আরব ইতিহাসের রহস্যময় চরিত্র

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২২, ১১:২৫ পিএম

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ গোপন মিশনের দায়িত্বে ছিলেন টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স। ছদ্মনাম ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’। উসমানীয় শাসনকালে আরব গেরিলা বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করেছেন। কূটনীতি, সম্মুখসমর এবং আলোচনার টেবিলে দুর্দান্তভাবে সফল এই গেরিলা যোদ্ধাকে আরব ইতিহাসের রহস্যময় চরিত্র মনে করা হয়। লিখেছেন নাসরিন শওকত

শুরুর কথা

১৮৭৯ সাল, তখন মধ্য আয়ারল্যান্ডের লেইনস্টার প্রদেশের কাউন্টি ওয়েস্টমির একজন জমিদার স্যার থমাস চ্যাম্পম্যান। সে সময় ভিক্টোরিয়ান যুগের ধনী এই আইরিশ জমিদারের বাড়িতে আসেন ১৮ বছরের সারা জুনার ম্যাডেন। স্যার থমাসের চার মেয়ের গৃহশিক্ষিকার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। জমিদারের খানদানি বাড়িতে তার মেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে দিন কাটতে থাকে গৃহশিক্ষিকা সারার। একসময় এই অভিজাত জমিদারের সঙ্গেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন গৃহকর্মী সারা। তাদের প্রেমের পরিণতি হিসেবে ১৯৮৮ সালে গোপনে ছেলেসন্তানের জন্ম দেন সারা। স্যার থমাস ও সারার প্রেমের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে জমিদার তার স্ত্রী এডিথকে ত্যাগ করেন। প্রেমিকা সারাকে নিয়ে তিনি ব্রিটেনে চলে আসেন। তবে এই যুগল কখনোই বিয়ে করেননি। তবে পরে চার্চের নিয়ম মেনে বিবাহিত দম্পতির মতোই তারা লরেন্স পদবি গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৯৬ সালে লরেন্স দম্পতি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ার কাউন্টির অক্সফোর্ড শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সারা জুনার ও স্যার থমাস পাঁচ সন্তানের জন্ম দেন। থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স ছিলেন তাদের দ্বিতীয় সন্তান। বাবা-মায়ের বিবাহবন্ধন ছাড়াই জন্ম নেন লরেন্স। ১৯১৯ সালে তার বাবার মৃত্যুর পরই লরেন্স প্রথম তার আসল পরিচয় জানতে পারেন।

 টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স

টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স ছিলেন ব্রিটিশ প্রতœতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ, সমর কৌশলবিদ ও লেখক। তিনি ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন। প্রথম বিশ^যুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্যে তিনি প্রতœতত্ত্ববিদ ও ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আকাবা জয় করেন। ১৯২৭ সালে ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ (আরবের লরেন্স) ছদ্মনাম ধারণ করেছিলেন। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যে উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আরব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯২৬ সালে তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য সেভেন পিলারস অব উইসডম’ লিখে সাড়া ফেলেন। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক তৎপরতা নিয়ে বই লিখেই তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।

ওয়েলসের কার্নারভনশায়ারের ট্রেমাডগের গর্ফউইসফা বাড়িতে ১৮৮৮ সালে জন্ম নেন টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স। লরেন্স অক্সফোর্ডের হাইস্কুল ও জেজাজ কলেজে তার পড়াশোনা শুরু করেন। কলেজে পড়ার সময় তার প্রথম আগ্রহ ছিল মধ্যযুগের সামরিক স্থাপত্য বিষয়ে। সে সময় স্নাতকের বিষয় হিসেবে তিনি ইতিহাসকে বেছে নেন। তার তত্ত্বীয় বিষয় ছিল মধ্যযুগের স্থাপত্যের ঐতিহাসিক নির্মাণশৈলী। সে সময় লরেন্স সিরিয়া, প্যালেস্টাইন ও ফ্রান্সের ক্রুসেড যোদ্ধাদের সামরিক দুর্গের ওপর পড়াশোনা করেন। ১৯১০ সালে ইতিহাসের এ বিষয়ের ওপর একটি অভিসন্দর্ভ জমা দিয়ে স্নাতকে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৩৬ সালে তার এই অভিসন্দর্ভটি ‘ক্রুসেডার ক্যাসেল’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল।

অক্সফোর্ডের স্থপতিবিদ্যার একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই লরেন্স প্রথম মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণের সুযোগ পান। ১৯০৯ সালের গ্রীষ্মের পুরোটা সময় তিনি একা সিরিয়া ও প্যালেস্টাইনের ক্রুসেডার দুর্গগুলো জরিপ করে দেখেন। জরিপের সময় লরেন্স হেঁটে এক হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছিলেন। তখন লরেন্সের সঙ্গে এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। তাকে গুলি করা হয়, সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র লুট করে তাকে গুরুতর আহত করে ফেলে রেখে যায় লুটেরার দল। এই বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও নতুন গ্র্যাজুয়েট লরেন্স প্রতœতাত্ত্বিক এক অভিযানের জন্য আবার সিরিয়ায় ফিরে আসেন। এ সময়ই আরবি ভাষা ও আরব জাতির প্রতি লরেন্সের অনুরাগকে আরও গভীর করে তুলে। সে সময় অক্সফোর্ডের প্রতœতত্ত্ববিদ ডেভিড জর্জ হোগার্থের ছাত্র হিসেবে থমাস লরেন্স ম্যাগডালেন কলেজ থেকে একটি ভ্রমণ ফেলোশিপ (ডেমিশিপ) পান। এই ফেলোশিপ তিনি ইউফ্রেতিসের কর্কমিশের হিত্তীয় বসতির ধ্বংসাবশেষের খনন অভিযানে যোগ দেন। লরেন্স তিন বছর (১৯১১ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত) এই প্রকল্পে কাজ করেন। অবসর সময়ে লরেন্স ভ্রমণ করতেন।

গোপন মিশন

লরেন্সের যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। ১৯১৪ সালের প্রথম দিকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাকে সিনাই উপত্যকা ও নেজেভ মরুভূমি অঞ্চলের একজন প্রতœতাত্ত্বিক গবেষক হিসেবে নিয়োগ করে। ওই গবেষণা ভ্রমণটি ছিল মূলত ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিচালিত একটি গোপন মিশন। এ মিশনে স্যার উলি ও ক্যাপ্টেন এস এফ নিউকম্বকে সঙ্গে নিয়ে লরেন্স সুয়েজ খালের পূর্ব প্রান্তের তুর্কি সীমান্তবর্তী সিনাইয়ের উত্তরাঞ্চল চষে বেড়ান। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে তারা তিনজন গাজা থেকে আকাবা পর্যন্ত পথের মানচিত্র তৈরির প্রচেষ্টা চালান। তবে এই মানচিত্র তৈরির চেয়েও ওই অভিযানের কৌশলগত মূল্য অনেক বেশি ছিল। পরের বছর ১৯১৫ সালে এই অভিযানের পাণ্ডিত্যপূর্ণ দিকের ওপর আলোকপাত করে লরেন্স ও স্যার উলি যৌথভাবে একটি বই প্রকাশ করেন। যার নাম ‘ওয়াইল্ডারনেস অব জিন’।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

একপর্যায়ে শুরু হয় প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ। সে সময় লরেন্স লন্ডনের যুদ্ধবিষয়ক অধিদপ্তরে বেসামরিক কর্মকর্তা হিসেবে মানচিত্র বিভাগে কাজ শুরু করেন। এ বিভাগে যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য সিনাইয়ের একটি মানচিত্র তৈরির দায়িত্ব পান তিনি। ১৯১৪ সালে লরেন্সকে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে লেফটেন্যান্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন দায়িত্ব পেয়ে তিনি কায়রোয় আসেন। কায়রোতে তাকে গোয়েন্দা তৎপরতায় সাহায্য করা, বন্দিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া, মানচিত্র আঁকা, শত্রু সীমানার ভেতরে অবস্থানরত গুপ্তচরদের থেকে আসা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও তুর্কি সেনাবাহিনীর ওপরে একটি হ্যান্ডবুক তৈরির কাজ করতে হয়। প্রথম বিশ^যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে (১৯১৫ সাল) লরেন্স তার ছোট দুই ভাইকে হারান। তার দুই ভাই ফ্রাঙ্ক ও উইল পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন।

পশ্চিম রণাঙ্গনে লক্ষাধিক প্রাণের বিনিময়ে ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। যুদ্ধ থেকে ফিরে লরেন্স কূটনীতিক, শিক্ষার্থী ও গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯১৯ সালে প্যারিস শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি আরবের স্বাধীনতার পক্ষে মধ্যস্থতা করেন। এরপরই তিনি সিরিয়া ও লেবাননকে সমগ্র আরব থেকে পৃথক করার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এ সময় তিনি তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার লেখালেখিও চালিয়ে যান।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্তও লরেন্সের বীরোচিত নেতৃত্বের কথা আড়ালে পড়ে যায়। এমনকি তার মাথার মূল্য ঘোষণা করা তুর্কি বাহিনীও লরেন্সকে চিনত না। ১৯১৯ সালে টমাস লরেন্সের বীরত্ব প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে। সে সময় প্রথম বিশ^যুদ্ধের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন সাংবাদিক ও প্রতিবেদক লাওয়েল টমাস লরেন্সের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার ওপর সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করেন। তিনি এক সফরের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের ‘উইথ অ্যালেনবাই ইন প্যালেস্টাইন অ্যান্ড লরেন্স ইন অ্যারাবিয়া’ এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এই প্রতিবেদন প্রচার তাকে কর্নেল টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স থেকে যুদ্ধের এক নায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।

বীরযোদ্ধা হিসেবে ব্যাপক প্রচারণা পাওয়ার আগে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ থমাস লরেন্সের বিরুদ্ধে ১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর সমন জারি করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে আরবদের নেতৃত্ব দেওয়া লরেন্সের প্রত্যাশা ছিল, ব্রিটিশ সরকার স্বাধীন আরব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ যুদ্ধে আরবদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখতে না পাওয়া লরেন্স এরই মধ্যে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, ব্রিটিশ সরকার আরবদের স্বাধীনতা এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যুদ্ধে আরবদের নেতৃত্ব দেওয়া ৩০ বছরের কর্নেল লরেন্সকে রাজা পঞ্চম জর্জ বিশেষ সম্মানে ভূষিত করতে নাইট উপাধি দিতে চান। কিন্তু লরেন্স বিশ্বাসঘাতক রাজার দেওয়া সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এরই মধ্যে রাজার দেওয়া সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার দুই বছর কেটে যায়। ১৯২১ সালে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী ও উইন্সটন চার্চিল ঔপনিবেশিক মন্ত্রী হন। এ দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি লরেন্সকে তার সরকারের আরববিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু কায়রোতে নেওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে দেখা যায়, যুদ্ধের সময় আরবদের কাছে দেওয়া লরেন্সের প্রতিজ্ঞার বেশির ভাগই ভঙ্গ করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে লরেন্স ব্রিটিশ সরকারের পরবর্তী সব পদ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন।

যুদ্ধ-পরবর্তী কর্মকাণ্ড

লরেন্স আবার ১৯২২ সালের আগস্টে তিনি রয়্যাল এয়ারফোর্সের ক্রাফটসম্যান হিসেবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। সে সময় সেলিব্রিটির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে লরেন্স ‘জন হিউম রস ছদ্মনামে ওই বাহিনীতে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে। ১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রয়্যাল সামরিক বাহিনী জোরপূর্বক তাকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। এ সময়ে তিনি তার নাম পরিবর্তন করে থমাস এডওয়ার্ড শ (সংক্ষেপে টি ই শ) নামে আত্মপ্রকাশ করেন (তার বন্ধু বিখ্যাত আইরিশ লেখক জর্জ বার্নার্ড শ’র তার প্রতি সম্মান জানিয়ে)। পরে লরেন্স ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রাচীনতম ট্যাংক ইউনিট রয়্যাল ট্যাংক কর্পসে যোগ দেন। সেখানে কাজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করায় ১৯২৫ সালের আগস্টে আবার তিনি রয়্যাল এয়ারফোর্সে ফিরে আসেন। এ সময়ের দিকেই তার লেখা বই ‘রিভল্ট ইন দ্য ডেজাট’ প্রকাশ তাকে নতুন করে বড় প্রচারনায় এনে দেয়। এরপরই ১৯২৬ সালের শেষ দিকে লরেন্সকে নতুন দায়িত্ব দিয়ে ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের (বর্তমান পাকিস্তানে) করাচি ও মিরামশাহ-এ পাঠানো হয়েছিল। সেখানে তিনি ১৯২৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এ সময়ই লরেন্সের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করার অভিযোগ ওঠে। এই গুজব চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তাকে জোর করে আবার ব্রিটেনে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে তিনি এই দায়িত্ব ছেড়ে আসেন।

গেরিলা তৎপরতা

১৬ শতকের শুরুর দিকের কথা। আরব ভূখন্ড তখন অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। তবে ওই অঞ্চলে যাযাবর উপজাতীয় গোত্রগুলোকে বিধি মতে স্বাধীন জীবনযাপন করতে দেওয়া হতো। তখন অবশ্য উসমানীয় শাসনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা আরবদের তুলনায় সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, মেসোপটেমিয়া (ইরাক) ও মিসরের গ্রামীণ আরব জনগোষ্ঠীরা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতো।

১৯১৬ সালে আরব বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। সে সময় সামরিক প্রশিক্ষণ না থাকা লরেন্স আরবদের পক্ষ হয়ে শত্রু তুর্কি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। যুদ্ধক্ষেত্রের বিপজ্জনক ওই মিশনে তিনি সম্মুখভাগে থেকে আরব গেরিলা বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন। সে সময় ব্রিটিশরা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা চালাতে মিসরকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত। ১৯১৬ সালের অক্টোবরে লরেন্সকে আরব মিশনে পাঠানো হয়। তিনি কূটনীতিক স্যার রোনাল্ড স্টর্সের সঙ্গে আরবে অভিযানে যান।

আরব বিদ্রোহ নামের এ যুদ্ধ দুই বছর পর্যন্ত চলে। আরবে গিয়ে স্ট্রর্স ও লরেন্স প্রথমে হুসাইনের দুই ছেলে ‘আবদুল্লাহ’ ও ফয়সালের সঙ্গে দেখা করেন। তখন ফয়সাল মদিনার দক্ষিণ-পূর্বে এক আরব বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। নভেম্বর মাসে লরেন্স কায়রোতে ফিরে আসেন। তিনি ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আরব যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। কায়রো থেকে ফিরে লরেন্স মদিনার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের উদ্দেশে রওনা হন। এবার তিনি ফয়সালের সেনাবাহিনীতে লিয়াজোঁ ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।

লরেন্স আরবদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে বিশাল আরব উপদ্বীপে দ্রুত প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সে সময় কায়রোর সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ স্থাপনে মধ্যস্থতা করে সফলতা অর্জন করেন। তিনি গেরিলা তৎপরতার মদিনা থেকে দামেস্ক পর্যন্ত ‘ঐতিহাসিক হেজাজ রেল লাইন’ অচল করে দেন। এ সময়েই তিনি মরুভূমির বিভিন্ন অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় শেখদের মন জয় করেন। আরব বেদুইন যোদ্ধাদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তোলেন।

লরেন্সের নেতৃত্বে আরব গেরিলাদের প্রথম বড় সাফল্য ছিল লোহিত সাগরের সবচেয়ে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত আকাবা জয়। একই বছরের নভেম্বরে তিনি আরব বেশ ধারণ করে দারা নগরে গেলে শত্রু তুর্কি সেনার হাতে আটক হন। পরে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন লরেন্স। তবে ওই ঘটনা তার মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। এদিকে লরেন্সের সহায়তায় ফয়সালের বাহিনী আরও উত্তরে জয় করা এলাকার সীমানা বাড়াতে সক্ষম হয়। এ যুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ টমাস লরেন্স লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি পান। অন্যদিকে আরব বাহিনী ১৯১৮ সালের অক্টোবরের দিকে দামেস্কের কাছাকাছি পৌঁছলে ফয়সাল বাহিনীর হাতে দামেস্কের পতন ঘটে। এ বছরেরই নভেম্বরে যুদ্ধবিরতির হয়। এর মধ্য দিয়েই  আরব যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এ যুদ্ধে অসংখ্যবার আহত ও আটক হয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় লরেন্স মানসিক ও শারীরিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পরেন। দামেস্ক জয়ের পরপরই আরবরা গোত্র, জাতিগত দ্বন্দ্ব ও আন্তঃকোন্দলে জড়িয়ে পড়ে। ১৯১৬ সালে সম্পাদিত সাইকস-পিকো চুক্তির ফলে আরব অঞ্চলে ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রভাব বজায় থাকে। এদিকে যুদ্ধের পর তৎকালীন ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ আরবদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ‘বক্সটি আমার নিজের হাতেই রাখছি’ এমন ঘোষণা দেন। তার এ ঘোষণার মধ্য দিয়েই আরব অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকার আভাস পাওয়া যায়। আরবদের দ্বন্দ্ব ও ব্রিটিশ সরকারের হঠকারিতায় হতাশ হয়ে লরেন্স ব্রিটেনের উদ্দেশে আরবভূমি ত্যাগ করেন। লন্ডনে ফিরেই তিনি আরবের স্বাধীনতার জন্য কাজ শুরু করেন। তার আগে প্যারিসের আসন্ন শান্তি সম্মেলনে ফয়সাল ও লরেন্স আরবদের প্রতিনিধিত্ব করতে সম্মত হন।

লরেন্সের কর্মবহুল জীবন নিয়ে ইতিহাসে যা লেখা হয়েছে, এর সবই ইতিবাচক। ব্রিটিশের হয়ে তার তৎপরতার পুরোটাই ছিল উসমানীয় শাসনবিরোধী। যে কারণে এখন লরেন্স ইতিহাসে কয়েকভাগে চিত্রিত। কারও কাছে তিনি শতভাগ ব্রিটিশের অনুচর, কারও কাছে তিনি মসিহা আবার খেলাফত সমর্থকদের কাছে খলনায়ক। সবমিলিয়ে তার সঙ্গে ‘রহস্যময় চরিত্র’ শব্দটি লেপ্টে যায়।  ১৯৩৫ সালের ১৯ মে ৪৬ বছর বয়সে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান লরেন্স।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত