ওয়ানডে বদলালে বাংলাদেশের পাওয়ার ক্রিকেট লাগবেই

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২২, ১১:৪৯ পিএম

জাতীয় দলের অধিনায়ক এএসএম রকিবুল হাসান। সত্তর-আশির দশকে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন। পরবর্তী সময়ে টুর্নামেন্ট আয়োজন থেকে শুরু করে ঘরোয়া ক্রিকেটের নিয়মিত ম্যাচ রেফারির দায়িত্ব পালন করছেন। তার সঙ্গে ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের শিহাব উদ্দিন।

ক্রিকেটে বিশেষ করে ওয়ানডে নিয়ে একটা পরিবর্তনের সুর উঠেছে। টি-টোয়েন্টির কারণেই এই পরিবর্তনের আলোচনা। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

রকিবুল হাসান : এখন ক্রিকেটে তিনটি ফরম্যাট। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে কিন্তু টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট ছিল না। তখন শুধু টেস্ট ও ওয়ানডেই ছিল। এখন ক্রিকেট কিন্তু ক্রিকেটে নেই। এখন এই খেলাটির সঙ্গে ব্যবসা যোগ হয়েছে। টেস্ট ম্যাচে কেউ হাত দিচ্ছে না। কারণ সবাই জানে ক্রিকেটের মূল হলো টেস্ট। এখানে একজন ক্রিকেটারের সেরা পরীক্ষা হয়। ধৈর্য, স্কিল ও টেকনিকের ব্যাপার আছে। এখন যেসব কথা উঠে আসছে তা টি-টোয়েন্টির কারণে, টেস্ট ম্যাচে কিন্তু কেউ হাত দিচ্ছে না। মূলত আইপিএল, সিপিএল, বিপিএলের কারণে প্রচুর অর্থ উপার্জন করা যাচ্ছে। এটা ওই দেশগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে খুব কাজে দেয়। এটা একটা বিষয়। আরেকটি হলো ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ানোর জন্য কাজে দেয়। কারণ ব্রডকাস্টাররা ভাবে...যেহেতু অল্প সময়ের খেলা, এটা বিশ্বব্যাপী প্রচার করা যায়। এখানে স্পন্সররাও খুশি থাকে যে, ক্রিকেটের মাধ্যমে তাদের প্রোডাক্ট বিশ্বব্যাপী ছড়াচ্ছে। গত ১০-১৫ বছরে এই টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতামূলকই শুধু নয়, অর্থনৈতিক লাভের দিক থেকেও ক্রিকেটে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সব দেশেই টি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। টেস্টের সেরা সময়ের ক্রিকেটার হিসেবে আপনিও কি টি-টোয়েন্টিকেই ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ মনে করেন?

রকিবুল হাসান : এই টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়রা একেকটা দলভুক্ত হন। এতে ওই দেশের ক্রিকেটাররা বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করতে পারেন। বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করতে পারেন। ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা বাড়াতে পারেন। এই জন্য বলার অপেক্ষা রাখে না যে, টি-টোয়েন্টিই ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। আবুধাবিতে এখন নিয়মিত টি-১০ লিগ হচ্ছে। হান্ড্রেড বলের খেলা হচ্ছে। বলে না যে, পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে ঠিক সেরকম। মানুষ তো এখন আর লম্বা খেলা দেখতে চায় না। তবে টেস্ট ম্যাচ ভিন্ন বিষয়। এ ব্যাপারে আইসিসি ও বাকি বোর্ডগুলোও একমত যে, এই ফরম্যাট ঠিক আছে। এখন ওয়াসিম আকরাম, শহিদ আফ্রিদি যে কথা বলছেন তা ঠিক আছে। আমার মতে, পৃথিবীর সেরা যে ক্রিকেটাররা আছেন, আইকনিক যারা,  তারা একটানা খেলতে গিয়ে পরিশ্রান্ত হয়ে উঠছেন। তারা কিন্তু মেশিন না, তাদের পরিবার আছে বিশ্রাম নেওয়ার ব্যাপার আছে। এখন তারা কোথায় বিশ্রাম নেবে। এই জিনিসটা যখন সামনে আসবে তখন তারা কিছু চিন্তা করবেই যে আমি যদি টি-টোয়েন্টিতে থাকি, তাহলে এক দুই মৌসুম খেলে যে টাকা আয় করব তা ৫ বছর ওয়ানডে খেলেও আয় করতে পারব না। সেইসঙ্গে আমি বিশ্রামও পাব। এটা বড় ব্যাপার।

নব্বই দশকে ওয়ানডে তুমুল জনপ্রিয় ফরম্যাট ছিল। এই ফরম্যাটটা টিকিয়ে রাখতে কী করা উচিত বলে মনে করেন?

রকিবুল হাসান : আমিও মনে করি ওয়ানডের আবেদন ও প্রয়োজনটা কমে যাবে। কবে এই ফরম্যাটটা বন্ধ হয়ে যাবে তা এখন বলা সম্ভব না, বলতে চাচ্ছিও না। তবে যেটা করা যেতে পারে, আফ্রিদি যেমন বললেন ৪০ বা ৩৫ ওভারে আনা যেতে পারে। তখন দর্শকরা অ্যাটাকিং ক্রিকেটের একটা স্বাদ পাবে। সময়টা কমে যাবে। এরকম একটা কিছু হয়তো হবে।

ওয়ানডেতে একসময় ৬০ থেকে ৫০ ওভারে নামানো হলো। এখন ওয়ানডেকে নিয়েই আবার বিয়োজনের সুর। তাহলে ওয়ানডের সময়টা কি আবার পিছিয়ে গেল?

রকিবুল হাসান : পৃথিবী এগিয়ে যাবে আর ক্রিকেট পিছিয়ে থাকবে কেন। ১০০ বছর আগে, যখন ডন ব্র্যাডম্যানরা খেলতেন, তখন তো পিচ কাভার ছিল না। আবার একটা সময় ৮ বলে ওভার হতো। আম্পায়াররা লম্বা কোট পরে আসতেন। এসবের এখন কিছুই নেই। সবকিছু যখন আগাচ্ছে, ক্রিকেটেও নানা সুবিধা চিন্তা করে এগোচ্ছে পরিবর্তন হচ্ছে। এখন অতীত টেনে লাভ নেই, বর্তমান চিন্তা করে সেদিকেই নজর দিতে হবে।

ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ভালো খেলে। এখানে পরিবর্তন আসলে বাংলাদেশের ভালো করার জায়গাটা কমে যাবে কিনা?

রকিবুল হাসান : বাংলাদেশকে নিয়ে তো আর বিশ্ব ক্রিকেট বসে নেই। বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টিতে ভালো করে না কেন এটার দায়ভার বাংলাদেশেরই। বিশ্ব ক্রিকেট তো এ নিয়ে চিন্তা করবে না। ওয়ানডে যদি ৩৫-৪০ এ নেমে আসে তখন আমাদের সমস্যা হবে। পাওয়ার ক্রিকেট চলে আসবে। আমরা তো এই জায়গাটাতেই পিছিয়ে। এখন পরিবর্তন হলে পাওয়ার ক্রিকেট লাগবেই, তখন নিজেদের উন্নতি করতেই হবে, কিছু করার নেই।

সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কথা যদি ধরি। বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট উন্নয়নে ওই দেশের সাবেকরা ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ এদিকে পিছিয়ে কেন?

রকিবুল হাসান : এখানে অনেকগুলো ব্যাপার আছে। সাবেক ক্রিকেটারদের দিক দিয়ে বললে কী করবে? কোচিং? এই ব্যাপার হয়ে থাকলে আমাদের দেশে তো সাবেক ক্রিকেটারদের কেউই আন্তর্জাতিক মানের কোচ হয়ে উঠতে পারেনি। এখন যেটা হতে পারে, শর্টলিস্ট করে বাইরে থেকে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে। বড় ক্রিকেট প্লেইং দলগুলোর ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া যায়। তাহলে সেখানকার ক্রিকেট ও টেকনিক কেমন তা জানতে পারবে। এটা একটা দিক। আরেকটা হলো ম্যানেজমেন্টে যারা যোগ্য, লেখাপড়ার মেধাও এখানে লাগবে। ওরকম সবাইকে নিয়ে একটা দল তৈরি করা যেতে পারে এবং তারা রোডম্যাপ তৈরি করবেÑ ৫ বছর পরে আমাদের ক্রিকেটকে কোথায় দেখতে চাই। এখানে আধুনিক ক্রিকেটের সব বিষয় থাকতে হবে।

ক্রিকেটে যদি নতুন পরিবর্তন আসে, তাহলে বাংলাদেশকে ওই পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে এগিয়ে যেতে দেখতে চান?

রকিবুল হাসান : আগামী ৫ বছরে ৪০টার মতো টেস্ট ও ৭০টা করে টি-টোয়েন্টি-ওয়ানডে খেলতে পারে। তো এখন যে ওয়ানডে বাদ দেওয়ার কথা উঠছে, ধরে নিতে পারি সামনের চক্রে অন্তত এই ফরম্যাটটা উঠছে না। আর এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টা তখনই হবে যখন হোমওয়ার্ক ঠিকমতো হবে। হোমওয়ার্ক বলতে ম্যানেজমেন্ট, ম্যানেজমেন্ট বলতে দল নির্বাচন থেকে শুরু করে একদম ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো পর্যন্ত। যেমন টেস্ট ম্যাচে ভালো করতে হলে লংগার ভার্সনে কী করতে হবে। টি-টোয়েন্টিতে ভালো করতে হলে কী করতে হবে, তা সবদিক থেকে তৈরি থাকতে হবে। সিনিয়ররা অবসর নিলে যেন পরের প্রজন্ম তৈরি হয়ে নামতে পারে। বাংলাদেশ এখন একটা দিক ভালো করছে যে, এ দলকে বিদেশে পাঠাচ্ছে। জিম্বাবুয়েতে তরুণ একটা দল পাঠিয়েছে। এটা খুব খুশির ব্যাপার। ক্রিকেটের জন্য ভালো লক্ষণ। বিদেশের মাটিতে, বিদেশের দলের সঙ্গে ভালো করুর বা না করুক বিগ টাইম ক্রিকেট কী জিনিস তা বুঝতে পারবে ক্রিকেটাররা। পাশাপাশি দেশে ভালো উইকেটে নিয়মিত খেলা রাখতে হবে। এর সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রিমিয়ার লিগের মতো জাতীয় লিগ, বিসিএলে একজন করে বিদেশি ক্রিকেটার খেলানোর অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত