দ্বিতীয় বছরে গড়াল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। গতকাল শুক্রবার যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকীতে সবাইকে পরাজিত করে জয়ের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার পশ্চিমা মিত্ররাও রাশিয়ার ওপর নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পাশাপাশি ইউক্রেনকে আরও সামরিক ও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার মিত্র চীন যত দ্রুত সম্ভব রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলমান সংকটের রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে ১২ দফা প্রস্তাবের একটি নথি প্রকাশ করেছে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা চীনের বিরুদ্ধে রাশিয়াকে অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ করে যাচ্ছে অব্যাহতভাবে। গত বৃহস্পতিবারও দেশটি ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আনা নিন্দা প্রস্তাবনায় ভোটদানে বিরত থেকেছে।
জয়ের জন্য আমরা সবকিছু করব : বিবিসি বলছে, গতকাল যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকীতে জেলেনস্কি এক ভিডিওতে দেশের জনগণের কাছে সবাইকে পরাজিত করার বার্তা দিয়েছেন। এতে তিনি বলেছেন, আমরা শক্তিশালী। আমরা যেকোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত। আমরা প্রত্যেককে পরাজিত করব।
এক বছর আগে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর স্মরণে জেলেনস্কি বলেন, এভাবেই ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি শুরু হয়েছিল। সেটি ছিল আমাদের জীবনের দীর্ঘতম দিন। আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন দিন। আমরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি এবং তারপর থেকে ঘুমাইনি।
গতকাল জেলেনস্কির এবারের ভাষণটি ছিল ১৫ মিনিটের। রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ইউক্রেনের জনগণের প্রশংসা করেছেন তিনি। বলেছেন, আমরা বিশাল এক আর্মিতে পরিণত হয়েছি। আমরা একটি টিম হয়েছি। এই টিমে প্রত্যেকেরই অবদান আছে।
২০২২ সালকে সহনশীলতা, সাহস, বেদনা এবং ঐক্যের বছর বলে বর্ণনা করে জেলেনস্কি বলেন, এর প্রধান উপসংহার হলো আমরা বেঁচে গেছি। আমরা পরাজিত হইনি। এ বছর জয়ের জন্য আমরা সবকিছু করব।
যুদ্ধবিরতিসহ ১২ প্রস্তাব চীনের : যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে আগ্রহী চীন। দেশটির ভাষ্য, আলোচনা ও মধ্যস্থতাই এ সংকট সমাধানের দৃশ্যত একমাত্র উপায়। গতকাল চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ১২ দফা প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা ক্রমেই হ্রাস করার কথা বিস্তৃতভাবে বলা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, চীনা মন্ত্রণালয়ের এ প্রস্তাব মূলত রাশিয়া গত বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি তাদের ভাষায় শুরু করা ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ পর পেইচিং যেভাবে কথা বলেছে, তারই ধারাবাহিকতা। চীন এখন পর্যন্ত তার মিত্র রাশিয়াকে ইউক্রেনে আক্রমণের জন্য নিন্দা জানায়নি কিংবা প্রতিবেশী দেশে মস্কোর আক্রমণকে ‘আগ্রাসন’ অ্যাখ্যাও দেয়নি। তারা রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞারও কড়া সমালোচনা করে আসছে।
গতকাল প্রকাশিত চীনা মন্ত্রণালয়ের ওই নথিতে বলা হয়েছে, সংঘাত ও যুদ্ধে কারও লাভ নেই। সব পক্ষেরই যুক্তিসংগত ও সংযত আচরণ করা উচিত, উচিত উত্তেজনা বৃদ্ধি ও আগুনে ঘি ঢালা বন্ধ করা এবং এ সংকট যেন আরও বাজে অবস্থায় না যায় কিংবা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় সেদিকে নজর দেওয়া।
তবে চীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত জর্জ টলেডো বলেছেন, চীনের নথিটি মোটেও শান্তি প্রস্তাবের নয়। তিনি বলেন, ইইউ নথিটি ভালোভাবে পড়ছে, তবে সেখানে যে আগ্রাসনকারীর নাম বলা হয়নি তা নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। পেইচিংয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ দেওয়া ব্রিফিংয়ে টলেডো বলেছেন, জাতিসংঘ সনদের মূল্যবোধের সুরক্ষা ও সেটি ঊর্ধ্বে তুল ধরা চীনের বিশেষ দায়িত্ব।
অবশ্য একই ব্রিফিংয়ে ইউক্রেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ঝানা লেশচিনস্কি চীনের নথিটিকে ‘শুভলক্ষণ’ অ্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেন পেইচিংয়ের কাছ থেকে আরও বেশি রাজনৈতিক সমর্থন চাইছে। চীন রাশিয়াকে যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং মস্কোর সেনাদের ইউক্রেন ছাড়ার আহ্বান জানাবে বলেও কিয়েভ আশা করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চীন এ সংঘাতে তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবেন বলে মনে করেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে লেশচিনস্কি বলেন, তারা যদি নিরপেক্ষ হয়, তাহলে তারা রাশিয়া, ইউক্রেন উভয়পক্ষের সঙ্গেই কথা বলত। এখন আমরা দেখছি, চীন মূলত রাশিয়ার সঙ্গেই কথা বলছে, ইউক্রেনের সঙ্গে নয়।
যদিও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেছেন, শান্তি প্রস্তাব নিয়ে পেইচিংয়ের দেওয়া নথি নিয়ে কিছু কূটনৈতিকের সমালোচনার কোনো ভিত্তিই নেই। আর সেসব সমালোচনার লক্ষ্য হচ্ছে চীনের গায়ে কালি লাগানো। আমরা উত্তেজনা বৃদ্ধি, যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো দেশেরই জৈব বা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরোধী।
নিন্দা প্রস্তাবে ভোট দেয়নি চীন-ভারত : ইউক্রেনে এক বছর আগে রাশিয়ার শুরু করা আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আনা নিন্দা প্রস্তাবনায় আবারও ভোটদানে বিরত থেকেছে ভারত, চীন, ইরান ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ৩২টি দেশ। ওই তালিকায় আছে বাংলাদেশও।
বিবিসি জানায়, প্রস্তাবনাটির পক্ষে পড়েছে ১৪১ ভোট এবং বিপক্ষে পড়েছে ৭ ভোট। রাশিয়া, বেলারুশ, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, মালি, ইরিত্রিয়া ও নিকারাগুয়া বিপক্ষে ভোট দেয়।
ভারত আগ্রাসনের বিষয়ে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, শান্তিপূর্ণ সংলাপই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র পথ। ভারতের ভাষ্য, কোনো যুদ্ধই কাম্য নয় বললেও এ যুদ্ধে তারা কোনো পক্ষ অবলম্বন করতে ইচ্ছুক নয়।
নিউইয়র্কে দুদিনব্যাপী জাতিসংঘের বিশেষ বৈঠক চলার পর ভোটাভুটি হয়েছে সাধারণ সভায়। বহু আলোচনার পর জার্মানি প্রস্তাবনা পেশ করে। সেখানে বলা হয়, জাতিসংঘের চার্টার মেনে ইউক্রেনে অবিলম্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখ-তাকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার অধিকৃত অঞ্চলের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয় প্রস্তাবনায়। তাছাড়া ইউক্রেন থেকে অবিলম্বে নিঃশর্তে রুশ সেনা প্রত্যাহার এবং বৈরিতা বন্ধেরও দাবি জানানো হয়েছে জাতিসংঘ প্রস্তাবনায়।
