার পরদিন আজ ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বলেছেন, কিয়েভের দিকে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অগ্রযাত্রার গতি অনেক কমে গেছে। এর আগে গতকাল মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছিলেন রুশ সেনা বহর থমকে গেছে।
ইউক্রেনীয় বাহিনী এখনও খারকিভ এবং অন্যান্য বেশ কয়েকটি শহরে রুশ আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় কোনো রাষ্ট্রে সবচেয়ে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার পর ইউক্রেনে রুশ সৈন্যরা ব্যাপক রক্তক্ষয়ী অভিযান শুরু করেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইউক্রেনে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের প্রাণহানি এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী এখনও কিয়েভের ক্ষমতাসীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার হালনাগাদ গোয়েন্দা তথ্যে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ, রাশিয়ান্দের ভঙ্গুর কৌশল এবং যানজটের কারণে রাশিয়ার সামরিক বহরের প্রধান অংশটি এখনও কিয়েভ থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। কিয়েভে প্রবেশের ব্যাপক প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে রুশ এই বহর।
এতে বলা হয়েছে, গত তিন দিনে এই বহর খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। রাশিয়ার তীব্র গোলাবর্ষণ সত্ত্বেও খারকিভ, চেরনিহিভ এবং মারিউপোল এখনও ইউক্রেনীয়দের হাতে রয়েছে।
রাজধানী কিয়েভ এবং খারকিভ শহরে যেমন চরম প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে রুশ বাহিনীকে, তেমনই দুই বন্দর শহর ওডেশা এবং মারিউপলও দখল করতে পারেনি তারা।
স্থলপথে ওই দুই বন্দর শহরে ঢুকতে না পারায় এবার জলপথে হামলা চালানোর পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল রাশিয়া। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, রাশিয়ার বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ ক্রিমিয়া থেকে ওডেশার দিকে এগোচ্ছে। বৃহস্পতিবারই ওই যুদ্ধজাহাজ থেকে বন্দর শহরে হামলা চালাতে পারে রুশ সেনারা।
কিয়েভের ৫৮ কিলোমিটার উত্তরপশ্চিমের বোরোদিয়ানকার একজন বাসিন্দা শত্রুপক্ষের সঙ্গে তাদের শ্বাসরুদ্ধকর গোলাগুলির বর্ণনা দিয়েছেন রয়টার্সকে। রয়টার্সের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রুশ গোলার আঘাতে ভবনগুলো ধ্বংস হয়েছে, সড়কে সড়কে আগুন জ্বলছে এবং সামরিক যানবাহন ধ্বংস হয়ে গেছে।
নাম প্রকাশ না করে ইউক্রেনের এক নাগরিক বলেন, বোরোদিয়ানকার কেন্দ্রের একটি ডাকঘরের সামনের পার্কে রাশিয়ার সৈন্যরা তাদের বিএমপি গাড়ি (সামরিক যান) থেকে অনবরত গুলি ছুড়ছে। তিনি বলেন, ‘তারপর এই জারজরা ট্যাংক চালিয়ে দিয়েছে এবং ইতোমধ্যে আগুনে পুড়ে যাওয়া সুপারমার্কেটে গোলাবর্ষণ শুরু করেছে। এতে আবারও আগুন ধরে যায়’।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার প্রথম সপ্তাহ শেষে দেখা যাচ্ছে, ভ্লাদিমির পুতিন যেমনটা ভেবেছিলেন অথবা তার সেনাবাহিনীর জেনারেলরা তাকে যেরকম ধারণা দিয়েছিলেন, তার চেয়েও অনেক শক্তভাবে পাল্টা লড়াই করতে শুরু করেছে ইউক্রেন। কিন্তু এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে, সেটা বলার মতো সময় এখনো আসেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভুল হিসাব-নিকাশ থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন পুতিন।
রাশিয়া এখনও পর্যন্ত তার পুরো সামরিক শক্তি কাজে লাগায়নি। রাশিয়া সময় নিচ্ছে। কারণ তারা চাইছে শহরগুলো থেকে লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাক। কিংবা শহর খালি করে দিক। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে যাতে হতাহতের সংখ্যা না বাড়ে, তাই বিমান হামলা কম রেখে ইউক্রেনবাসীদের সময় দিতে চাইছে রাশিয়া।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে রাশিয়া। মস্কো থেকে রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিয়েভ থেকে বাসিন্দারা দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর ভ্যাসিলকিভের দিকে চলে যেতে পারবেন এবং এতে তাদেরকে বাধা দেওয়া হবে না।
ইউক্রেনে রাশিয়ার অত্যন্ত বিপজ্জনক সামরিক উপস্থিতির চিত্র দেখা গেছে স্যাটেলাইটে। ৪০ মাইলের দীর্ঘ একটি সামরিক বহর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উত্তর দিক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।
যে আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে রাশিয়া তড়িৎগতিতে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছে, সেটি এখন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে।
তার মাঝে নতুন করে শত শত সামরিক যান নিয়ে কিয়েভের দিকে রুশ সৈন্যদের এই বহর নিয়েও নানা ধরনের গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়া হয়তো তার আগ্রাসনের কৌশল পাল্টে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যে সামরিক বহর কিয়েভের দিকে এগোচ্ছে, তাতে সামরিক রসদ সরবরাহ ও সাঁজোয়া যান রয়েছে। রাজধানী ঘেরাও এবং পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা অথবা পুরোমাত্রার আক্রমণ চালানোর জন্য এই সামরিক বহর ব্যবহার করা হতে পারে।
লন্ডনের শীর্ষস্থানীয় পলিসি ইনস্টিটিউট চ্যাথাম হাউসের রুশ যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ বুলেগু নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, আমরা যা দেখছি তা মূলত দ্বিতীয় ধাপের কৌশল। এটি অত্যন্ত নৃশংস এবং অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে গতি বদল। যা ইউক্রেনে পুরো পরিস্থিতিকে অনেক বেসামরিক হতাহত এবং রক্তাক্ত যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে।
রাশিয়ার ওই সামরিক বহরের যথাযথ উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগাম ধারণা করা কঠিন বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, কিয়েভকে দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর জন্যও ওই বহরকে ব্যবহার করা হতে পারে। রাশিয়া প্রাথমিক কৌশল শেষে দ্বিতীয় স্তরের কৌশলে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রাথমিক কৌশল অনুযায়ী, ক্রেমলিনের নেতারা ভুলভাবে ধরে নিয়েছিলেন যে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ রুশ সামরিক বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে দ্রুত পরাজয়ের সম্মুখীন হবে। এছাড়া বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা লড়াই ছাড়াই রাশিয়ার সৈন্যরা দ্রুত বড় বড় শহরগুলো দখল করতে পারবে। কিন্তু ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী এবং হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া নাগরিকদের কঠোর প্রতিরোধের মুখে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অভিযান।
আরও খবর...
এবার ইউক্রেনের দিকে এগিয়ে আসছে রুশ যুদ্ধজাহাজের বহর
যে চার পরিস্থিতিতে পারমাণবিক বোমা হামলা চালাবে রাশিয়া
যুদ্ধ আরও জোরদার করার আহ্বান জানালেন জেলেনস্কি
আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন পুতিন
রাশিয়ান বিমান বাহিনীর কী হল? বাড়ছে রহস্য!
ইউক্রেনে রক্তপাত অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানালো যুক্তরাষ্ট্র
ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের প্রথম ৭ দিনে যা ঘটেছে
কিয়েভের বাসিন্দাদের চলে যেতে বলছে রাশিয়া
থমকে গেছে রুশ সেনা বহর, দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যে হুঁশিয়ারি দিলেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
