ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্র্তৃপক্ষের (ওয়াসার) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানকে অপসারণের প্রশ্নের সংশ্লিষ্ট বোর্ডের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রুল দিয়েছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার পর গত ১৩ বছরে মোট কত টাকা বেতন, উৎসাহ ভাতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন তার হিসাব চেয়েছে হাইকোর্ট। আদেশের ৬০ দিনের মধ্যে ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে হিসাবের বিস্তারিত আদালতকে প্রতিবেদন আকারে দিতে বলা হয়েছে।
এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল বুধবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেয়।
রুলে ওয়াসার এমডিকে অপসারণ করতে বিবাদীদের (রিট মামলার বিবাদী) নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং তাকে অপসারণ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট।
এছাড়া জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ওয়াসার এমডির বেতন-ভাতা কেন নির্ধারণ করা হবে না রুলে তাও জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। স্থানীয় সরকার সচিব, ঢাকা ওয়াসা পরিচালনা বোর্ড ও ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানকে রুলের জবাব দিতে বলেছে হাইকোর্ট।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়–য়া। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অরবিন্দ কুমার রায়।
রিট মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের ২৭২তম সভায় এমডি তাকসিম এ খানের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা, বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সম্মানী পুনর্নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন হয়। পরে কমিটি এমডির বেতন-ভাতা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব করে। কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের ২৭৬তম সভায় এমডির বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা হয় ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন ২ লাখ ৮৬ হাজার, উৎসব ভাতা ৪৭ হাজার ৬৬৭, বাড়িভাড়া ৩৫ হাজার, চিকিৎসা ও আপ্যায়ন ভাতা ৩৫ হাজার ৭৫০, বিশেষ ভাতা ১ লাখ ৮০ হাজার ৬৬ ও বাংলা নববর্ষ ভাতা ৪ হাজার ৭৬৭ টাকা। পরে এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে গত মার্চে সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিস দেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এতে সাড়া না পাওয়ায় গত ৩১ জুলাই হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেন, ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়। এরপর ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০১৫ সালের ১ জুলাই বা তারপর যারা সরকারি, স্বশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানসহ প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন বেসামরিক পদে জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাবেন তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের বিধান কার্যকর হবে। পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্র্তৃপক্ষ আইন-১৯৯৬ সালের ২৮(৪) উপধারা অনুযায়ী ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের এখতিয়ার আছে, তার বেতন ও অন্যান্য ভাতা নির্ধারণ করার। কিন্তু এর জন্য কোনো নীতিমালা নেই। সে ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের অর্থ মন্ত্রণালয়ের যে বিজ্ঞপ্তি সে অনুযায়ী তাকসিম এ খানের বেতন-ভাতা নির্ধারণ হওয়া উচিত। কিন্তু সেটি হয়নি। অথচ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াসা বোর্ড তার বেতন-ভাতা নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন পৌনে ৩ লাখ টাকার বেশি। ২০১৫ সালের যে বেতন স্কেল তাতে তার সর্বোচ্চ মূল বেতন হওয়ার কথা ৭৮ হাজার টাকা।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, ‘এ বেতন বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। ওয়াসা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো গণ্য করে এ ধরনের সুবিধা নেওয়া হচ্ছে। তাকে অপসারণের ক্ষেত্রে বোর্ডের যে নিষ্ক্রিয়তা সেটি আমরা চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। এছাড়া গত ১৩ বছরে তিনি (তাকসিম এ খান) কী পরিমাণ বেতন ও আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন সে হিসাব দিতে নির্দেশনা চেয়েছিলাম। আদালত আমাদের আরজি গ্রহণ করে রুলসহ আদেশ দিয়েছেন।’
