কংগ্রেসের প্রয়োজন প্রকৃত সংস্কার ঘষামাজা নয়

আপডেট : ১৭ মে ২০২২, ১০:২০ পিএম

ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস উদয়পুরে তাদের ‘জীবনের শেষ চিকিৎসা’ শিবিরে তিন দিন কাটাল। ‘চিন্তন শিবির’ বা পর্যালোচনা বৈঠক নামের এ কর্মসূচিতে দলকে ঢেলে সাজিয়ে চাঙ্গা করার বিষয়ে আলোচনা হয়। গুরুতর নেতৃত্বের সংকটের কারণে প্রাচীন দলটি এখন শ্রান্ত-ক্লান্ত। ফলাফল : একের পর এক রাজ্য হাতছাড়া হওয়া। দুটি ব্যতিক্রম : রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়।

অন্তর্বর্তীকালীন কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী এবং তার দল চালানো দুই সন্তান রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে, তারা এখনো রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে আছেন এবং নেতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব পালনে সক্ষম। রাহুল গান্ধীর নেপালে অবকাশ কাটানোর ভিডিও প্রকাশের পরে অনুষ্ঠিত হয় এবারের চিন্তন শিবির। সমালোচনার দারুণ খোরাক পেয়ে যায় বিজেপি। বিজেপির প্রচারণা মতে, ভিডিওটি প্রমাণ করে, দলের বিপর্যয়ের সময় রাহুল অবকাশ যাপন করেন। উপসংহার : তিনি রাজনীতিক হিসেবে সিরিয়াস নন।

রাহুল গান্ধী দলের সভাপতি হিসেবে ফিরবেন কি-না বা কবে নাগাদ ফিরবেন সে বিষয়ে কংগ্রেসের পুরনো বিশ্বস্ত নেতা বা ভিন্নমতাবলম্বী (‘জি ২৩’ হিসেবে পরিচিতরা) কেউই স্পষ্ট করে কিছু জানেন না। এই বিষয়ে অনিশ্চয়তা অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপরই প্রভাব ফেলছে।

পদ বা মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলটি ‘এক পরিবার এক টিকিট’ নিয়ম গ্রহণ করেছে। এর ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে। যদি কেউ দলের জন্য পাঁচ বছরের বেশি কাজ করে থাকেন সে ক্ষেত্রে তিনি ও তার সরাসরি আত্মীয় পদে থাকতে পারবেন। বলাবাহুল্য, বিষয়টা গান্ধী পরিবারের জন্য সুবিধাজনক। সুবিধাজনক দলটির ইতিহাস বা বোঝার অংশ (আপনি যেভাবেই দেখেন) দলের অন্য রাজনৈতিক বংশগুলোর জন্যও।

কংগ্রেস জানিয়েছে, বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘৫০ এর নিচে ৫০’ নীতি : সব পদ এবং কমিটির অর্ধেক স্থান ৫০ বছরের কম বয়সীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ভারতের প্রাচীনতম দলকে তরুণ করে তোলার এক কঠিন চেষ্টা। ‘এক ব্যক্তিএক পদ’ নিয়মও কার্যকর করা হবে।

বৈঠকে পর্যালোচনা করা কিছু পরামর্শ ও মতামত কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোরের। কংগ্রেসে একটি অবস্থান তৈরি করার জন্য ‘অডিশন ’দেওয়ার সময় ওই পরামর্শগুলো দিয়েছিলেন তিনি। উদ্যোগটি সবার চোখের সামনে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। প্রশান্ত কিশোর কংগ্রেসকে তাদের দীর্ঘলালিত সৌধটি ভেঙে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দলটির জবাব ছিল : ‘ধন্যবাদ, তবে আমরা এখন শুধু সামনের অংশ চুনকাম করব।’

কংগ্রেস দৃশ্যত কর্মীদের কিছুটা চাঙ্গা করার জন্য যেটুকু করলেই চলে শুধু সেটুকু পরিবর্তন এনে খতিয়ে দেখছে। প্রকৃত পরিবর্তনের চেয়ে তা অনেক দূরে। অথচ অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি আর হিসাবের ভুল পাঞ্জাব এবং গোয়ার মতো রাজ্য দলটির হাতছাড়া করেছে।

দুটি বড় প্রশ্ন কীভাবে আবার নির্বাচনে জেতা যায় (গণতন্ত্রে মূল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়) এবং কীভাবে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠ তুষ্ট করা হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা মোকাবিলা করা যায় তা আবারও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যতক্ষণ না কংগ্রেস নেতৃত্ব এই দুটি বড় প্রশ্নের একটি বিশ্বাসযোগ্য উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন, ততক্ষণ উদয়পুর ঘোষণাকে লোক দেখানো ঘষামাজাই মনে হবে।

কংগ্রেস ঘোষণা করেছে, তারা ১৫ আগস্ট থেকে ধারাবাহিক ‘পদযাত্রা’ নিয়ে পথে নামবে। এতে বেকারত্বের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। দলে তিনটি নতুন দপ্তর গঠন করা হবে। এগুলো হচ্ছে জনমত দপ্তর (তথ্যউপাত্ত দিয়ে জনমত পরিমাপ করার জন্য), কংগ্রেস কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচন পরিচালনা করার একটি দপ্তর। কংগ্রেসে ইতিমধ্যেই কমিটির শেষ নেই। সোনিয়া গান্ধী প্রায়শই বিভিন্ন সমস্যা একেকটি প্যানেলের হাতে দেখার জন্য তুলে দেন। যার আর কোনো ফল পাওয়া যায় না।

রাহুল গান্ধীর দলীয় পদে ফেরার ব্যাপারটা ছিল বড় অনালোচিত ইস্যু। তবে রাহুল ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি অরাজি নন। অন্যদিকে পৃথক ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যেই বলেছেন, তার জন্য দুই মেয়াদ যথেষ্ট নয়। দুই বছর পরই সাধারণ নির্বাচন। কংগ্রেস যদি আবার ‘রাহুল বনাম মোদি’ লড়াইয়ের জন্য তৈরি হতে থাকে তাহলে বলতেই হয়, ইতিহাস তাদের পক্ষে নয়।

রাহুল গান্ধী চিন্তন শিবিরে দেওয়া তার ভাষণে বলেন, তিনি কট্টরপন্থি আরএসএস-এর মতাদর্শ আর বিজেপির সঙ্গে লড়াই করার জন্য তার জীবন উৎসর্গ করেছেন। আর তিনি মোটেও ভীত নন কারণ, ‘ভারত মাতার কাছ থেকে একটি পয়সাও নেননি’।

তবে কংগ্রেসের ভাগ্য নির্ভর করছে বিজেপির সঙ্গে লড়াই করার জন্য অন্যদের সঙ্গে সুদক্ষ রাজনৈতিক জোটের ওপর। কিন্তু রাহুল গান্ধী দৃশ্যত এ বিষয়টিকে মোটেই গা করছেন না। তার দাবি, অন্য দলগুলোর বিজেপিকে মোকাবিলা করার মতো আদর্শ নেই। রাহুলের এ অবস্থান জাতীয় উচ্চাকাক্সক্ষা রয়েছে এমন কিছু জ্যেষ্ঠ বিরোধী নেতাকে অখুশি করবে। তাদের মধ্যে আছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার এবং তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কেসিআর। রাহুল গান্ধীর সঙ্গে তাদের খুব একটা যায় না। কিছু আঞ্চলিক দল ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, ভোটের বাক্সে তাদের সাম্প্রতিক বাজে রেকর্ডের কারণে। রাহুল গান্ধী নিজেই বলেছেন, বিএসপি প্রধান মায়াবতী ইউপি নির্বাচনের আগে তার ফোন পর্যন্ত ধরতে অস্বীকার করেছিলেন।

রাহুল গান্ধীকে শুধু অন্য দলগুলোকে অতীতের চেয়ে ভালোভাবে মোকাাবিলা করতে শিখতে হবে তাই নয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরেও অনেক কাজ করতে হবে তাকে। রাহুলকে শচিন পাইলটের ভূমিকা নিয়ে অস্বস্তি দূর করতে হবে। তাকে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অশোক গেহলটের জায়গায় বসানো হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। শচিন পাইলট অধৈর্য। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা না হলে তিনি উড়াল দিতে প্রস্তুত।

লেখক : লেখক ও সাংবাদিক। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, স্টেটসম্যান এবং হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায় কাজ করেছেন।

এনডিটিভি অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত