খুলনায় বিএনপির গণসমাবেশকে সামনে রেখে চলছে দুদিনের বাস ধর্মঘট। এরই মধ্যে হঠাৎ গতকাল শুক্রবার থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে লঞ্চ চলাচলও। বেতন বৃদ্ধিসহ ১০ দফা দাবিতে এ ধর্মঘট ডেকেছে নৌযান শ্রমিকরা। ফলে খুলনা থেকে দক্ষিণ দিকে যাওয়ার সব লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা ও চাকরিপ্রত্যাশীরা।
আজ শনিবার খুলনায় বিভাগীয় গণসমাবেশের আয়োজন করেছে বিএনপি। ওইদিন দুপুরে নগরীর সোনালী ব্যাংক চত্বরে এ সমাবেশ হবে।
খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মাগুরা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে এনেছেন।
ভোগান্তিতে খুলনার চাকরির পরীক্ষার্থীরা : গণসমাবেশ সামনে রেখে দুদিন আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ রাখায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ ও চাকরির পরীক্ষার্থীরা। গত মঙ্গলবার রাতে খুলনা জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি ও খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন যৌথভাবে এ সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে ১৬তম গ্রেডভুক্ত তৃতীয় শ্রেণির সমাজকর্মী পদে জনবল নিয়োগের জন্য গতকাল সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত লিখিত/এমসিকিউ পরীক্ষা হয়। ওই পরীক্ষায় খুলনা থেকে আবেদন করেছেন ১৩ হাজার ৩৭৬ প্রার্থী। খুলনা শহরের ১৩টি কেন্দ্রে এ পরীক্ষা হয়। বাস বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থীরা।
লঞ্চঘাটে আসা কয়রার যাত্রী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমাজকর্মী নিয়োগ পরীক্ষা দিতে রাতেই কয়রা থেকে খুলনায় এসেছি। রাতে ছিলাম এক আত্মীয়ের বাসায়। পরীক্ষা দিয়ে চলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু বাস চলাচল না করায় লঞ্চঘাটে এসে দেখি লঞ্চও বন্ধ।’
গতকাল সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে নানা ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে। এ সময় বাগেরহাট থেকে আসা মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘এভাবে বন্ধ করা ঠিক হয়নি। অনেক ভোগান্তি পেরিয়ে খুলনা শহরে পৌঁছেছি। যাব যশোর। বাস বন্ধ থাকায় এখন আবার বাড়ি ফিরে যেতে হবে।’
গোপালগঞ্জ থেকে আসা শুক্কুর আলী বলেন, ‘অনেক কষ্টে খুলনায় পৌঁছেছি। পারিবারিক কাজে যশোর যাব। বউ, ছেলেমেয়ে নিয়ে চরম বিপদে পড়েছি। এভাবে বাস বন্ধের মানে হয় না। এখন কী করব ভাবছি।’
পাইকগাছা থেকে পরীক্ষা দিতে আসা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বাস বন্ধ থাকায় মোটরসাইকেল ভাড়া করে আসতে হয়েছে। যেখানে বাসে ১০০ টাকা খরচ হতো, সেখানে ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। তা ছাড়া নানা ভোগান্তি তো আছেই।’
খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বিপ্লব বলেন, ‘জেলায় পরিবহন খাতে ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তারা এখন কর্মহীন।’
খুলনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক খান মোতাহার হোসেন বলেন, ‘একযোগে বাংলাদেশে ৬৪টি জেলায় পরীক্ষা হচ্ছে। এটা পূর্বঘোষিত। খুলনায় এখন বাস বন্ধ হলে কিছু করার নেই।’
খুলনামুখী যাত্রীদের ভিড় যশোর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে : হঠাৎ গতকাল দুপুর থেকে খুলনা অভিমুখী বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন বাসমালিক ও শ্রমিকরা। এদিন সকালেও যশোর-খুলনা মহাসড়কের খুলনা ছাড়া অন্যান্য স্থান থেকে বাস এসেছে যশোরে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বলা হচ্ছিল শুধু খুলনায় গণপরিবহন চলাচল করবে না। কিন্তু হঠাৎ যশোর থেকে খুলনা রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন যশোর শহরে চাকরির পরীক্ষা দিতে আসা নারী ও পুরুষ। বিভিন্ন জেলা থেকে খুলনামুখী যাত্রীদের ভিড় দেখা যায় যশোর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে।
যশোর থেকে খুলনাগামী বেসরকারি একটি সংস্থার কর্মী হুমায়ুন কবিরকে তার ছয় মাস ও ছয় বছর বয়সী মেয়েসহ স্ত্রীকে নিয়ে যশোর বাস টার্মিনালে বসে থাকতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘শুক্র ও শনিবার ছুটি থাকায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে খুলনার বয়রায় গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলাম। যশোর টার্মিনালে এসে দেখি বাস চলাচল বন্ধ। শুনেছিলাম খুলনার সঙ্গে বাস চলাচল বন্ধ থাকবে; তবে এ রুটে সব বাস বন্ধ থাকবে সেটা জানতাম না। বাস না পাওয়ায় আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হলো না। কর্মস্থলের কোয়ার্টারে চলে যাচ্ছি।’
বিপ্লব বিশ^াস নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘অভয়নগর উপজেলা থেকে সকালে সমাজসেবা অধিদপ্তরে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা দিতে যশোর শহরে এসেছি। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফেরার জন্য দুপুরে বাস টার্মিনালে এসে দেখি খুলনা রুটে বাস চলছে না। বড় ধরনের সংকটে পড়েছি।’
খুলনা-চুয়াডাঙ্গা লাইনের শাপলা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার সবদুল শেখ বলেন, ‘যশোর থেকে ১৭ রুটে বাস চলাচল করে। শুধু যশোর থেকে খুলনায় কোনো বাস চলাচল করছে না। বিএনপির সমাবেশের কারণে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।’
যশোর-খুলনা পরিবহন রুটের যশোর টার্মিনালের সময় নিয়ন্ত্রক মাছুম চৌধুরী বলেন, ‘মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। বাস বন্ধ হওয়ায় অফিসে বসে মানুষের ভোগান্তি দেখছি; তবে আমাদের কিছু করার নেই।’
যশোর আন্তঃজেলা বাস সিন্ডিকেটের সাধারণ সম্পাদক ও ঈগল পরিবহনের স্বত্বাধিকারী পবিত্র কাপড়িয়া বলেন, ‘সরকারের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। খুলনার সমাবেশকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সেই কারণে আমরা নিজেরাই খুলনাগামী সব রুটে বাস বন্ধ রেখেছি। এমনকি বিএনপি কোনো নেতাকর্মীদেরও বাস ভাড়া দিচ্ছি না।’
যশোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সৈয়দ সাবেরুল হক বলেন, ‘যশোরের কোনো বাস বা মাইক্রোবাস আমাদের কাছে ভাড়া দিচ্ছে না। এ বিষয়ে আমরা পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের অনেকে বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।’
বাগেরহাটে লাঠি হাতে পাহারা সরকার সমর্থকদের : বাগেরহাট থেকে খুলনাসহ সব রুটে গণপরিবহন শুক্রবার ভোর থেকে বন্ধ থাকায় চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আসারা প্রার্থীরা বিপাকে পড়েন। মোটরসাইকেল, ভ্যান, ইজিবাইক ও হেঁটে পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে আসেন। তবে পথে পথে ছিল আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ নেতাকর্মীদের বাধা। বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দেখা গেছে, কাউন্টার বন্ধ। লাঠি হাতে মোড়ে মোড়ে পাহারা দিতে দেখা গেছে সরকার সমর্থকদের। ভ্যান-রিকশা, ইজিবাইকেও আটকাচ্ছেন তারা। খুলনা থেকে যাত্রী নিয়ে আসা ইজিবাইক চালকদেরও বকাঝকা করেছেন।
নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে বাগেরহাট থেকে গোপালগঞ্জের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হওয়া ইয়াসমিন আক্তার নামে এক পরীক্ষার্থী বলেন, ‘বড় ভাইয়ের সঙ্গে বের হয়ে কোনো যানবাহন না পাওয়ায় এখন হাঁটছি। সময়মতো কেন্দ্রেই হয়তো যেতে পারব না।’
পাবনা থেকে পিরোজপুরের উদ্দেশে আসা হাসান নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘খুলনায় ভোররাত ৪টার সময় পৌঁছলেও ভ্যানে চড়ে বাগেরহাট আসতে সময় লেগেছে প্রায় চার ঘণ্টা। পথে বিভিন্ন জায়গায় দাঁড় করানো হয়।’
সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে টিকিট কাউন্টারে তালা : খুলনাগামী সব বাস একত্রিত হয়ে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সব টিকিট কাউন্টারে তালা ঝুলছে। সাতক্ষীরায় বন্ধ রয়েছে খুলনা অভিমুখে চলাচলকারী সব বাস ও পরিবহন। তবে যশোরসহ দেশের অন্যান্য রুটের গণপরিবহন চলাচল করছে।
সাতক্ষীরা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক সাইফুল করিম সাবু জানিয়েছেন, ‘বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে শ্রমিকরা ধর্মঘট করেছে। খুলনার কেন্দ্রীয় শ্রমিক নেতাদের আহ্বানে তাদের বাস চলাচল বন্ধ করতে হয়েছে। এ ছাড়া জোরপূর্বক চলাচল করতে গেলে তাদের ওপর হামলা ও ভাঙচুর হতে পারে এ আশঙ্কায় খুলনা রুটের বাস বন্ধ রয়েছে।’
পাটকেলঘাটার পথযাত্রী আবু তালেব জানান, বাস বন্ধ থাকায় চলাচলে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গাদাগাদি করে ইঞ্জিনভ্যান, মাহেন্দ্র ও ইজিবাইকে খুলনায় যেতে হচ্ছে। এ জন্য ভাড়া ও সময় বেশি লাগছে।
বাবার মরদেহ শেষবার দেখা হলো না : কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, কিছু যাত্রী খুলনায় যাওয়ার উদ্দেশে অপেক্ষায় রয়েছেন। কয়েকটি পরিবহন বাইরে থেকে এলেও নিয়মিত যাতায়াতকারী খুলনা থেকে কোনো পরিবহন আসেনি।
খুলনায় মৃত বাবার মরদেহ শেষবারের জন্য দেখতে চুয়াডাঙ্গা বাস টার্মিনালে যান ফিরোজ ইফতেকার। বেলা ৩টা পর্যন্ত কোনো বাস নেই দেখে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমার বাবার লাশ দেখতে যাব, কিন্তু বাস যে বন্ধ। খুলনা যাওয়া যাচ্ছে না।’
রফিক নামে আরেক শিক্ষার্থী জানান, বাস বন্ধ থাকায় ট্রেনে যেতে হয়েছে। সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি খুলনাগামী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
মাগুরা : মাগুরা থেকে যশোরে লোকাল বাস চললেও তা কড়াকড়িভাবে পুলিশের আওতায় চলাচল করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। তবে গতকাল সারাদিন মাগুরা থেকে নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেলে খুলনার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। বিএনপি কর্মীদের অভিযোগ, খুলনায় অনুষ্ঠিতব্য শনিবারের মহাসমাবেশ ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যেই এটি ক্ষমতাসীনদের একটি ষড়যন্ত্রমূলক উদ্যোগ।
