সরকারের ভুল নীতিতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় শ্রীলঙ্কায়

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২২, ১০:৪০ পিএম

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের ভুল নীতির মাশুল দিচ্ছে জনসাধারণ। সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে ভারত ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দিকে ঝুঁকেছেন রাজাপাকসে। সহায়তা কি পারবে শ্রীলঙ্কাকে এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কা

দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগতে থাকা শ্রীলঙ্কাকে রক্ষা করতে ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী গোতাবায়া রাজাপকসে বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করবে তার সরকার। নির্বাচনী প্রচারণায় এ নিয়ে নিজস্ব ভিশনও জনসম্মুখে তুলে ধরেন রাজাপকসে। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়ী হলেও শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা দূর করতে পারেননি রাজাপাকসে। তার ভিশন আর যাই হোক, জনকল্যাণে আসেনি। বরং ২০১৯ সাল বা তার পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ খারাপ হয়েছে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে ক্ষমতায় বসার তিন বছরের মাথায় শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। দেশজুড়ে বিদ্যুতের বেহাল দশা, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর আকাশচুম্বী মূল্য বিপর্যস্ত করে তুলেছে মানুষের জীবন। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কার আপামর জনসাধারণ। অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ও তার পরিবারকে দায়ী করে রাস্তায় নামেন তারা। পরিস্থিতি সামলাতে কারফিউ জারি করে রাজাপাকসে সরকার। শ্রীলঙ্কার চলমান সংকট এত তীব্র আকার ধারণ করে যে, অনেকে মনে করছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখবে দক্ষিণ এশিয়ার এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র।

শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি সিলন পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে অনুরোধ করে বলা হয়, জনসাধারণ যাতে ডিজেলের জন্য লাইনে না দাঁড়ায়। কারণ অর্থের অভাবে ৩৭ হাজার ৫০০ টন ডিজেলের চালান আনতে পারেনি সিলন পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিনিয়ত শ্রীলঙ্কার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। সেসব সাক্ষাৎকারে হাসপাতালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যালের মারাত্মক সংকট উঠে আসে। এসব ওষুধ ও কেমিক্যাল বাইরের দেশ থেকে আমদানি করে থাকে শ্রীলঙ্কা। গত বছরের ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কার বাণিজ্য ঘাটতি দ্বিগুণ হয়ে ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে ঠেকে। গত মাসে শ্রীলঙ্কার কাছে ২৩০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে দেশটিকে ১০০ কোটি ডলার বকেয়া পাওনা (বন্ড) পরিশোধ করতে হবে। পরিস্থিতি সামলাতে সম্প্রতি দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে শ্রীলঙ্কা কর্র্তৃপক্ষ। পাশাপাশি আমদানি কমানো হয়েছে, জ্বালানি মূল্য ও সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। শ্রীলঙ্কা সরকারের এসব পদক্ষেপের এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সুফল পায়নি দেশবাসী। প্রধান সূচক পাঁচ শতাংশে নামলে গত সপ্তাহে পরপর দুদিন শেয়ারবাণিজ্য সংক্ষিপ্তভাবে স্থগিত করা হয়। শেয়ারবাজারে পতন অব্যাহত থাকায় গত সোমবার লেনদেন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় শ্রীলঙ্কা।

ভুলনীতি

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়াতে অন্যতম ভূমিকা রাখে করোনাভাইরাস মহামারী ও চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। করোনা মহামারী শ্রীলঙ্কার পর্যটনশিল্পে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের মূল্য রাতারাতি অনেক বেড়ে যায়। তবে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি এতটা নাজুক হয়ে পড়ার প্রধান কারণ কিন্তু অন্য জায়গায়। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার ক্ষমতায় বসলে মূলত দেশটির অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হতে শুরু করে। তার কড়া শাসন দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আর এতে সহযোগিতা করে কট্টরপন্থি সিংহলি বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কার সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিয়ন্ত্রিত সংগঠন ভিয়াথমাগাসহ বেশ কয়েকটি সিংহলি সংস্কৃতির ধারক ও কট্টর মতাদর্শের সংগঠন প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের শাসনব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এসব সংগঠন শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা রূপান্তরের সৈনিকে পরিণত হয়। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের পূর্বসূরি ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি ও শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের তিন বছরের ব্যর্থ শাসনের পর সিংহলি বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী ও ভিয়াথমাগার মতো সংগঠনগুলো কেন্দ্রীভূত শাসনের মডেল দরকার বলে প্রচার চালায়।

প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে ক্ষমতায় বসার পর শ্রীলঙ্কার ভাগ্য নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে ও অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে ‘ভিসটাস অব প্রসপেরিটি অ্যান্ড স্পলেন্ডার’ নামে নতুন এক পলিসি ভিশন প্রকাশ করা হয়। এই ভিশন প্রণয়নে ভিয়াথমাগারও হাত ছিল। শ্রীলঙ্কাকে অগ্রগতির পথে নিতে এই ভিশন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করে রাজাপাকসে সরকার। এই ভিশনে বলা হয়, বিদ্যমান কর ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়তে ভূমিকা রাখছে। করব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে তাই ব্যাপক আকারে কর কমানোর উদ্যোগ নেয় রাজাপাকসে সরকার। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, কর কমানোর ফলে সরকারের ২৮ শতাংশ রাজস্ব আয় কমে যায়। আগের সরকারের রাজস্ব একত্রীকরণের ব্যবস্থা বাতিল করার রাজাপাকসের এই পদক্ষেপ জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি। এ ছাড়া রাজাপাকসে সরকারের এই পদক্ষেপ ছিল ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি পর্যালোচনার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইএমএফ তাদের পর্যালোচনায় বলেছিল, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি গতিশীল করতে ২০২০ সালে রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি।

কর বিষয়ে রাজাপাকসে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ফলে ২০২০ সালে রাজস্ব আয় কমে যায় শ্রীলঙ্কার। পাশাপাশি সরকারের ব্যয় যায় বেড়ে। দ্বীপরাষ্ট্রটির রাজস্ব আয় অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। পরে আইএমএফ শ্রীলঙ্কায় তাদের সহায়তা কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে। ২০২০ সালের শুরুতে করোনাভাইরাস মহামারী দেশটির রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ পর্যটনশিল্প শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার বড় জোগানদাতা। করোনার সংক্রমণ মোকাবিলায় ২০২০ ও ২০২১ সালে দেশে দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একের পর এক লকডাউনের কারণে শ্রীলঙ্কার অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উৎস প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে।

২০২০ সালের এপ্রিল-মে মাসে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌম ঋণমান বি-নেগেটিভ মানে নেমে যায়। এর কারণ হিসেবে রাজাপাকসে সরকারের কর কমানোর সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হয়। কারণ এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ভেতর ও বাইরে ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এ ছাড়া দেশটির সার্বভৌম ঋণমান আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার থেকে শ্রীলঙ্কাকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌম ঋণমান কমতে কমতে নিচের দিকের ‘সিসি’ মানে নেমে আসে। করোনা মহামারীর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে শ্রীলঙ্কায় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান কমে গেলে বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করে শ্রীলঙ্কা সরকার। ২০২০ ও ২০২১ এই দুই বছর এভাবেই রিজার্ভ ব্যবহার করে ঋণ চুকায় দেশটি। স্বাভাবিকভাবেই একপর্যায়ে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে শুরু করে। ২০১৯ সালের ৭.৬ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ ২০২১ সালের অক্টোবরে ২.৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রিজার্ভ মাসের পর মাস কমতে থাকলেও আইএমএফের কাছে জরুরি বেলআউটের (শর্তসাপেক্ষে ঋণমুক্তির সুবিধা) জন্য আবেদন করার প্রয়োজন মনে করেনি শ্রীলঙ্কা সরকার। কারণ রাজাপাকসে পরিবারসহ শ্রীলঙ্কার কট্টর জাতীয়তাবাদীরা মনে করেছিলেন, আইএমএফের কাছে সহযোগিতার জন্য গেলে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করা হবে।

ভারত ও আইএমএফের সহায়তা

আইএমএফের দ্বারস্থ না হয়ে বরং চীন ও ভারতের সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি করে শ্রীলঙ্কা সরকার। এই উদ্যোগ রিজার্ভকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করলেও কলম্বোর ভেঙে পড়া আর্থিক ব্যবস্থা মেরামতে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। চলতি বছরের শুরুর দিকে শ্রীলঙ্কার প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ এক বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। রিজার্ভের এই বেহাল অবস্থা দেখে একই সঙ্গে ভারত ও আইএমএফের কাছে জরুরি সহায়তা চায় কলম্বো। শ্রীলঙ্কার তীব্র অর্থনৈতিক সংকট দেখে দেশটিকে সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। ভূরাজনীতিতে চীনকে মোকাবিলা করতে হলে শ্রীলঙ্কাকে পাশে রাখা দরকার নয়া দিল্লি সরকারের। তাই সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে জ্বালানি তেল, ওষুধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে শ্রীলঙ্কাকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয় ভারত। এ ছাড়া দেড় বিলিয়ন ডলারের আরেক দফা ঋণের জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে শ্রীলঙ্কার। বলাই বাহুল্য, বেলআউট সুবিধা নিশ্চিত না করলে শ্রীলঙ্কাকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। চলতি বছরেই ধার করা ৬.৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করা ছাড়া শ্রীলঙ্কার কোনো উপায় নেই, যেখানে দেশটির রিজার্ভে রয়েছে এক বিলিয়ন ডলারেরও কম অর্থ। দেউলিয়া থেকে বাঁচতে পর্যাপ্ত তহবিলের উৎস আইএমএফের কাছে ধরনা দেওয়া ছাড়া কলম্বোর বিকল্প পথ নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দায় অস্বীকার

