গাড়িতেই ছুরির ২৫ আঘাতে খুন বিএনপি নেতা কামাল

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২২, ০২:০৮ এএম

নিজের প্রাইভেট কার নিজেই চালিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন আ ফ ম কামাল। পেছন থেকে তাকে অনুসরণ করছিল মোটরসাইকেল আরোহী ৩ জন। তিনি সিলেট-বিমানবন্দর সড়ক হয়ে আম্বরখানা বড়বাজার গলিপথ দিয়ে গোয়াইটুলার দিকে যাচ্ছিলেন। বড়বাজার ১১৮ নম্বর বাসার সামনে পৌঁছলে গাড়ির সামনে ধাক্কা লাগিয়ে দুর্ঘটনার নাটক সাজান মোটরসাইকেল আরোহীরা। এসময় ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। অন্ধকারের মধ্যে চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ভেবেছিলেন দুর্ঘটনা। আর এই সুযোগে গাড়ির ভেতরেই উপর্যুপরি ২৫টি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আ ফ ম কামালকে।

লাশের সুরতহাল প্রস্তুতকারী পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আ ফ ম কামালের বাম হাতে ১৬টি, বাম বগলের নিচে ২টি, বুকের বাম পাশে ১টি ও বাম পায়ে ৬টি আঘাত করা হয়েছে।

গত রবিবার রাত ৯টার দিকে এই নির্মম হত্যাকান্ড ঘটে। পুলিশ ওই এলাকার একাধিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে হত্যাকান্ডের এই দৃশ্য পেয়েছে। তবে ঠিক যেখানে গাড়ি থামিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে সেখানের কাছাকাছি কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকায় দূরের ক্যামেরায় ধরা পড়া ফুটেজে খুনিদের চেহারা সুস্পষ্ট নয়। পুলিশ নানা কৌশলে খুনিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ এসব তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ‘সবদিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে হত্যাকান্ড-টি পরিকল্পিত। খুনিরা অনেক দূর থেকে তার পিছু নিয়েছিল। তারপর বিদ্যুৎবিহীন গলিপথে দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়ে তার গাড়ি থামিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে তারা দ্রুত চলে গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা’।

নিহত আ ফ ম কামাল ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। জেলা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ও সিলেট আইন মহাবিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সিলেট সদর উপজেলা বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলনে তিনি সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন। তবে অল্প ভোটে তিনি হেরে যান। দলের প্রতি তিনি সব সময়ই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তাই আ ফ ম কামালকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে রবিবার রাতেই নগরে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তারা টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে এবং নগরীর রিকাবীবাজারে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভা উপলক্ষে টানানো বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর একাধিক ছবিও ভাঙচুর করে। তখন আওয়ামী লীগও পাল্টা মিছিল বের করে এবং দুইপক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। তবে বড় ধরনের কোনো সহিংসতা হয়নি।

রবিবার রাতে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আ ফ ম কামালকে খুন করেছে।

এদিকে সোমবার বিকেলে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকী ও সদস্য সচিব মিফতাহ সিদ্দিকী এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা নিরপরাধ বিএনপি নেতা আ ফ ম কামালকে হত্যা করেছে। তারা হত্যাকা-ের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।  

এদিকে আ ফ ম কামালের লাশের ময়নাতদন্ত গতকাল সোমবার বিকেলে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্পন্ন হয়। লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, লাশ দাফন করে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে। 

পুলিশ ও বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানান, আ ফ ম কামাল পাথর ব্যবসা ও ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ব্যবসা নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। গত ১৫ অক্টোবর জিন্দাবাজার এলাকার আল মারজান শপিং সেন্টারের সামনে দুই পক্ষের হাতাহাতিও হয়। পরদিন কামালসহ কয়েকজনকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন বিএনপি নেতা আজিজুর রহমান স¤্রাট। স¤্রাটের বাসা নগরীর বড়বাজার এলাকায়। কামাল হত্যাকা-ও ওই এলাকাতেই ঘটেছে। ব্যবসাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন, ‘আ ফ ম কামালের গাড়িতে হত্যাকা-ে জড়িতদের হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। পুলিশ সেগুলো সংগ্রহ করেছে। ছুরিকাঘাতকারীরা তাদের রক্তাক্ত হাত দিয়ে গাড়ির বিভিন্ন জায়গায় ধরেছে। এই আলামতগুলো খুনি শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে’। তিনি আরও বলে, ‘আশা করছি খুনিদের খুব কম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করতে পারব। তারা প্রায় শনাক্ত হয়ে গেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত