যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ার ৬৯টি জাহাজ ভিড়তে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে দেশটি। রাজধানী মস্কোর স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার দুপুরে রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে রোদেনকো তার দপ্তরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসানকে তলব করে উভয় দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রভাবে জাহাজ ভিড়তে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে রাশিয়ার এমন ধারণাকে নাকচ করে দিয়ে বলা হয়েছে, কোনো চাপে প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ।
এদিকে রাষ্ট্রদূতকে তলবের বিষয়টি বিশ্লেষণ শেষে আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ইতার তাস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়। রুশ জাহাজকে বাংলাদেশের বন্দরে ভিড়তে না দেওয়ার বিষয়ে ঢাকার রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চাওয়া হয়। বলা হয়, রাশিয়ার জাহাজের বিষয়ে বাংলাদেশের নেওয়া পদক্ষেপ ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। এ সময় রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেশটির উপমন্ত্রী আন্দ্রে রোদেনকো ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসানের মধ্যে প্রায় ৩০ মিনিটের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিষয়টি বারবার তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের চাপের বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, চাপ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার স্বকীয়তা বজায় রেখে চলছে। কোনো চাপে প্রভাবিত হবে না বাংলাদেশ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা রুশ জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশ না করতে দেওয়ার বিষয়টি যে দেশটিকে ভাবিয়ে তুলছে, সেটিও উল্লেখ করেন রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস গত বছরের ২০ ডিসেম্বর এক কূটনৈতিক পত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আছে জাহাজ ‘স্পার্টা-৩’। রঙ ও নাম বদল করে জাহাজটির নাম উরসা মেজর দেওয়া হয়। জাহাজটির আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সনদ নম্বর : ৯৫৩৮৮৯২। তাই জাহাজটিতে পণ্য ওঠানো-নামানো, জ্বালানি সরবরাহ, নাবিকদের যেকোনো ধরনের সহযোগিতায় যুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা বড় আর্থিক দণ্ডের মুখে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরে বাংলাদেশ জাহাজটিকে বন্দরে ভিড়তে নিষেধ করে।
বাংলাদেশ এখন নিজ দেশের বিশেষ শৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ব্যস্ত। এই মুহূর্তে মার্কিন ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কোনো জাহাজ নিজ জলসীমায় প্রবেশ করতে দিয়ে নতুন করে ঝামেলায় জড়াবে না ঢাকা। তাই পরিস্থিতি উত্তরণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন এবং গ্রহণযোগ্য সব ধরনের প্রদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার।
বাংলাদেশের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার জাতীয় স্বার্থরক্ষা করা। নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এমন জাহাজ প্রবেশে অনুমতি দেওয়া হলে অথবা যে দেশই তাদের জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি দেবে, সেই দেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। বিষয়টি যেমন আইনগত, তেমনি যুক্তিযুক্ত। চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দুনিয়াজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নিজ বলয়ের শক্তি প্রদর্শন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে অন্য দেশগুলোর; বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
রুশ কৌশল এবং জাহাজের নাম পরিবর্তন ও নিবন্ধন নম্বর একই থাকার বিষয়টি মিলিয়ে হতবাক হয়েছিলেন সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। সে সময় নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজটিকে ভিড়তে দিতে বাংলাদেশের ওপর চাপও সৃষ্টি করেছিল রাশিয়া। এ নিয়ে সৃষ্ট ব্রিবতকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। ঢাকায় রাশিয়ার দূতাবাস কড়া ভাষায় কূটনৈতিক পত্র দেওয়ার পাশাপাশি সব রকমের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার মান্টিটস্কি।
জাহাজটি বাংলাদেশ ভিড়তে না দিলে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া বন্দরে পণ্য খালাসের কথা ছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী এ নিয়ে বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে আমাদের অবস্থান আগেও যা ছিল, এখনো তাই। ভারতের সেই নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। রুশ জাহাজটি যদি ভারতের কোনো বন্দরে ভিড়ে থাকে বা ভিড়তে আসে, তাহলে তাই।’ তবে অবশেষে সেখানেও পণ্য খালাসের অনুমতি না পাওয়ায় গত ১৬ জানুয়ারি চীনের পথ ধরতে হয় জাহাজটিকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, রাশিয়ার পক্ষ থেকে কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে অন্য জাহাজে করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালামাল পাঠানোর বিষয়টি জানানো হয়েছে। কবে নাগাদ এই মালামাল নিয়ে রাশিয়া থেকে অন্য জাহাজ আবার যাত্রা শুরু করবে এবং ঢাকায় এসে পৌঁছাতে পারে সে বিষয়ে কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম এবং এই ঘটনায় বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সম্পর্কে প্রভাব পড়বে কি না এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন কর্মকর্তারা। এ নিয়ে কথা বলতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও বিব্রত।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু ভারত হয়ে বাংলাদেশ সফর করেছেন। তার এ সফরকে ঘিরে ঢাকায় বেশ জোরালো গুঞ্জন রয়েছে যে, তিনি ভারতকে জাহাজটির পণ্য খালাসের অনুমতিতে বাদ সেধেছেন বলেই শেষ মুহূর্তে ভারত তাদের ভারসাম্যের কূটনীতি থেকে সরে গিয়ে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়েছে। ঢাকায় ডোনাল্ড লু’র সঙ্গে আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে জাহাজটির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উরসা মেজরের ওপর থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কথা ভারতকেও তিনি অবগত করেছেন বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্র।
তলবের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেবে বাংলাদেশ : রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসানকে তলবের বিষয়ে গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তলবের বিষয়ে আমরা আমাদের রাষ্ট্রদূতের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছি। সেখানে কী আলোচনা হয়েছে তা বিশ্লেষণ করে দেখব। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মস্কোয় আমাদের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে রাশিয়ার যে বৈঠক হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি। সেখানে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হয়েছে।’
