বিনিয়োগকারীদের হয়রানি নিয়ে সংসদীয় কমিটির ক্ষোভ

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:১৫ এএম

বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এলে বিদেশিরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য। তাদের ভাষ্য, হয়রানির কারণে তারা বিনিয়োগ না করে ফিরে যাচ্ছেন। বৈঠকে খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ. কে. আবদুল মোমেনও বলেছেন, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা বলে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হলেও তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরে গিয়ে হয়রানি শিকার হন। পরে তারাও অন্যদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছেন। এই বিষয়টিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রীসহ কমিটির সদস্যরা দেশে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণœ রাখার লক্ষ্যে গঠনমূলক ও ইতিবাচক প্রবন্ধ, অনুচ্ছেদ প্রচারের সুপারিশ করেন। এ জন্য কলামিস্ট নিয়োগের প্রসঙ্গও আসে আলোচনায়।

গতকাল সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ৩০তম বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর বিশ্বে ১৬৮তম স্থানে অবস্থান করছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধকতাগুলো এখন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে দেশে কোনো বিনিয়োগ হবে না।

কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, দেশে বিনিয়োগের কোনো পরিবেশ নেই। বিনিয়োগ করতে গেলে বিভিন্ন সেক্টরে ধরনা দিতে হয়। বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশই এখানে বিনিয়োগ না করে বাধ্য হয়ে তাদের দেশে ফিরে যাচ্ছেন।

কমিটির সভাপতি মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, দেশে প্রচুর বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিনিয়োগের লক্ষ্যে সরকার ও ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগগুলো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সরকার একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২০০১-এ সরকার পরিবর্তন হলে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আর কোনো ফলোআপ করা হয়নি। সেই সিদ্ধান্তের কপিও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না বলে গতকাল মঙ্গলবার সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জানান মন্ত্রী। 

তিনি জানান, ওই সময় পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন শফি সামি এবং আমেরিকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন তারিক করিম। প্রয়োজনে কমিটির পক্ষ থেকে এদের ডেকে মতামত নেওয়া যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন জানান, প্রতিটি সফরের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিশেল জে সিসন (আগস্ট মাসে) বাংলাদেশ সফরে এলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে আমেরিকায় পলাতক খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সব সময় আইনি প্রক্রিয়া বলে তারা এড়িয়ে যাচ্ছে।

কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফারুক খান কমিটির পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস প্রদানকারী দুজন কংগ্রেসম্যানকে বিস্তারিত তথ্য সরবরাহপূর্বক খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা নেওয়া জন্য পরামর্শ দেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। কমিটি দেশে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণœ রাখার লক্ষ্যে গঠনমূলক ও ইতিবাচক প্রবন্ধ, অনুচ্ছেদ প্রচার করার সুপারিশ করে।

বৈঠকে ভুটানে বাংলাদেশের নব নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসাবাণিজ্য প্রসারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

ভালো কলামিস্ট খুঁজছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

এদিকে স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পরেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশবিরোধী নেতিবাচক প্রচারণা মোকাবিলার পাশাপাশি ইতিবাচক প্রচারণায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সম্মানী দিয়ে কলাম লেখানোর ব্যবস্থা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে ভালো কলামিস্টও খুঁজছে তারা। ভালো কলামিস্টের সন্ধান থাকলে তা মন্ত্রণালয়কে জানানোর জন্য সংসদীয় কমিটির সদস্যদের কাছে আহ্বানও জানানো হয়েছে। এ ছাড়া নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধ ও ইতিবাচক প্রচারণা জন্য মন্ত্রণালয় নতুন একটি শাখাও খুলছে। মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনু বিভাগের আওতায় ‘অভিবাসী কূটনীতি’ নামে একটি অধিশাখা সৃষ্টির জন্য সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

জানা গেছে, কমিটির আগের বৈঠকে বিদেশে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা নেতিবাচক প্রচারণার বিষয় আলোচনা হয় এবং এগুলো বন্ধে মন্ত্রণালয়কে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে এসব কর্মকা- পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে একটি আলাদা সেল গঠনেরও কথা বলা হয়। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে প্রবাসী/অভিবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণায় লিপ্ত হন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য মিডিয়ায় তাদের সরব উপস্থিতি ও দেশবিরোধী আপত্তিকর মন্তব্য, বক্তব্য ও প্রচারের জন্য বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে উল্লেখ করে বলা হয় স্বাগতিক দেশের নানাবিধ আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অনেক ক্ষেত্রে দুরূহ হয়ে পড়ে।  প্রতিবেদনে এ ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ে নতুন অধিশাখা সৃষ্টির কথাও বলা হয়।

এদিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন আগের বৈঠকে বলেন, বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দাকে পুঁজি করে সরকারবিরোধীরা দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা ব্যাপকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার বিষয়টি মন্ত্রণালয় থেকে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কমিটির সদস্য নাহিম রাজ্জাক বলেন, ইদানীং দেশের বাইরে বিভিন্ন ডায়াসফোরগুলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা করে যাচ্ছে। এগুলো মোকাবিলায় মিশনগুলোর জোরালো ভূমিকা পালন করা উচিত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনও ভালো কোনো কলামিস্টের সন্ধান থাকলে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে কমিটির সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

চলতি বছরের শেষ নাগাদ ঢাকা-নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট চালু করা যাবে বলে সংসদীয় কমিটিকে অবহিত করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। ঢাকা-নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট চালুর বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঢাকা বিমানবন্দরে সাদা চামড়ারা বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক থেকে নিরাপত্তার বিষয়ে পরিদর্শনে আসা ব্যক্তিদের তেমন কোনো চেক না করে ছেড়ে দেওয়ায় তারা ঢাকা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিষয়ে বিরূপ প্রতিবেদন দিয়েছে। অপরদিকে প্রবাসী বাঙালি শ্রমিকরা দেশে এলে বিমানবন্দরে তাদের বিভিন্ন রকমের হয়রানি করা হয়। যে কারণে ঢাকা-নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট চালুর ক্ষেত্রে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত