নতুন শিক্ষাক্রমে জাতীয়তাবোধ ও বিশ্বনাগরিকতা

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:১২ পিএম

প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ আমাদের কর্মসংস্থান ও জীবনপ্রণালীতে ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আবার বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ বৃদ্ধি, অভিবাসন ও জাতিগত সংঘাতের মতো বিষয় পৃথিবীর সমস্যাকে আরও ত্বরানিত করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জনমিতিক সম্ভাবনাকে সম্পদে রূপান্তর করতে প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও ইতিবাচক দৃষ্টিসম্পন্ন দূরদর্শী, সংবেদনশীল, অভিযোজনে সক্ষম, মানবিক, বৈশ্বিক এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক।

ওপরের এসব ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই বহুল প্রতীক্ষিত নতুন শিক্ষাক্রম এ বছর থেকে দেশব্যাপী পরীক্ষামূলক সংস্করণ বাস্তবায়ন (প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে) শুরু হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে আগামীতে সব শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে। শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয় সর্বশেষ ২০১২ সালে। ফলে যুগোপযোগী নতুন শিক্ষাক্রমের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল।

নতুন শিক্ষাক্রমে প্রধানত তিনটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১. পাঠ্যবই পরিবর্তন ২. শিখন-শেখানো কৌশল পরিবর্তন ৩. মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন। নতুন শিক্ষাক্রমের দার্শনিক ভিত্তি হলো ডেভিড কোব-এর অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন। মূলত শিক্ষার্থীরা চারটি ধাপের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখবে। ডেভিড কোব-Learning is the process whereby knowledge is created through the transformation of experience (1984).  ডেভিড কোব-এর শিখন-শেখানো কৌশলের চারটি ধাপ হলো যথাক্রমে: ১. প্রেক্ষাপটনির্ভর অভিজ্ঞতা ২. প্রতিফলনমূলক পর্যবেক্ষণ ৩. বিমূর্ত ধারণায়ন এবং ৪. সক্রিয় পরীক্ষণ। ডেভিড কোব-এর অভিজ্ঞতানির্ভর শিখন মূলত আরেক দার্শনিক  পেঁয়াজের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে পারস্পরিক মিথস্ত্রিয়ার মাধ্যমে জ্ঞানলাভ করবে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ও বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এই নতুন শিক্ষাক্রম খুবই কার্যকর ও সময়োপযোগী। মূল্যায়ন পদ্ধতিতে অভিনব পদ্ধতি সংযোজন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হবে তিনভাবে। যথা: ১. শিখনকালীন মূল্যায়ন (সারা বছর ধরে চলবে) ২. সামষ্টিক মূল্যায়ন (বছরে দুইবার) ৩. আচরণিক মূল্যায়ন। নতুন শিক্ষাক্রমের ১০টি বিষয়ের মধ্যে ৫টি বিষয়ের (বাংলা, গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান) মূল্যায়ন হবে শিখনকালীন ও সামষ্টিকভাবে। বাকি ৫টি বিষয়ের মূল্যায়ন হবে শিখনকালীন (বিদ্যালয় পর্যায়ে)।

নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার কোনো দরকার নেই। অবশ্যই নতুন বই হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে বুঝে গেছে কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। গাইড বই বা অন্য কোনো সহায়ক বইয়েরও দরকার নেই। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও নতুন শিক্ষাক্রমের উপজেলা পর্যায়ের মাস্টার ট্রেনার (ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান) হিসেবে বলতে পারি, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির পাঠ চলাকালীন শিক্ষার্থীদের এত স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আনন্দঘন পরিবেশ আগে কখনো লক্ষ করা যায়নি।

নতুন শিক্ষাক্রমের পড়াশোনা পুরোপুরি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে বিভিন্ন শিখন কৌশল ও শিখন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করবে। যোগ্যতাভিত্তিক এই শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবই বিভিন্ন সেশন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।  নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের জন্য বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সহায়িকা (ঞএ) রাখা হয়েছে। শিক্ষকমন্ডলী এই শিক্ষক সহায়িকা দেখে পড়াবেন। শিক্ষক সহায়িকার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আশা করা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা এই নতুন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে বিশ^নাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে যে, শিক্ষকদের গুরুত্ব প্রদানের বিষয়টি এখনো হয়তো সবার মনোযোগের কেন্দ্রে নেই। তাই হয়তো আমার এক সহকর্মী কৌতুক করে বলছিলেন ‘বুঝলাম, নতুন শিক্ষাক্রম বিশ^মানের। তবে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কোন মানের?’

সে যাই হোক, নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু ভুলত্রুটি (বানান, তত্ত্ব ও লাইনের অসংগতি) চোখে পড়েছে। আমি ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে বলতে পারি ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির নতুন বইয়ে বেশ কিছু পৃষ্ঠায় বানান ভুল চোখে পড়েছে। যা গ্রহণযোগ্য ছিল না। কেননা মাধ্যমিক পর্যায়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থী এই ভুল দেখছে ও পড়ছে (যদিও শিক্ষকরা নিজে থেকে ক্লাসে ভুল সংশোধন করে দিচ্ছেন)। এটা ঠিক, নতুন বই মূলত ‘পরীক্ষামূলক সংস্করণ’।

পাঠ্যবইয়ের ভুলত্রুটি অবশ্যই সংশোধনযোগ্য। নতুন পাঠ্যবইয়ের সামান্য ভুলত্রুটি বা অসংগতি নিয়ে যারা বা যেসব মহল তিলকে তাল করছে তারা সঠিক কাজ করছে না। গঠনমূলক সমালোচনা সব পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য। নতুন শিক্ষাক্রম মূলত পুরো জাতির জন্য। সামান্য ভুলত্রুটি থাকলে সেটা গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে অবশ্যই সংশোধনযোগ্য। কেননা শিক্ষাক্রমের নতুন প্রতিটি বইয়ের শুরুতে ‘প্রসঙ্গ কথা’য় লেখা রয়েছে পরীক্ষামূলক এই সংস্করণের কোনো ভুল বা অসংগতি কারও চোখে পড়লে এবং এর মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কোনো পরামর্শ থাকলে তা জানানোর জন্য সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ রইল।

আশা করি, নতুন শিক্ষাক্রমের ভুলত্রুটি নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি কর্তৃপক্ষ থেকে সংশোধনী আসবে। নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় জীবন-জীবিকার যেমন সংকট থাকবে না তেমনি অভিযোজনের মাধ্যমে টেকসই ও নিরাপদ পৃথিবী গড়া সম্ভব হবে। 

লেখক : শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত