সাগরে লঘুচাপ সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর ক্ষতির শঙ্কা

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২২, ০১:৫৭ এএম

উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে ভারতের মধ্যপ্রদেশ ও এর কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান করছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়োহাওয়া বয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বায়ুতাড়িত জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা,বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ। আকস্মিক অস্বাভাবিক জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাছ ও ফসলের।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তর পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ জায়গায়, রাজশাহী, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়োহাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। পরবর্তী তিন দিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা : লঘুচাপের প্রভাবে গতকালও স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত আড়াই ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে মোংলার নিম্নাঞ্চলসহ পুরো সুন্দরবন এলাকা। অস্বাভাবিক জোয়ারে তলিয়ে গেছে পশুর নদীর পাড়ের বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়ি। বিশেষ করে মোংলা বন্দর ও সুন্দরবনের পশুর নদীর পাড়ের এলাকার বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো এখন আশপাশের অন্যের বাড়িঘর ও রাস্তার ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। লঘুচাপের এ জলোচ্ছ্বাসে উপজেলার চিলা, চাঁদপাই ও বুড়িগঙ্গা ইউনিয়নের পশুর নদীর পাড়ের বাসিন্দারাই বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছেন। চারদিকে পানিতে প্লাবিত হওয়ায় অনেকেই তাদের গবাদিপশু নিয়ে এক ঘরেই বসবাস করছেন। গতকাল দুপুরে উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে সেখানকার বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া আড়াই ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে পুরো সুন্দরবন এলাকা।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজননকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজাদ কবির বলেন, ‘চলমান বৈরী আবহাওয়ায় প্রচুর পরিমাণ পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আড়াই ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের সব জায়গা তলিয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবন প্লাবিত হওয়ায় এখনো পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও তবে সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’

বরগুনার ২১ গ্রাম প্লাবিত

বরগুনা প্রধান তিন নদ-নদী বিষখালী, বলেশ^র ও পায়রায় বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে জোয়ারের পানি। উচ্চ জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে বরগুনা পৌর শহরসহ নিম্নাঞ্চলের ২১টি গ্রাম। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও মাছের ঘের। কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল দুপুরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক কর্মকর্তা মাহতাব উদ্দীন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে নদীতীরবর্তী পোটকাখালী, ডালভাঙা, পশ্চিম গোলবুনিয়া, ফুলতলা আবাসন, বরইতলা ফেরিঘাট তলিয়ে আছে। ফেরিঘাট পানিতে তলিয়ে থাকায় যানবাহন চলাচলে ব্যাহত হয়। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) বরগুনা সদর উপজেলার টিম লিডার জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, ‘যখন কোনো ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত দেওয়া হয়, তখন সবার টনক নড়ে। উপকূলের নদ-নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ারে ১৫-১৮ ফুটের অধিক পানি বৃদ্ধি পায়। জলবায়ুর প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেও বাঁধের উচ্চতা কম থাকায় উচ্চ জোয়ারে বাঁধ তলিয়ে লোকালয় পানি প্রবেশ করে।’

ঝালকাঠির ৩৫ গ্রাম প্লাবিত

ঝালকাঠির সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর পানি বৃদ্ধিতে জেলার নিম্নাঞ্চলসহ কাঁঠালিয়া উপজেলা পরিষদ প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার ফুট বৃদ্ধি পাওয়ায় প্লাবিত হয়েছে জেলার চার উপজেলার কমপক্ষে পঁয়ত্রিশটি গ্রাম। লঘুচাপ ও বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস হওয়ায় কারণে জোয়ারের পানিতে এসব গ্রাম তলিয়ে গেছে।

ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হাসান বলেন, ‘জেলার মধ্যে কাঁঠালিয়া উপজেলা নিম্নাঞ্চল হওয়ায় একটু পানি উঠলেই উপজেলা পরিষদ তলিয়ে যায়। বন্যাসহ সব দুর্যোগ থেকে কাঁঠালিয়া উপজেলা পরিষদ রক্ষার জন্য আমরা একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি, এর কাজ আগামী শুকনো মৌসমেই শুরু হবে।’

সাতক্ষীরার নদী উপকূলে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

সাতক্ষীরায় প্লাবনের আতঙ্ক : চলমান নিম্নচাপের ফলে সাতক্ষীরার উপকূলের নদীগুলোর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে এক ফুটের মতো পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের জানান, নিম্নচাপের ফলে নদীর পানি গতরাত থেকে ১ ফুটের মতো পানি বেড়েছে। গতকাল নদীতে পানি আরও বাড়তে পারে। সাতক্ষীরা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, নিম্বচাপ চলমান বৃষ্টিপাতের ফলে নদী উপকূলে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত চলছে। এদিকে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মিত না হওয়ায় আর বারবার ভেঙে যাওয়ায় উপকূলের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত