রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ০২:২২ এএম

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। দূরে থেকে মিত্র ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তা দেয় দেশটি। আর অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়াকে কাবু করতে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফায়দা কি কেবল অস্ত্র বেচে? নাকি যুদ্ধ দেশটিকে আরও অনেকভাবে সহায়তা করছে? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া   

ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ

২০১৭ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪.৭ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র ইউক্রেনে রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছিলেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ক্ষুব্ধ হতে পারেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলকে আরও সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে। এমনকি সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের পথও জটিল করে তুলতে পারে। এসব সতর্কবার্তা ও আশঙ্কা আমলে না নিয়ে ইউক্রেনে অস্ত্র রপ্তানি অব্যাহত রাখে ট্রাম্প প্রশাসন। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে হারিয়ে জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসলে পূর্ব ইউরোপের দেশটিতে অস্ত্র সরবরাহ নীতিতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা প্রদান আগের মতোই জারি রাখে বাইডেন প্রশাসন। বিশ্লেষকদের ২০১৭ সালের আশঙ্কা চার বছর পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ইউক্রেনে হামলার মধ্য দিয়ে সত্য বলে প্রমাণিত হয়।

পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার দুই দিন পর বিদেশি সহায়তা আইনের মধ্য দিয়ে কিয়েভে বাড়তি ৩৫ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র পাঠানোর নির্দেশ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন। গত কয়েক মাসের মধ্যে এটি ছিল ইউক্রেনে পাঠানো মার্কিন অস্ত্রের তৃতীয় চালান। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ও ডিসেম্বরে দুই দফা ইউক্রেনে মার্কিন অস্ত্র পৌঁছায়। রুশ অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন জানান, গত বছর ইউক্রেনকে এক বিলিয়নের বেশি ডলার মূল্যের নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল ওয়াশিংটন। ২০১৯ সাল থেকে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ বেড়ে যায়। অত্যাধুনিক এসব অস্ত্রের মধ্যে বহনযোগ্য ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে পাঠানো হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনকে ২০ কোটি ডলার মূল্যের নতুন সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেন বাইডেন। তার ওই অনুমোদনের পর ২২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের আটটি পণ্যবাহী বিমান ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে অবতরণ করে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও পণ্যবাহী বিমানে করে ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র।         

রমরমা সমরশিল্প

২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদালয়ের এক গবেষক বলেছিলেন, ‘ইউক্রেনে অস্ত্র বিক্রি আগুনে কেরোসিন ঢালার সমতুল্য।’ আন্তর্জাতিক গবেষক-বিশ্লেষকদের বারবার আপত্তি সত্ত্বেও ইউক্রেনে অস্ত্র বিক্রি কেবল অব্যাহতই নয়, বাড়িয়েও দেয় যুক্তরাষ্ট্র। কারণ যুদ্ধ-সংঘাত লাভজনক ব্যবসা। এটি অস্ত্র প্রস্তুতকারক ও ঠিকাদারদের হাতে কোটি কোটি ডলার মুনাফা এনে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। আর রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হলেও অস্ত্র সরবরাহের পরিমাণের দিক থেকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ। সুইডেনভিত্তিক সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ২৫টি কোম্পানি বিভিন্ন দেশে ৩৬১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে। ওই কোম্পানিগুলোর মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি কোম্পানিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এগুলো হচ্ছে লকহিড মার্টিন, বোয়িং, নর্থরপ গ্রুম্ম্যান, রেথিওন ও জেনারেল ডায়নামিকস। এই পাঁচ কোম্পানি ২০১৯ সালে এক বছরেই ১৬৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছিল। ২০১৮ সালে ইউক্রেনে ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাতে লকহিড মার্টিনের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

সামরিক সংঘাত অস্ত্র উৎপাদনের অর্থনীতি সচল রাখে। অস্ত্র বিক্রির অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে দশকের পর দশক ধরে চাঙ্গা করে আসছে। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে টানা দুই বছর বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যায় মার্কিন অর্থনীতি। বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু এই দুই দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মহামারীর সময় বেকার হয় লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক। কঠোর লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে হিমশিম খান যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের কোথাও যুদ্ধ লাগলে তা যে যুক্তরাষ্ট্রকে তার অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তা বলাই বাহুল্য। ইউক্রেনে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখলে পুতিন ক্ষিপ্ত হয়ে যুদ্ধের ডাক দিতে পারেন ভূ-কৌশলগত বিশ্লেষকদের এই সতর্কবার্তা তাই কানে তোলার খুব একটা দরকার ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের।      

প্রধানত জাতীয়তাবাদী চেতনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একের পর এক প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে উদ্বুদ্ধ করে রাজনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে অনভিজ্ঞ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে। সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের ঘনিষ্ঠতায় আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। তার ওপর জেলেনস্কির ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার তৎপরতা তাকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। পুতিনের আগ্রাসী তৎপরতা থামানো ও তাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক নেতা বললেও শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে যেতে রাজি হননি বাইডেন। ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দায়িত্ব সারেন তিনি। এমনকি রাশিয়া পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দিলেও বাইডেন তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি। যুক্তরাষ্ট্র চায় তার অস্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানি ও ন্যাটোভুক্ত মিত্র দেশগুলো ইউক্রেনে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখুক।   

লাভবান অন্যরাও

গত কয়েক মাসে পুতিনের কর্মকাণ্ড দেখে কারোরই বুঝতে বাকি ছিল না, ইউক্রেনে হামলা তিনি করবেনই। হামলার এক মাস আগে ২৬ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রুস এক রেডিও অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেন, ইউক্রেনে হামলা চালাতে দেশটির সীমান্তে হাজার হাজার রুশ সেনা প্রস্তুত, কেবল নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। লিজ ট্রুসের ওই ঘোষণার পর কী করল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য? ইউক্রেনে স্বল্পপাল্লার প্রায় দুই হাজার ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর অঙ্গীকার করে যুক্তরাজ্য। এসব ক্ষেপণাস্ত্র সুইডেন ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে তৈরি করে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ তীব্র ও দীর্ঘ হলে কেবল যুক্তরাষ্ট্রই নয়, লাভবান হবে অন্য দেশও। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, তুরস্কসহ আরও কয়েকটি দেশ ইউক্রেনকে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করে। এসব দেশের রাষ্ট্রসমর্থিত ও বেসরকারি কোম্পানি অস্ত্র বেচে এরই মধ্যে ব্যাপক মুনাফা করেছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

পূর্ব ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর সম্প্রসারণে দীর্ঘদিন ধরে বিরক্ত ছিলেন পুতিন। জোটটির এই সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ড রাশিয়ার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে মনে করেন তিনি। ইউক্রেনে আজ যা হচ্ছে, একই ঘটনা দেখা যায় জর্জিয়ার ক্ষেত্রেও। ২০০৮ সালে রাশিয়া-জর্জিয়া যুদ্ধের আগে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রতিশোধের হুমকি দিলে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র জর্জিয়ায় পাঠায়। বুশ প্রশাসন জর্জিয়াকে আশ্বস্ত করে এই বলে যে, রাশিয়া জর্জিয়ায় হামলা চালালে ন্যাটো বসে থাকবে না, রাশিয়ার বিরুদ্ধে সেও যুদ্ধে নামবে। ইউক্রেনের মতো জর্জিয়াও ন্যাটোর সদস্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কথায় আশ্বস্ত হয়ে ও বিপুল অস্ত্র পেয়ে উৎসাহিত হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালান জর্জিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিখেইল সাকাশভিলি। জর্জিয়ার অভিযানে হতাহত হয় দেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে অবস্থান করা রাশিয়ার শান্তিরক্ষী বাহিনীও। এই বাহিনী নব্বই দশক থেকে সেখানে অবস্থান করছিল। জর্জিয়ার প্রেসিডেন্টের ওই পদক্ষেপে ক্ষিপ্ত পুতিন যুদ্ধের ডাক দেন। রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না নেমে সেই সময় জর্জিয়ায় অস্ত্র সরবরাহের মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেন বুশ। আশ্বাস অনুযায়ী কাজ করেনি যুক্তরাষ্ট্র, যা এবার ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। বুশের উত্তরসূরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পুতিনের সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এটা ঠিক ওবামা আমলে ২০১৪ সালে ইউক্রেনের উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখল করেন পুতিন। তবে ওই ঘটনা যতটা না বৈশ্বিক, তার চেয়ে বেশি ছিল ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে পুতিনের দ্বন্দ্ব। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের মার্কিন নীতি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। তার পথ ধরে হাঁটেন বাইডেনও। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র প্রস্তুতকারক ও প্রতিরক্ষা ঠিকাদাররা মার্কিন সরকারের কোষাগার ভরলেও মূলত ইউক্রেনের জনগণকেই প্রকৃত মূল্য দিতে হচ্ছে।

ফায়দা পুনর্গঠনেও

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের স্কুল, হাসপাতাল, টার্মিনাল, বাড়িঘরসহ শত শত স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। দেশটির যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনে সময় লাগবে। সাধারণত স্বল্প সুদের ঋণ ও অর্থসাহায্য দিয়ে গঠিত তহবিল থেকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অঞ্চল মেরামত করা হয়। আফগানিস্তানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, পুনর্গঠন প্রকল্প দাতা দেশের কোম্পানিগুলোকে লাভবান করে। আফগানিস্তানে পুনর্গঠন দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিষ্ঠান স্পেশাল ইন্সúেক্টর জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশনের (সিগার) তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের পুনর্গঠন প্রকল্পে সব মিলে ব্যয় হয় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল অর্থের বড় একটি অংশ পায় পুনর্গঠন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মার্কিন বিভিন্ন কোম্পানি। ইউক্রেন পুনর্গঠনেও বিপুল অর্থের দরকার পড়বে। হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোভুক্ত ইউরোপের দেশগুলো ইউক্রেন পুনর্গঠনে এগিয়ে আসবে এবং আফগানিস্তানের মতোই লাভবান হবে।    

লাভের আরও দিক             

ইউক্রেন যুদ্ধ নিশ্চিতভাবে রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করবে। সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে একদিকে রাশিয়ার বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি এরই মধ্যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। দুর্বল অর্থনীতির রাশিয়াই যুক্তরাষ্ট্র চায় যাতে তার নেতৃত্বাধীন অক্ষের বাইরে চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বে শক্তিশালী নতুন বৈশ্বিক অক্ষ দাঁড়াতে না পারে। পূর্ব ইউরোপে ন্যাটো তার সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাশিয়াকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে। চির প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া দুর্বল হয়ে পড়লে পূর্ব ইউরোপে মার্কিন আধিপত্য বাড়বে। আফগানিস্তান থেকে গত বছর পিছু হটার পর বেকায়দায় থাকা যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে তার শক্তিমত্তা প্রদর্শনের সুযোগ ছাড়বে না।  

ইউরোপের দেশগুলোর গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করে রাশিয়া। গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে রাশিয়া ১৯২.৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস রপ্তানি করে, যা ছিল রাশিয়ার মোট রপ্তানির ৮১ শতাংশ। এই গ্যাস মূলত ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে পাইপলাইনে করে রাশিয়া থেকে ইউরোপে যায়। এ ছাড়া বাল্টিক সাগরের মধ্য দিয়ে পাইপলাইনে (নর্ড স্ট্রিম নামে পরিচিত) করে রাশিয়া থেকে জার্মানিতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর এই দুই পাইপলাইন দিয়ে রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আর এই অনিশ্চয়তার পুরো সদ্ব্যবহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে রাশিয়ার নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকে সুইফট লেনদেন স্থগিত করার পর দেশটির ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি কমে আসতে বাধ্য। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র গ্যাস উৎপাদন অনেক বাড়িয়েছে। চলমান সংকটে ইউরোপ রাশিয়া থেকে গ্যাস না পেলে সেই ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসবে যুক্তরাষ্ট্র।  

এ ছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধে রুবলের ব্যাপক দরপতন মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকায় বিনিয়োগে মানুষ আকৃষ্ট হবে বেশি। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সারা বিশ্বে যেসব ভূ-রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে, তা বরাবরই মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী করে। রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যকার উত্তেজনায় ডলারের মূল্য এরই মধ্যে বেড়েছে, আগামীতে আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইউরোপে অর্থলগ্নি নিরাপদ না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকবেন উদ্যোক্তারা। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেও। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশও সম্প্রতি রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়ে পড়বে। আর এটি হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র।  

যুদ্ধের উসকানি

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর পক্ষ থেকে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তারা ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে এক ইঞ্চি সম্প্রসারণও ঘটাবে না। তবে সেই অঙ্গীকার রাখেনি ন্যাটো। বেলারুশ ও ইউক্রেন ছাড়া রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সব দেশ এখন ন্যাটোর সদস্য। নিজেদের আত্মরক্ষামূলক জোট হিসেবে উপস্থাপন করলেও ন্যাটো মূলত অত্যন্ত আক্রমণাত্মক একটি জোট। পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ বন্ধে গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেশ কয়েকবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন পুতিন। তা সত্ত্বেও ন্যাটো কেন তার অঙ্গীকার রাখেনি বা ইউক্রেনকে জোটটিতে যুক্ত করার তোড়জোড় শুরু করে এসব প্রশ্নের উত্তর একটাই। রাশিয়া ও ইউক্রেনের আজকের সংকটের দরকার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও আধিপত্যবাদী অবস্থানের সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা চলমান যুদ্ধ।      

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত