অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে ফের সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৪:৫৪ এএম

শুধু বাংলাদেশেরই নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সর্বস্তরে কৃচ্ছ্রসাধনসহ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও সবাইকে মিতব্যয়ী হতে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় এমন নির্দেশনা দেন সরকারপ্রধান। সভায় উপস্থিত থাকা মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

ওই সভায় ফরিদপুর-২ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় সদ্য প্রয়াত সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছোট ছেলে শাহদাব আকবর লাবুকে। সংসদ উপনেতার মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়।

এর আগে গত ১৯ জুলাই বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে মন্ত্রিসভার সদস্যসহ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সবাইকে বিদ্যুতের ব্যবহারসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিনি ওই পরামর্শ দেন। গতকালের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় উপস্থিত থাকা সদস্যরা জানান, অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার যেসব উদ্যোগ গ্রহণ ও নির্দেশনা প্রদান করেছে তা মানার ব্যাপারে সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন, অতি প্রয়োজন এসব বিচার-বিবেচনায় নিয়ে সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাইকে কাজ করতে হবে। একটু ভুলে অনেক বড় মাশুল গুনতে হবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন জায়গায় পৌঁছানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় সবাইকে কৃচ্ছ্রসাধনের বিকল্প নেই।’

প্রধানমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সভায় উপস্থিত সবার কাছে। যুক্তরাজ্যে ঘোরার অভিজ্ঞতা, রানীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তাকে জানানো সম্মান এসব নিয়েও অবহিত করেন। সভায় দলের জাতীয় সম্মেলনের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। তৃণমূলে সম্মেলনের অগ্রগতির খোঁজ নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। আগামী সপ্তাহে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিসহ দিনক্ষণ নির্ধারণ করা ও ঘোষণা করার কথাও জানান শেখ হাসিনা। ওই সভায় ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগসহ মেয়াদোত্তীর্ণ অন্য সহযোগী সংগঠনের দিনক্ষণও ঘোষণা করা হবে। গতকালের বৈঠকে ছাত্রলীগের চলমান পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। আগামী বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে আসবেন বলেও জানানো হয়।

সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ফরিদপুর-২ আসনের উপনির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি সাধারণ উপনির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়। আগামী ৫ নভেম্বর ফরিদপুর-২ আসনে উপনির্বাচন হবে। এর আগে যে কজন সংসদ সদস্য প্রয়াত হয়েছেন সবকটি উপনির্বাচনে তাদের পরিবারের বাইরে দলীয় প্রার্থী মনোনীত করা হয়। তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে সিরাজগঞ্জে শূন্য হওয়া আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তার ছেলে তানভীর শাকিল জয়। এ ছাড়া সাজেদা চৌধুরীর মৃত্যুতে ফরিদপুরে মনোনয়ন পেলেন তার ছেলে শাহদাব আকবর লাবু।

ইসির তফসিল অনুযায়ী, ফরিদপুর-২ আসনে উপনির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ১০ অক্টোবর, মনোনয়নপত্র বাছাই ১২ অক্টোবর, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৯ অক্টোবর। একই ধরনের তফসিলে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের বেশ কিছু সাধারণ ও উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

মনোনয়ন বোর্ডের একই সভায় দেশের ৭টি উপজেলা, ৪টি পৌরসভা ও ২৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে রৌমারীতে মো. রেজাউল ইসলাম, চিলমারীতে মো. সোলায়মান আলী সরকার, খোকসায় মো. বাবুল আখতার, নেত্রকোনা সদরে মো. আতাউর রহমান, ওসমানীনগরে মো. শামীম আহমদ, জগন্নাথপুরে মো. আকমল হোসেন ও কর্ণফুলীতে ফারুক চৌধুরীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

পৌরসভা নির্বাচনে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মো. আমজাদ হোসেন, জামালপুরের হাজরাবাড়ীতে সামছুজ্জামান, সিলেটের বিশ্বনাথে ফারুক আহমদ এবং চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আলহাজ মো. ইসমাইল হোসেনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ীতে এসএম আশরাফুল হক (মিঠু), জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের বড়তারায় মো. বোরহান উদ্দীন ফকির ও তুলসীগঙ্গাতে মো. বজলুর রহমান খান, বগুড়ার শাহাজাহানপুরের আশেকপুরে মো. ইনছান আলী, কুষ্টিয়া সদরের জিয়ারখীতে মো. শাহজাহান আলী ও কাঞ্চনপুরে মো. একরামুল হক, একই জেলার মিরপুরের চিথলিয়ায় মো. এনামুল হক বাবলু ও ধুবইলে মো. মাহাবুর রহমান, যশোর সদরের আরবপুরে মো. শাহারুল ইসলাম, বাগেরহাট সদরের রাখালগাছিতে রবিউল ইসরাম ফারাজী ও মোল্লাহাটের উদয়পুরে এসএম সাইকুল আলম, খুলনার দিঘলিয়ার বারাকপুরে গাজী সাহাগীর হোসেন, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের আমড়াগাছিয়ায় শাহেদুল ইসলাম, টাঙ্গাইলের গোপালপুরের নগদা শিমলায় মো. আসাদুজ্জামান, মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের সুতালড়ীতে গোলজার হোসেন, ঢাকার দোহারের রাইপাড়াতে মো. আমজাদ হোসেন, মাহমুদপুরে আইয়ূব আলী ও সুতারপাড়ায় শেখ নাসির উদ্দিন, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার হোসেন্দীতে মো. মনিরুল হক মিঠু, জামালপুরের মেলান্দহের আদ্রায় মো. রফিকুল ইসলাম ও ফুলকোচায় মো. মামুনুর রশিদ, নেত্রকোনার মদনের নায়েকপুরে মোহাম্মদ মোছলেহ উদ্দিন ভূঞা, সিলেটের গোয়াইনঘাটের পশ্চিম জাফলংয়ে মো. নজরুল ইসলাম, গোয়াইনঘাট ইউপিতে সুভাষ চন্দ্র পাল, পূর্ব জাফলং ইউপিতে মো. রফিকুল ইসলাম ও মধ্য জাফলং ইউপিতে ফারুক হোসেনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় : শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে গতকাল বিকেলে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় সরকারপ্রধান আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ধরে রেখে সবাইকে ভিন্ন মত ও ধর্মকে সম্মান দেখানোরও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া যাবে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি এই বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার তৈরি, আল্লাহর তৈরি, যে যেভাবেই ডাকে না কেন, সেই শক্তির প্রতি, যারাই যেভাবে যতটুকু যার যার বিশ্বাস থেকে সে যেভাবে উদযাপন করে সেখানে সবাইকে সম্মান দেখানো উচিত, কেউ কাউকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।’

সরকারপ্রধান ইসলাম ধর্মের উদারতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের ইসলাম ধর্ম। এটা অনেক উদার ধর্ম, আমাদের ইসলাম ধর্মে সব ধর্মের প্রতি সম্মান দেখানোর নির্দেশ আছে।’

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সবসময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমরা জানি, ’৭৫-এর পর অনেক ঘটনা ঘটেছে... কখনো কখনো কিছু কিছু ঘটনা ঘটে। কিন্তু আপনারা নিশ্চয়ই একটা জিনিস লক্ষ করেছেন আমাদের সরকার সবসময় এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। যেকোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের এই দেশে যারা জন্মগ্রহণ করেছে, এই দেশে যারা বসবাস করে বা যারা বাংলাদেশের নাগরিক সে যে ধর্মেরই হোক যার যার ধর্ম সবাই স্বাধীনভাবে পালন করবে। আমরা কিন্তু প্রত্যেকটা উৎসবই ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে উদযাপন করি। যে কারণে বলি, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। আমরা সবসময় চেষ্টা করি আমাদের এই দেশটা যেন সবসময় অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে চলতে পারে। কোথাও কোনো দুর্ঘটনা হলে পরে সেটাকে খুব বড় করে না দেখে তার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সে বিষয়টিতে আপনাদের নজর দিতে অনুরোধ করব। সে সঙ্গে আপনাদের সহযোগিতাও চাইব। আপনারাও সেই সহযোগিতা করবেন।’

মহালয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার সময় পঞ্চগড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় শোক এবং সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্ব মন্দা পরিস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সবাইকে অনুরোধ করব কারও কোনো এলাকায় এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। কারণ সারা বিশ্বে এখন যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে, আমি যখন জাতিসংঘে গিয়েছি সেখানে অনেক দেশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সবাই খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত যে, ২০২৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। আরও ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমি বলব, আমাদের দেশের মানুষকে এখন থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের মানুষ আছে, আমাদের মাটি উর্বর, কোনো জমি যেন অনাবাদি না থাকে। যে যা পারেন উৎপাদন বৃদ্ধি করে নিজেদের সঞ্চয় বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি সবকিছু ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং এরপর এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞার ফলে সারা বিশ্বে মানুষের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারীর পর এলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের ফলে দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ফলে আজকে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের সাধারণ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, বিদ্যুৎ-গ্যাস এবং জ¦ালানি প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে এখন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত