প্রায় আশি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হওয়ার আড়াই বছর পরে পূর্বসূরি বরিস জনসনকে যেহেতু ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে, সেহেতু তার উত্তরসূরি হিসেবে লিজ ট্রাসের পক্ষে সফলভাবে কাজ করাটা সহজ হবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে মধ্যরক্ষণশীল ঘরানার কনজারভেটিভ পার্টি কর কমানো ও অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ শিথিল করার যে ক্ল্যাসিক রীতি অনুসরণ করে থাকে, তা প্রয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাস তার দলের ১ লাখ ৮০ হাজার সদস্যের সামনে যদিও নিজেকে ‘আধুনিক মার্গারেট থ্যাচার’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবেন কি না বা করা উচিত হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলছেন, ট্রাসের কর্মক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের ভিত্তিতে বিচার করা হবে। তারা বলছেন, কোনো প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা গ্রহণের পর জনগণ তার প্রথম একশ দিনকে সাধারণত ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখে। কিন্তু ট্রাসকে সেই ‘প্রথম একশ দিন’-এর ছাড় পাওয়ার কথা ভুলে যেতে হবে। তাকে প্রথম মাসের মধ্যেই নিজের কাজের সাফল্য দেখাতে হবে।
ট্রাস ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন সরকারি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসামান্য অভিযোজন-সক্ষমতা তার রাজনৈতিক রেকর্ডের গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছিন্ন হওয়া অর্থাৎ ব্রেক্সিট প্রচারণার সময় তিনি প্রবলভাবে ব্রেক্সিটবিরোধী ছিলেন। কিন্তু ব্রেক্সিট হয়ে যাওয়ার পর তিনি পক্ষ পরিবর্তন করেন এবং দৃঢ়ভাবে ব্রেক্সিটপন্থি দুটি মন্ত্রিসভায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন। আবার টোরি দলের নেতৃত্ব নেওয়ার প্রচারেও তিনি তার অভিযোজন-যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন।
বর্তমানে ব্রিটেনের মানুষ জ্বালানি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে যে সংকটে পড়েছে, তা ট্রাস কীভাবে সামলাবেন? জবাবে তিনি বলেছেন, এইসংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে তিনি জনগণকে আপৎকালীন খরচা বাবদ থোক অর্থ দেওয়ার ধারণা সমর্থন করেন না। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দেবেন। শোনা যাচ্ছে, তিনি জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যকে ‘ফ্রিজ’ করে দেবেন। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম যেখানে আছে, সেখান থেকে আর তিনি বাড়তে দেবেন না। কিন্তু এই নীতিতে তিনি যদি অটল থাকেন, তাহলে রাজকোষ থেকে বাড়তি ১১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার খরচ হবে। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ট্রাস যদি এখন জাতীয় বীমা কর কমাতে চান, বরিস জনসনের করপোরেট ট্যাক্স বাড়ানোর পরিকল্পনাকে বাতিল করতে চান এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়কে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করতে চান, তাহলে বলা যায় তার জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর পরিকল্পনা দেশকে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। চূড়ান্ত নির্বাচনী প্রচারণার সময় এক সাক্ষাৎকারে লিজ ট্রাসের কাছে সুদের হার এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে সময় তিনি সুদহার নির্ধারণের বিষয়ে নমনীয়তাও প্রদর্শন করেছিলেন। কিন্তু যদি ট্রাস চান আরও বড় পরিসরের নির্বাচকমণ্ডলী তাকে ২০২৪ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় পুনর্নির্বাচনে একজন যোগ্য নেতা হিসেবে দেখুক, তাহলে তাকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেয়েও বেশি কিছু করতে হবে। তাকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই কর কমানো এবং নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণের প্রচারণা থেকে সরে আসতে হবে।
ট্রাস যদি ভোটারদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দিতে চান, তাহলে অবশ্যই উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। যেসব অঞ্চলে উৎপাদনশীলতা ধারাবাহিক ভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, সেসব অঞ্চলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। এটি করতে পারলে তিনি থ্যাচার বা টনি ব্লেয়ারের চেয়েও বেশি দিন প্রধানমন্ত্রিত্ব করতে পারবেন বলে মনে করেন অনেকে।
আরেকটি সাধারণ নির্বাচন হওয়ার আগে ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস মাত্র দুই বছর কয়েক মাসের কার্যকাল পাচ্ছেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়টুকু গদিতে টিকে থাকার জন্য তাকে নীতিগত চ্যালেঞ্জের একটি দীর্ঘ তালিকা মোকাবিলা করতে হবে। গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়া নিজ দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এবং আরও বেশি জনসাধারণের মন জয় করতে হবে। মাত্র এক মাস আগে লিজ ট্রাস ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাওয়া পরিবারগুলোকে সাহায্য করার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে থোক বরাদ্দ দেওয়ার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এর বদলে তিনি ট্যাক্স কমানো এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত তিনি সেই অভিমতের প্রতি অটল আছেন। কিন্তু অর্থনীতিতে মার্গারেট থ্যাচারের এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করার উচ্চাকাক্সক্ষা এখন বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দেখা দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দুটি বিকল্পের একটিকে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। একটি হলো- বিদ্যুৎ বিলে বিশাল অঙ্কের প্রাইসট্যাগ লাগাতে হবে, অন্যটি হলো বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে গিয়ে জেরবার হওয়া পরিবারগুলোকে বড় অঙ্কের থোক অর্থসহায়তা দেওয়া।
বিরোধী লেবার পার্টি ইতিমধ্যেই ট্রাসকে শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণœ করার, তাদের সুবিধা কমানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে দেওয়া নগদ সহায়তা সংকুচিত করার জন্য দায়ী করা শুরু করেছে। তারা লেবার পার্টির সমর্থক অধ্যুষিত শহরগুলোতে বিলবোর্ড টাঙিয়ে ট্রাসবিরোধী বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করেছে। সেই বিলবোর্ডে লিজ ট্রাসের ছবি দিয়ে তারা সেøাগান লিখে দিয়েছে, ‘তিনি আপনার পাশে নেই’। অবশ্য ট্রাসের মিত্ররা দাবি করছেন, ট্রাস বাস্তবতা বুঝে চলা যৌক্তিক মেজাজের রাজনীতিবিদ। তিনি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। তারা বলছেন, ট্রাস প্রথম জীবনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির কট্টর সমর্থক ছিলেন এবং সেখান থেকে ডানপন্থি টোরিদের সংস্কৃতিযোদ্ধায় পরিণত হন। তিনি প্রথমে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বিচ্ছিন্ন হওয়া অর্থাৎ ব্রেক্সিটের ঘোর বিরোধী ছিলেন। সেই তিনিই পরে একজন আবেগপ্রবণ ব্রেক্সিট সমর্থকে নিজেকে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা দেখিয়েছেন। ট্রাসের মিত্ররা মনে করছেন, গদিতে থাকাকালে তিনি এই দক্ষতাকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন। কিন্তু দৃশ্যত সময় ট্রাসের পক্ষে নয়। জরিপে আগে থেকেই টোরিরা জনপ্রিয়তায় লেবারদের থেকে ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিল। ট্রাসের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘোষণার পর সেই পয়েন্ট আরও পড়ে গেছে। গত সপ্তাহে ইউগোভ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৯ শতাংশ লোক বলেছেন, তারা ট্রাসের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের নীতিতে ভরসা রাখতে পারছেন। কিন্তু ৬৭ শতাংশ লোক বলেছেন, তারা নতুন প্রধানমন্ত্রীর ‘কস্ট অব লিভিং পলিসি’র ওপর একেবারেই ভরসা করতে পারছেন না।
ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক ঝড়ের মুখোমুখি হচ্ছেন এটি পরিষ্কার। চলতি বছরের শীত মৌসুমে ইংল্যান্ডে জ্বালানির খরচ বার্ষিক হিসেবে ৩ হাজার ৫০০ পাউন্ড ছাড়িয়ে যাবে। এক বছর আগে যা পূর্বাভাস ছিল, তার তিন গুণ। একদিকে টানা দুই বছর বিশ্ব অতিমারীর প্রভাব অন্য দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। এই যুদ্ধ খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যাহত করে বিশ্বকে দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সঙ্গে তাইওয়ান নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধও হাতছানি দিচ্ছে। সুতরাং বিশ্ব অর্থনীতি এখন কোন পথে যাচ্ছে এক কথায় এর উত্তর দেওয়াটা সহজ নয়। এ নিয়ে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও আছে নানা মত। তবে সবাই একমত যে, সামনের সম্ভাব্য প্রতিটি পথই খারাপ; কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাইহোক, সময়ই বলে দেবে কোন দিকে এগুচ্ছে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ। এখন শুধুই অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে।॥
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
