বিদেশে থেকে অনলাইনে জুয়ার আসর পরিচালনার সঙ্গে জড়িত দেশের এজেন্টরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করছে। এই লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছেন মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা। সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা এ তথ্য দিয়েছেন।
তারা বলছেন, বাংলাদেশে সক্রিয় চক্রগুলোর ব্যবহার করা ৫টি অ্যাপের তথ্য তারা পেয়েছেন। এসব অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৩০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিদিন আরও অসংখ্য অ্যাপের মাধ্যমে অর্জিত কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তাদের ধারণা, ভারত ও রাশিয়া থেকে বেশিরভাগ অনলাইন জুয়ার আসর পরিচালনা করা হচ্ছে।
তদন্তকারী সূত্র বলছে, বেটকিউএল, বেট স্টাম্প, ওয়ানএক্সবেট, মোস্টবেট ছাড়াও বিভিন্ন নামের অ্যাপে মোবাইল ফোনে চলছে জুয়া খেলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অনলাইন জুয়ার (বেটিং) গ্রাহক সংগ্রহ চলছে। অনলাইন জুয়ায় গ্রাহকদের একটি বড় অংশই ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবক। অনলাইন জুয়ার সাইটগুলোর সুপার অ্যাডমিন, সুপার এজেন্ট, মাস্টার এজেন্ট ও লোকাল এজেন্ট রয়েছে। এসব অ্যাপের সুপার অ্যাডমিনরা থাকে দেশের বাইরে। এজেন্টদের মাধ্যমে জুয়ার টাকা পৌঁছে যাচ্ছে তাদের কাছে।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কিছু বিক্রয় প্রতিনিধি, ডিপো ব্যবস্থাপক ও এজেন্ট অনলাইন জুয়ার বাংলাদেশের এজেন্ট। বিক্রয় প্রতিনিধিরা তাদের অধীন এজেন্টের কাছ থেকে এজেন্ট সিম ভাড়া নিয়ে জুয়ার টাকা লেনদেন করছে। গত বছরের নভেম্বরে এমন কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাদের মধ্যে আছে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার মো. শিশির মোল্লা, মেহেরপুরের মুজিবনগরের মো. স্বপন মাহমুদ, একই এলাকার মো. সাদিক ও আসলাম উদ্দিন। তাদের মধ্যে শিশির একটি মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি। তিনি এজেন্ট দোকানদারদের কাছ থেকে এজেন্ট সিমকার্ড সংগ্রহ করে তার ডিপোর ব্যবস্থাপককে দিতেন। এসব সিম জুয়ার টাকা লেনদেনে ব্যবহার হচ্ছে।
সিআইডির সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন, নাজমুল হক সুমন, আব্দুল হালিম, মো. জহিরুল ইসলাম, মো. শিপনসহ আরও অনেককে চিহ্নিত করা গেছে, যারা মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে নাজমুল হাসান সুমন চুয়াডঙ্গা জেলার একটি ডিপোর ব্যবস্থাপক, আব্দুল হালিম মেহেরপুর জেলার একটি ডিপোর ব্যবস্থাপক, জহিরুল একই জেলার ডিপোর একজন বিক্রয় প্রতিনিধি। তাদের সহায়তায় জুয়ার এজেন্টরা টাকা লেনদেন করে। এর বিনিময়ে তারা বিভিন্ন হারে কমিশন নেয়। চিহ্নিত করা এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মাহমুদুল ইসলাম তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওয়ানএক্সবেট ও মোস্টবেট নামের দুটি অনলাইন সাইটে ৩ কোটি টাকার জুয়া খেলা হলে ৫ লাখ টাকা কমিশন দেওয়া হয় বাংলাদেশের এজেন্টদের। একটি সাইটে গড়ে ১০ দিনে ৩ কোটি টাকার জুয়া খেলা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (ডিবি) কর্মকর্তারা সিয়াম আহমেদ ও আলী খান নামের দুটি ভুয়া ফেইসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া পরিচালনার তথ্য পায়। অনুসন্ধান শেষে ওই চক্রের তিন বাংলাদেশি এজেন্টকে রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করে।
এই তিনজনের একজন তরিকুল ইসলাম ওরফে বাবু। তিনি অনলাইন জুয়ার সাইট এজিডটবেটবাজ৩৬৫ডট লাইভের সুপার এজেন্ট। তার ফোনে জুয়ার কয়েক কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। অন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে তরিকুল জুয়ার টাকা লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাতটি হিসাব নম্বর এবং অন্য দুটি বেসরকারি ব্যাংকের তিনটি ও একটি সরকারি ব্যাংকের দুটি হিসাব নম্বর রয়েছে। এ ছাড়া তিনটি মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের ৭টি এজেন্ট নম্বর ও ১০টি পার্সোনাল নম্বরেও জুয়ার টাকা গ্রহণ করেছেন তরিকুল। একটি বেসরকারি ব্যাংকে ইলিউশন ইনটেরিয়র নামে খোলা হিসাব থেকে এসব টাকা বিদেশে পাঠিয়েছেন তিনি।
গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন রানা হামিদ ও সুমন মিয়া। সুমনের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। তাদের কাছ থেকে আরও অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন বাংলাদেশি এজেন্টের তথ্য পেয়েছে ডিবি।
ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, সিয়াম আহমেদ ও আলী খান নামের দুজনের ফেইসবুকের তথ্যের সূত্র ধরে তরিকুলসহ ওই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জুয়ার (বেটিং) ওয়েবসাইটের সুপার অ্যাডমিনের কাছ থেকে প্রতিটি পিবিইউ (নিজস্ব ভার্চুয়াল মুদ্রা) ৬০ টাকায় কেনে বাংলাদেশের সুপার এজেন্টরা। তাদের কাছ থেকে প্রতিটি ১০০ টাকায় কেনে মাস্টার এজেন্টরা। এদের কাছ থেকে প্রতিটি পিবিইউ ১৫০ টাকায় কিনে নিয়ে স্থানীয় এজেন্টরা গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। জুয়ার গ্রাহক সংগ্রহ করা হয় মূলত ভুয়া ফেইসবুক আইডি খুলে। গ্রাহক সংগ্রহ করে স্থানীয় এজেন্টরা। এভাবে গ্রাহক থেকে স্থানীয় এজেন্ট, অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন তারা। ওই কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে আলাদা সুস্পষ্ট কোনো আইন নেই। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। ফলে অনলাইন জুয়ার টাকা যে ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়, সেটি সহজে ফ্রিজ করার (সাময়িক স্থগিত) কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই। মানি লন্ডারিং আইনে ওই সব অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে হয় যা সময় সাপেক্ষ।
গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের ইনচার্জ অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আশরাফউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি বেটিং (জুয়া) সাইটের অনলাইন অ্যাকাউন্টে সাড়ে ৬ কোটি টাকা থাকার তথ্য তারা পেয়েছেন। অন্য একটি অ্যাকাউন্টে ৫০ কোটির বেশি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, অনলাইন জুয়া নিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কাজ করছে। অনেক সাইট তারা বন্ধও করেছে। বারবার এসব জুয়ার সাইট বন্ধ করলেও নতুন সাইট খুলছে চক্রগুলো। এ ছাড়া কেউ কেউ প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে পরিচালনা করছে।
