সুস্থ ছাত্ররাজনীতিতে তরুণদের আগ্রহের কমতি নেই

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২২, ০২:৫২ পিএম

আসিফ নজরুল লেখক, ঔপন্যাসিক, রাজনীতি-বিশ্লেষক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি ও সাম্প্রতিক নানা সংকট নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : ছাত্ররাজনীতি দেশের শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় কোনো ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন কি?

আসিফ নজরুল : খুবই কম। কয়েকটি বাম দল এবং ‘ছাত্র অধিকার পরিষদ’ কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে পারছে। বাম ছাত্র সংগঠনগুলা বা ছাত্র অধিকার পরিষদ না থাকলে ছাত্ররাজনীতির নামে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন যে অর্গানাইজড এবং সহিংস আধিপত্য বজায় রেখেছে সেটা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করত। ছাত্রদের জীবনের অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার বজায় রাখার জন্য ছাত্ররাজনীতি কিছুটা ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার অধিকার যদি বলেন, এটা এখন আর ছাত্ররাজনীতির ফোকাসে নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের অত্যাচার, দুর্নীতি এবং অনাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এর থেকে সাধারণ ছাত্রদের বেঁচে থাকাই এখন ছাত্ররাজনীতির মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে কিছু কিছু সংগঠন কিছু ভূমিকা রাখছে, কিন্তু সেটাও পর্যাপ্তভাবে রাখতে পারছে না।

দেশ রূপান্তর : দেশের বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামো এবং উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ছাত্ররাজনীতির কি কোনো ভূমিকা রয়েছে?

আসিফ নজরুল : উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে তো ছাত্ররাজনীতি সেভাবে ভূমিকা রাখে না। এর মূল দায়িত্ব হচ্ছে ইউনিভার্সিটি জয়েন্ট কমিশন এবং বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর। এখন ছাত্রদের তো সাধারণ পড়াশোনা করারই পরিবেশ নেই। হলের মধ্যে তাদের গণরুমে রাখা হয়, জোরপূর্বক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়, তাদের এক ধরনের দাসত্বের জীবন বেছে নিতে হয়। তো এই দাসত্বের জীবন নিয়ে তারা বর্তমান যে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা আছে সেটা বজায় রাখতেই তো হিমশিম খায়। শিক্ষার্থীদের ট্রান্সপোর্ট, লাইব্রেরি ফেসিলিটিজ, আবাসন ইত্যাদি এসবের অপ্রতুলতা রয়েছেই। তবে এখন তো শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে এগুলো আর আগের মতো বড় ইস্যু হয়ে নেই। আপনি দেখেন কিছুদিন আগে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে শিক্ষা অধিকার সংক্রান্ত কিছু দাবি পেশ করার জন্য উপাচার্য মহোদয়ের কাছে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রকাশ্যে তাদের পেটানো হলো। স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি থেকেই তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ছাত্রলীগের একটা ভূমিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার অধিকার তো দূরের কথা শিক্ষাঙ্গনে কোনো রকম মতভিন্নতা বা ভিন্নমত, সমালোচনা, তৎপরতা কোনো কিছুই তারা করতে দেবে না। তারা একটা অ্যাবস্যুলুট আধিপত্য বজায় রেখে সরকারি দলের ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করবে। এর বিনিময়ে তারা সাধারণ ছাত্রদের ওপর অত্যাচার করবে, সুযোগ-সুবিধা আদায় করবে আর স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, নানা রকম পদ বিক্রি করার খবরও পত্র-পত্রিকায় দেখছি।

দেশ রূপান্তর : পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের পাশাপাশি এখন বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোতেও ছাত্ররাজনীতি চালুর চেষ্টাকে কীভাবে দেখছেন?

আসিফ নজরুল : বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের যারা স্টেকহোল্ডার আছে, তারা তো সবাই বলছে এখানে কোনোভাবেই তারা ছাত্ররাজনীতি চায় না। আপনি যদি ইউজিসির বিধান দেখেন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের ছাত্র সংগঠন করা কিংবা সো-কল্ড ছাত্ররাজনীতির স্কোপ নেই। ছাত্ররাজনীতির নামে বর্তমানে যে অত্যাচার-অনাচার, নির্মম নির্যাতন, সহিংসতা চলছে এটাকে ছাত্ররাজনীতি বলা যায় কি না আগে সেই ডিবেটে আসেন। ওরা যেগুলো করে, সেসব তো ক্রিমিনাল অপরাধ। কিছু ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধ। তো এই ফৌজদারি অপরাধ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আপনি অ্যালাউ করবেন কি না, এটাই প্রশ্ন। ছাত্ররাজনীতির নামে তারা এসব ফৌজদারি অপরাধের পরিধি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চায়।

দেশ রূপান্তর : ইডেনে সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? এই ঘটনা কি মেয়েদের রাজনীতিতে আসাকে বাধাগ্রস্ত করবে না?

আসিফ নজরুল : রাজনীতিতে আসা তো পরের কথা, কথা হচ্ছে যে অভিযোগটা উঠেছে জোর করে কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা এটা তো কমন, সবাই জানে; কিন্তু জোর করে তাদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করা এটা সিরিয়াস অভিযোগ, এটা যদি দুই/চারজন মেয়ের সঙ্গেও হয়ে থাকে, সরকারের উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া।

দেশ রূপান্তর : যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। আমরা ছাত্রদল এবং ছাত্রলীগ উভয়ের আচরণই দেখেছি। বিশ^বিদ্যালয়ের হলগুলো কার্যত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোর হাতে জিম্মি। তাদের নির্যাতনে সাধারণ ছাত্রদের মৃত্যুও হয়েছে। মুক্তির উপায় কী?

আসিফ নজরুল : যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ এটা বর্তমান সরকারকে জাস্টিফাই করতে ব্যবহার করা হয়। দালালরা, পেইড লোকরা এসব বলে। শোনেন, একটা সময় পর্যন্ত এটা প্রযোজ্য ছিল। একসময় ছাত্রদল অত্যাচার করত ছাত্রলীগের ওপর, আবার ছাত্রলীগ করত ছাত্রদলের ওপর এটুকু পর্যন্ত আপনার কথা ঠিক আছে। কিন্তু এখন যে পর্যায়ে গেছে, এখন তো সাধারণ ছাত্রদের, ছাত্রীদের ওপর অত্যাচার করে। বিশ^বিদ্যালয়ের হল প্রশাসনকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। এটা আর একটা রাবণ পর্যায়ে  নেই, তিনটা রাবণের সমান হয়ে গেছে। সে যদি পাঁচ বছরের জন্য থাকে সে আর কত বড় রাবণ হয়, কিন্তু সে যদি ১৫ বছর থাকে, তাহলে সেই রাবণের সাইজটা চিন্তা করেন। আগের যে কোনো সময়ের সঙ্গে এটা আর তুলনীয় না।

দেশ রূপান্তর : ছাত্ররাজনীতির চলমান ধরন কি নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিবিমুখ করে তুলছে?

আসিফ নজরুল : ছাত্ররাজনীতি যে শব্দটা আমরা ব্যবহার করছি, এটা তো এখন আর ছাত্ররাজনীতি না। ছাত্ররাজনীতির নামে অত্যাচার, নিপীড়নমূলক আধিপত্য যেটা চলছে, এর প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ না থাকলেই তো ভালো। কিন্তু সুস্থধারার যে ছাত্ররাজনীতি আছে, বাম সংগঠনগুলো যেটা করে বা কোটা সংস্কার আন্দোলনে, সড়ক আন্দোলনে যেটা দেখেছেন... সেটার প্রতি তো তরুণ প্রজন্মের আগ্রহের কমতি নেই। যেসব ব্যাপারে মানুষের অধিকার, জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত সেখানে তরুণ প্রজন্ম কীভাবে সাড়া দেয়।

দেশ রূপান্তর : ২৯ বছর পর সম্প্রতি ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। তখন অন্য বড় বিশ্ববিদ্যলয়গুলোতেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠেছিল। কিন্তু আবারও সব বন্ধ হয়ে গেল। ছাত্র সংসদ কেন কার্যকর করা যাচ্ছে না?

আসিফ নজরুল : ডাকসু নির্বাচনের পরই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত সরকারবিরোধী বা সরকারের সঙ্গে নেই এমন ছাত্র সংগঠনগুলার কিছুটা সহাবস্থানের জায়গা তৈরি হয়েছিল। এখানে নিয়ম আছে ডাকসু নির্বাচন করার, চাহিদা আছে, সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে একটা এক্সপেক্টেশন আছে, এর একটা ইতিবাচক ফল আছে... এসবের পর তো এটা আর না করার কোনো যুক্তি আমি দেখতে পাই না। একটাই যুক্তি হতে পারে যে, সরকার চায় না। ডাকসু হলে সরকার সমর্থক দলের যে একাধিপত্য সেটা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হয়।

দেশ রূপান্তর : সাম্প্রতিককালে দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন’ এবং ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’। এই দুটি আন্দোলন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

আসিফ নজরুল : সাধারণ ছাত্ররা যে তাদের অধিকার সচেতন, তারা যে তাদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে ভাবে, দেশ নিয়ে ভাবে এসবের রিফ্লেকশন। বিশেষ করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন যে নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে, সেই বিভীষিকা আমি ভুলতে পারি না। এই আন্দোলনটার যে সম্ভাবনা ছিল সেটা শক্তি প্রয়োগ করে, গুন্ডাপান্ডা এবং পুলিশ লাগিয়ে, বিভিন্ন মামলা দিয়ে সরকার দমন করেছে...। ইস্যুটা কিন্তু দমন হয়নি, আন্দোলনটাকে দমন করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত