বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়ার শূন্যরেখায় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠন ‘আরসা ও আরএসও’ এর মধ্যে দিনভর গোলাগুলির পর আশ্রয় শিবিরটিতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে শত শত ঘর পুড়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে রাত ১০টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত আশ্রয় শিবিরটিতে ‘আরসা ও আরএসও’ এর মধ্যে থেমে থেমে গোলাগুলি চলছিল। গুলিতে কমপক্ষে ৩ রোহিঙ্গা নিহত এবং কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
আগুনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করলেও হতাহত কিংবা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেননি। ক্যাম্পে আগুন লাগার পর ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কিছু রোহিঙ্গা পরিবার শূন্যরেখার আশ্রয় শিবির ছেড়ে তমব্রু বাজার এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে বলে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আবার অনেক রোহিঙ্গা মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলে গেছেন। তমব্রু বাজার এলাকায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে বিজিবির সদস্যরা কড়া নিরাপত্তায় ঘিরে রেখেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এসব রোহিঙ্গাকে শূন্যরেখায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থল শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হওয়ায় আন্তর্জাতিক রীতি মতে প্রশাসন বা বিজিবিসহ সীমান্ত সংশ্লিষ্টরা ঘটনার প্রকৃত কারণ ও চিত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত নন। একই কারণে ঘটনার ব্যাপারে গণমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সীমান্তে উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি কড়া সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জানা গেছে, গতকাল সকাল ৬টার পর থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ঘুমধুমের তমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়ার শূন্যরেখায় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে মিয়ানমারের সশস্ত্র দুই পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। এতে কমপক্ষে ৩ রোহিঙ্গা নিহত হন। তাদের মধ্যে একজন হামিদ উল্লাহ (২৭)। অন্য দুইজনের মরদেহ পাওয়া গেলেও নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শিশুসহ দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তারা হলো- টেকনাফের ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৫ ব্লকের বাসিন্দা দিলদার আহমদের ছেলে মুহিব উল্লাহ (২৫) ও তমব্রু কোনারপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা নুর হোসেনের ছেলে মো. হোসেন (১২)। নিহতদের লাশ উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন। প্রথম দফার গোলাগুলি শেষে বিকেল ৫টার দিকে ওই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লাগে। কে বা কারা আশ্রয় শিবিরটির কিছু ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল রাত ১০টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত সেখানে আগুন জ্বলছিল। একইসঙ্গে থেমে থেমে চলছিল গোলাগুলি।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিকেল ৫টার দিকে তমব্রু শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ওই ক্যাম্পে আশ্রয়রত রোহিঙ্গাদের অনেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেক রোহিঙ্গা মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলে গেছেন। গোলাগুলির শব্দ আগের চেয়ে বেড়েছে। স্থানীয়রা চরম আতঙ্কে রয়েছেন।’
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমেন শর্মা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘বিস্তারিত খবর নিয়ে জানাতে হবে। তবে স্থানীয়দের দাবি মিয়ানমানের দুই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে।’
উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘তমব্রু সীমান্তে শূন্যরেখা থেকে ওই দুজনকে উদ্ধার করে কুতুপালং ক্যাম্পের পাশে এমএসএফ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হামিদ উল্লাহকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তে গোলাগুলিতে হামিদ উল্লাহ নামে একজনের মৃতদেহ উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে রয়েছে। সেখানে গুলিবিদ্ধ শিশুসহ আহত আরও ২ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছি।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন বান্দরবান প্রতিনিধি
