বিশাল বহরের প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার আমাদের। এই বৃহৎ পরিবারে শিক্ষক নিয়োগ, তাদের পদায়ন, বেতন-ভাতা, অবসরগ্রহণ ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক কাজকর্মেই জাতীয় পর্যায়ের পুরো প্রশাসন ব্যস্ত থাকে। তাই শিক্ষাদান বিষয় তদারকি করা ও শিক্ষার মান নিয়ে কাজ করার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দৃষ্টিগোচর হয় না। অবশ্য এসব নিয়ে ভাববার আগে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রের পুরো চিত্রটা নানা দিক থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করা জরুরি।
২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৯০২টি (আবার কোথাও দেখেছি ৬৫ হাজার ৬৫০)। ২০১৯ সালের তথ্যানুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ৪ চার লাখ। অবশ্য ২০২০ সালে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে ২৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ২০২১ সালে ৩২ হাজার সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০১৭ সালের তথ্যানুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ কোটি ৯ লাখ ১৯ হাজার ২০১ জন।
চলতি ২০২১-২০২২ অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষায় সরকার ২৬ হাজার ৩১১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। কিন্তু বিগত এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে যে বিষয়টি আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তা হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অথচ এখন সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগসহ নানা ধরনের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করছে। এমনকি সরকারি প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বছরে ৪০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান তদারকির জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে কয়েকজন কর্মকর্তা নাকি আছেন। তবে তাদের দৃশ্যমান কোনো কর্মকা- আমরা খুব একটা প্রত্যক্ষ করছি না। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের সবাই সবেতনে পিটিআই প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছাড়াও নিয়মিত নানা ধরনের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ লাভ করে থাকেন। এগুলো সবই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু আমরা শিক্ষার মানের জায়গাটিতে প্রশংসা করতে পারছি না।
এই হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে ‘পিইডিপি-৪’ প্রোগ্রামের অধীনে। এর সঙ্গে ব্রিটিশ কাউন্সিলকে প্রাথমিক শিক্ষকদের ইংরেজি প্রশিক্ষণ প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যে প্রকল্পের ব্যয় বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ। ২০১৯ সালে সরকার ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইন্টারভেনশন হিসেবে টিএমটিই (ট্রেনিং অব মাস্টার ট্রেইনার্স ইন ইংলিশ) অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ৪৭ কোটি ব্যয়ে এই প্রকল্পটি পরিচালনার কথা বলা হয়। এটি ১৩ সপ্তাহব্যাপী ইংরেজি প্রশিক্ষণ। লক্ষ্য হলো, দেশের ১৫টি পিটিআইতে ২০০০ প্রাথমিক শিক্ষককে ইংরেজি মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে তৈরি করা হবে, যারা ইংরেজিতে দক্ষ হবেন এবং ফলপ্রসূ শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তাদের স্বচ্ছ ধারণা থাকবে।
বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক স্বল্পতার মধ্যেও মোটামুটি ১,৩০,০০০ প্রাথমিক শিক্ষক ইংরেজি পড়িয়ে থাকেন। মাস্টার ট্রেইনাররা ইংরেজি শিক্ষকদের ইংরেজির চারটি দক্ষতা (লিসেনিং, স্পিকিং, রিডিং, রাইটিং) বৃদ্ধির জন্য কাজ করবেন। এছাড়াও তাদের উপস্থাপন দক্ষতা, ফলপ্রসূভাবে ভাষাশিক্ষার ক্লাস পরিচালনা করা এবং পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার বিষয়ে কাজ করবেন।
আমরা জানি ইংরেজি এখন শুধু একটি ভাষা নয়, এটি বহির্বিশে্বর সঙ্গে যোগাযোগ, সম্পর্ক স্থাপন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার। এই ভাষায় আমরা পিছিয়ে আছি। আর এর প্রথম দুর্বলতাই শুরু হয় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে, সেই দুর্বলতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করে যায় কিন্তু ভাষার ভিত আর গড়ে ওঠে না। অনেকে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় কিংবা পরিবেশের কারণে পরবর্তী সময়ে এই ভাষায় দক্ষতা অজর্ন করে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেটি খুব একট হচ্ছে না। তাই বিদেশে গিয়েও অন্যান্য দেশের গ্রাজুয়েটদের কাছে এমন শিক্ষার্থীদের হেরে যেতে হয়। এর প্রধান কারণ ইংরেজি আমরা পড়াই একটি বিষয় হিসেবে, এটিতে দক্ষতা অর্জন করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কাজে লাগানোর জন্য নয়। প্রাথমিক শিক্ষকদের এভাবে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং তাদের মাধ্যমে অন্য শিক্ষকদের এবং শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দক্ষ করে গড়ে তোলার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেটি একটি চমৎকার উদ্যোগ।
বিভিন্ন দলে ভাগ করে কমবেশি দুই হাজার প্রাথমিক শিক্ষককে ইংরেজি ভাষা বিষয়ক দক্ষতা ও শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে উন্নতি করার লক্ষ্যে বিস্তৃত পরিসরের প্রকল্প হলো টিএমটিআই (ট্রেনিং অব মাস্টার ট্রেইনার্স ইন ইংলিশ)। এর প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে ১৭ জুন ২০২১। তারা শুরু করেছিলেন ৩১জানুয়ারি ২০২১। এটি মূলত ১৪ সপ্তাহের জন্য গাজীপুর ও ঢাকার দুটো পিটিআইতে শুরু হয়। কেউ কেউ এটি ২০২০ সালের নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বরে শুরু করেন যখন ছোট একটি দল অনলাইনে লার্নিং ম্যাটেরিয়ালস ট্রায়ালিং করেন। কিন্তু করোনার কারণে তারা পিটিআই ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। তবে প্রশিক্ষকরা অনলাইনে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন। প্রতি সপ্তাহে সেখানে সেলফ-স্টাডি, প্র্যাকটিস, লাইভ ওয়েবিনারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ধাপে ব্রিটিশ কাউন্সিল ৬ জেলায় ২২০ জন প্রাথমিক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। যারা নিজস্ব এলাকার স্কুলগুলোতে উন্নত ও গুণগতমানের ইংরেজি শিক্ষা দিতে পারবে। দ্বিতীয় গ্রুপের শিক্ষকরা ১৪ সপ্তাহের পেশাদার দক্ষতা অর্জনের পথচলা শুরু করেছিলেন ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর এবং শেষ হয়েছে ২৭ জানুয়ারি ২০২২।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইংরেজি ও শিক্ষা পরিচালক ডেভিড আর মেনার্ড বলেন, ‘এটি আমাদের সবার জন্য একটি কঠিন যাত্রা ছিল; কিন্তু আমি নিশ্চিত যে প্রশিক্ষণটি অনুপ্রেরণাময়, আনন্দদায়ক এবং কার্যকর ছিল এ ব্যাপারে আপনারা সবাই একমত হবেন। আপনারা যখন আপনাদের স্কুলে ফিরে যাবেন এবং তরুণ শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করবেন, তখন আপনি এই প্রশিক্ষণটিকে কার্যকর করতে এবং মানসম্পন্ন ইংরেজি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে অন্য শিক্ষকদের সহায়তা করতে পারবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সবার জন্য ইংরেজির মান উন্নত করাই এ প্রোগ্রামের মুখ্য উদ্দেশ্য।’
বর্তমানে এই প্রকল্পের তৃতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণ চলছে এবং আমি ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিকভাবে প্রাথমিক শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। তাদের মধ্যে নতুন এক উদ্দীপনা কাজ করছে, যা নিশ্চয়ই ভালো লাগার একটি বিষয়।
টিএমটিই প্রজেক্টের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রাক-প্রশিক্ষণ ভাষা মূল্যায়ন রূপে তিন হাজারের বেশি ‘অ্যাপটিস টেস্ট’ পরিচালনা করে। ‘অ্যাপটিস’ হচ্ছে আধুনিক ও নমনীয় ইংরেজি ভাষার দক্ষতা পরীক্ষা। এটি তৈরি করা হয়েছে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংস্থা কিংবা ব্যক্তির বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ভাষাবিদগন এটি উদ্ভাবন করেন। মূল্যায়ণের সর্বশেষ গবেষণার ফল এটি। কোনো ভাষার ওপর প্রশিক্ষণ নিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য এই পদ্ধতি একটি মাইলফলক। এ টেস্টে গ্রামার এবং ভোকাবিউলারি অংশের পরীক্ষা হয় ২৫ মিনিট, স্পিকিং ১২ মিনিট, লেখা ৫০ মিনিট, পড়া ৩৫ মিনিট এবং শ্রবণ ৪০মিনিট। তবে, এর হেরফের আছে টেস্ট বুঝে। যেমন অ্যাপটিস টেস্ট অ্যাডভান্সড, অ্যাপটিস ফর টিচার্স কিংবা অ্যাপটিস ১৩-১৯ বয়সীদের জন্য।
প্রাথমিক অবস্থায় এই পরীক্ষাগুলো সরাসরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কভিড-১৯ এর কারণে পরীক্ষাগুলো অনলাইনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ পরীক্ষায় ৯৪ শতাংশের বেশি প্রশিক্ষণার্থী ইউরোপিয়ান ফ্রেমওয়ার্কের ‘এ-২’ কিংবা তারও ওপর যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এটিও একটি আনন্দের সংবাদ। একজন প্রশিক্ষণার্থী যথার্থই বলেছেন, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা জেনেছি বইয়ের একটি পাঠকে কীভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ও আনন্দদায়ক করা যায়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে এবং শিক্ষাদানের চমৎকার পরিবেশ কীভাবে সৃষ্টি করতে হয় সেটিও জেনেছি। আমরা এর অংশীদার হতে পেরে গর্বিত।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের পরিচালক মিসিইওসসিয়া বলেন, ‘আগামী বছরগুলোতে আরও বহু প্রাথমিক শিক্ষক এই প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করবেন যা তাদের শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের ধনাত্মক প্রভাব ফেলবে, তারা তাদের ইংরেজি ভাষার উন্নয়ন ঘটাবেন। যেহেতু শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে পদার্পণ করবে সেই বিষয়টি তাদের খুব কাজে লাগবে। উন্নতমানে ইংরেজি পড়ানোর বিষয় নিশ্চয়ই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে অনেক সুফল বয়ে আনবে।’
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার বড় অংশটিই পরিচালিত হয় রাষ্ট্রের সরাসরি তত্ত্বাবধানে, এর বাইরেও কিন্তু বিশাল একটি অংশ রয়েছে (কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি প্রাইমারি)। এসব স্কুলের শিক্ষকদের জন্যও টিএমটিই-র অনুরূপ কোনো প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব) বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য এমন প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে পারে। এটি অনলাইন কিংবা অফলাইনে করা যেতে পারে, অথবা ব্লেন্ডেড লার্নিং মুডেও করা যেতে পারে। বেসরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক নেতারা বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারেন।
লেখক শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক গবেষক