শ্রীলঙ্কার চলমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য অবশ্য নিজেদের দায়ী ভাবতে রাজি নয় রাজাপাকসে সরকার। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে স্পষ্ট করে জানান, দেশের সংকটের দায় তার নয়। আইএমএফের বেলআউটের শর্ত মানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সরকার। এ নিয়ে এপ্রিলে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। তিনি বলেন, ‘আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে কাজ করব।’ প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের এই ভাষণ শুনে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এক ধরনের উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের ধারণা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়ে পড়বে। তাদের এই উদ্বেগ দূর করতেই প্রেসিডেন্ট ভাষণে এমনটা বলেছেন।

লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার মতো ঋণের ভারে ন্যুব্জ শ্রীলঙ্কা আইএমএফের কাছে সহায়তা চাওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের দরজায়ও কড়া নাড়ে। আন্তর্জাতিক এই দুই আর্থিক সংস্থার কাছে সহায়তা চাওয়াকে শ্রীলঙ্কার কর্মকর্তারা দেশের বাজেটের জন্য চাওয়া হচ্ছে বলে অভিহিত করেন। শ্রীলঙ্কার সহায়তা আবেদন প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, সহায়তা নিয়ে কলম্বোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তাদের। তবে শ্রীলঙ্কার টেকসই উন্নয়নের জন্য গঠনমূলক কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যাংকের আলোচনা চলছে। টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নে ভবিষ্যতে কী কী সহায়তা শ্রীলঙ্কাকে ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়া যেতে পারে এ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কলম্বো শেষ পর্যন্ত আইএমএফের বেলআউট সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে। তবে ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের পথ অনেক দীর্ঘ ও কঠিন হতে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কার জন্য। কারণ বেলআউট সুবিধার বিনিময়ে আইএমএফের প্রস্তাবিত কাঠামোগত সংস্কার দেশটি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তার ওপর সংকট সমাধান নির্ভর করছে।

উত্তরণের পথ

বেলআউট সুবিধার বিনিময়ে শ্রীলঙ্কাকে আইএমএফ যেসব সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে তা হলো, সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া, রুপি ছাপা বন্ধ করা, বিনিময় হার বাজারভিত্তিক (ফ্লোটিং রেট) করা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবলের একাংশ ছাঁটাই করা। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আইএমএফের দেওয়া এসব সংস্কার প্রস্তাব যদি শ্রীলঙ্কা সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলেও কাক্সিক্ষত ফল পেতে অপেক্ষা করা লাগবে। কারণ পর্যটনসহ অন্য শিল্পগুলো রাতারাতি মুনাফা করতে পারবে না কারণ তার আগে দেশটিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, জ্বালানি তেল ও ওষুধ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল শ্রীলঙ্কা পদুজানা পেরামুনাকে (এসএলপিপি) নিশ্চিত করতে হবে যে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কার প্রস্তাবের বিপক্ষে অনিবার্য তীব্র প্রতিক্রিয়ায় যাতে দলটির অভ্যন্তরীণ সংহতি ক্ষুন্ন না হয়। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রস্তাবের বিপক্ষে বিক্ষোভ যদি সামাল দিয়ে এসএলপিপি সরকার টিকে যেতে পারে, তাহলে একটি কাজ তাদের অবশ্যই ও দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। সেটি হলো, ব্যাপক হারে সরকারের খরচ কমানো ও বিরোধী দলের সঙ্গে বসে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। মোদ্দাকথা হলো, ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে এসএলপিপিকে এখন বিরোধী দলকে বাদ না দিয়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে, যে সংস্কৃতি রাজাপাকসে সরকার ক্ষমতায় বসার পর চর্চা করেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত