নির্বাচনী প্রচারে থাকবে করদাতা বৃদ্ধির সফলতা

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:২৮ এএম

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চলতি বছরে আরও ২০ লাখ নতুন করদাতার সন্ধানে মাঠে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে বছর শেষে করদাতার সংখ্যা এক কোটিতে পৌঁছাবে। আগামী নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারের আরও অনেক সফলতার সঙ্গে করদাতা বৃদ্ধির বিষয়টিও উল্লেখ করা হবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ভ্যাট (ভেলু এডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) ধনী-দরিদ্রকে একই হারে দিতে হলেও আয়কর সম্পদের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে দিতে হয়। ১৬ কোটি মানুষের এদেশে আরও আগেই করদাতার সংখ্যা এক কোটির বেশি হওয়া উচিত ছিল। ধনীদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হলে ভ্যাট আদায়ে চাপ কমবে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর রাজস্বের বোঝা কমবে।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে এনবিআর পুরনো ১০ ডিজিটের টিআইএন বাতিল করে ১২ ডিজিটের ই-টিআইএন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে। এতে গত ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা ৫৪ লাখ হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৫ কোটি করদাতা সংগ্রহে এনবিআরকে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৮৪ লাখ ৬০ হাজার ৩৮৪ জন ই-টিআইএনধারী নিবন্ধন নিয়েছেন। আগামী বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি বছরে আরও ২০ লাখ করদাতা চিহ্নিত করা সম্ভব হলে করদাতার সংখ্যা এক কোটির মাইলফলক ছুঁয়ে যাবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরে পাঠানো নির্দেশে বলা হয়েছে, ‘প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাংলাদেশে কম, ১০ শতাংশ। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার অনুপাতে নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যাও কম। প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ কর নিবন্ধন নিয়েছেন। বার্ষিক রিটার্ন দেন ১ শতাংশের কিছু বেশি। করজালের বিস্তারে সফলতা দেখানোর সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে এনবিআরকে যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। এনবিআরের সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে তবে তা পর্যাপ্ত নয়। আরও বাড়াতে হবে। জনসংখ্যার অনুপাতে ভুটানের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি কর দেন। জনসংখ্যার ১১ শতাংশের বেশি প্রত্যক্ষ করের আওতায় রয়েছেন। নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ নাগরিক করের আওতায়। শ্রীলঙ্কায় মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশের বেশি মানুষ করজালে আছেন।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৬ কোটি মানুষের এদেশে করদাতার সংখ্যা ৪ কোটির বেশি হওয়া উচিত। সরকার করদাতা বাড়াতে সচেতন হয়েছে এটা আশার কথা। এক্ষেত্রে সফলতা আনতে হলে অবশ্যই এনবিআরকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পূর্ণ অর্জন করতে হবে। এখনো এনবিআরের এ সক্ষমতা হয়নি। তাই করদাতা কতটা বাড়বে তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। 

এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তকে বলেন, করদাতা বাড়াতে এনবিআরকে শহর-কেন্দ্রিকতা ছেড়ে উপজেলা পর্যায়ে যেতে হবে। এনবিআরের অনেক কর্মকর্তা শহরে থেকে চাকরি করতে চান। উপজেলায় যেতে আগ্রহী হন না। এনবিআরকে এ বিষয়ে কঠোর হতে হবে।  

করদাতার সংখ্যা বাড়াতে এরই মধ্যে এনবিআরের কর বিভাগ থেকে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের করযোগ্য সদস্যদের টিআইএন নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। নতুন বছরের শুরু থেকেই এনবিআর তরুণ করদাতা সংগ্রহে জোর দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে উপজেলা পর্যায়ে নতুন করদাতা সংগ্রহের হার বাড়াতে বলা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের সম্পদশালীদের চিহ্নিত করতে এনবিআর থেকে উপজেলায় রাজস্ব দপ্তর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এখনো অনেক উপজেলায় রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করা হয়নি। যে উপজেলায় এখনো রাজস্ব দপ্তর নেই সেখানে নতুন বছরে রাজস্ব দপ্তর স্থাপনে মনোযোগী হয়েছে এনবিআর। এনবিআর কর্মকর্তারা উপজেলার বড় বড় বাজারে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে সেখানে কে বা কারা বড় অঙ্কের বাণিজ্য করে তার তালিকা সংগ্রহ করবে। এরপর তালিকা ধরে খোঁজ নেওয়া হবে তারা ই-টিআইএন নিয়েছেন কি না। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ের ব্যাংকগুলোতে কে বা কারা বেশি টাকার হিসাবধারী তার তালিকা সংগ্রহ করে জানতে চাওয়া হবে করজালে নিবন্ধিত কি না। উপজেলায় বসবাসরত অনেক পরিবারের সদস্য বিদেশে থাকেন। তারা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে গিয়ে দেশে অর্থ পাঠান। এতে এসব ব্যক্তির আয়ের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। উপজেলার এসব প্রবাসী কোন চ্যানেলে কী পরিমাণে অর্থ পাঠান তারও খোঁজ নেবে এনবিআর। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অনেকে প্রকৃত বেতন গোপন করে কর সীমার বাইরে থাকেন। এ বিষয়ে এনবিআর নজরদারি বাড়িয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠার তার বিদেশি কর্মীদের দেশের মধ্যে নামমাত্র বেতন দিয়ে দেশের বাইরে বাকিটা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে এনবিআর বিদেশি কর্মীদের বেতনের পরিমাণ বাজার মূল্যের সঙ্গে যাচাই করবে। অনেক গৃহিণী স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পদের মালিক হলেও আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। ইটিআইএন গ্রহণ পর্যন্ত করেন না। অনেকে আবার এনবিআরের নজরদারি এড়াতে স্ত্রীর নামে লেনদেন করে নিজেরা করজালের বাইরে থাকেন। অন্যদিকে অনেক ব্যবসায়ী মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করলেও নিকটাত্মীয়, বিশ্বস্ত কর্মচারী বা বন্ধুর নামেও লেনদেন করে থাকেন। এসব ক্ষেত্রেও এনবিআর নজরদারি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন জনবহুল স্থানে করদাতা সংগ্রহে হঠাৎ পরিদর্শনে যাবেন এনবিআর কর্মকর্তারা। বিশেষভাবে নামিদামি বেসরকারি হাসপাতাল, বড় বড় শপিং মলে আসা ব্যক্তিরা ই-টিআইএন নিয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। যাদের ই-টিআইএন থাকবে না তাদের তাৎক্ষণিক ই-টিআইএন দেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত