জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে পুঁতে রাখা বোমা (আইইডি) বিস্ফোরণে নিহত তিন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর মরদেহ দেশে এনে দাফন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার নিজ নিজ গ্রামে সামরিক মর্যাদায় তাদের দাফন করা হয়। গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
এর আগে গতকাল ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি এভিয়েশন হ্যাঙ্গারে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ ও ঢাকা সেনানিবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সেনাবাহিনীর প্রধান নিহত শান্তিরক্ষীদের সম্মানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর সেনাসদস্যদের মরদেহ আর্মি এভিয়েশনের হেলিকপ্টারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিরাজগঞ্জ ও নীলফামারীতে নিজ নিজ গ্রামে পাঠানো হয়। সেখানে তাদের দাফন করা হয়।
নিহত শান্তিরক্ষীদের মরদেহ তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ।
আগামী ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বাড়ি ফেরার কথা ছিল সেনা সদস্য জাহাঙ্গীর আলমের (২৬)। তার আগেই বাড়ি এলেন, তবে কফিনবন্দি হয়ে। জাহাঙ্গীরের মরদেহ দেখে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। গতকাল দুপুরে নামাজে জানাজায় অংশ নেওয়া শত শত মানুষের অশ্রুধারায় পূর্ণ সামরিক মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ তিতপাড়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক জাহাঙ্গীর আলমকে।
জাহাঙ্গীর আলমের বড় ভাই সেনা সদস্য আবুজার রহমান বলেন, ‘২০১৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় জাহাঙ্গীর। এক বছর আগে বিয়ে করেছিল। ১০ মাস আগে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে শান্তিরক্ষা মিশনে যায় জাহাঙ্গীর। ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর থেকে সে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের পশ্চিম সেক্টরের বোয়ার এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের (ব্যানব্যাট-৮) সঙ্গে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল।’
নিহত আরেক শান্তিরক্ষী জসিম উদ্দিনের মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। গতকাল বাদ আসর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার খাটিংগা গ্রামে জানাজা শেষে নিজ বাড়িতেই তাকে দাফন করা হয়। এ সময় সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিহত জসিমের বড় ভাই জুলহাস মিয়া জানান, তিনি এবং তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী মো. আবদুন নূর গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সেনাপ্রধানের উপস্থিতিতে নিহত জসিমের মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে সেনাবাহিনীর ৬১ বেঙ্গলের ক্যাপ্টেন শামীমের নেতৃত্বে সম্পূর্ণ সেনা তত্ত্বাবধানে বেলা ২টায় তারা জসিমের মরদেহ নিয়ে বাড়িতে পৌঁছলে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর বাদ আসর নিজ বাড়িতেই নামাজে জানাজা শেষে জসিমকে দাফন করা হয়।
নিহত শান্তিরক্ষী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক শরিফ হোসেনের মরদেহ দাফন করা হয়েছে গতকাল দুপুরে নিজ গ্রাম সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার পৌর এলাকার বেড়া খারুয়ার কবরস্থানে। এর আগে দুপরে শরিফের মরদেহবাহী সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি তার গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও জাতিসংঘের পতাকা দিয়ে আবৃত মরদেহবাহী কফিন গ্রহণ করেন শরিফের বাবা লেবু তালুকদার। তখন সেখানে শরিফের স্ত্রী সালমা খাতুন, মা পাঞ্জু আরা বেগম, ছোট বোন লাকী খাতুন ও ছোট ভাই কাওসার তালুকদারসহ অন্য স্বজনরা শরিফের কফিন জড়িয়ে ধরে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারিতে এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বেলা আড়াইটার দিকে স্থানীয় মাঠে নামাজে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বেড়া খারুয়া কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ৩ অক্টোবর মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে (সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক) স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি গাড়িবহর টহল থেকে ফেরার পথে আইইডি বিস্ফোরণের কবলে পড়ে। এতে বহরের সামনের গাড়িতে থাকা বাংলাদেশের তিন শান্তিরক্ষী নিহত হন। প্রয়াত সেনাসদস্যদের মরদেহ গতকাল ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এসে পৌঁছায়। এ পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের ১২৯ জন সেনাসদস্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আফ্রিকার আটটি দেশে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা এবং সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা
