বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অপচয় আর নয়

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:৩১ পিএম

অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেশ এখন সংকটকাল অতিক্রম করছে। উত্তুঙ্গ মুদ্রাস্ফীতি, ওএমএসের ট্রাকের পেছনে মানুষের দীর্ঘ লাইন, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, অস্থির মুদ্রা বিনিময় হার, সংরক্ষণবাদী আমদানি সত্ত্বেও চলতি হিসাবে বড়সড় ঘাটতি ও রিজার্ভের ক্রমহ্রাসমান প্রবণতা প্রভৃতিতে এই সংকটের অবয়ব দৃশ্যমান। শাসক দলের নেতাদের দাবি, কভিড-১৯ এর ধকল সামলে নিয়ে অর্থনীতি যখন পুনরায় দুলকি তালে চলতে শুরু করে তখন কাবাব মে হাড্ডি হয়ে আবির্ভূত হয় ইউক্রেন যুদ্ধ। অর্থাৎ সব দোষের নন্দঘোষ হলো ইউরোপীয় অঞ্চলের এই যুদ্ধ। অবশ্য নিন্দুকেরা বলেন, এই সংকটের জন্য বিরূপ বহিঃস্থ কারণের চেয়ে অদূরদর্শী দেশি পরিকল্পনা এবং অব্যবস্থাপনাও কম দায়ী নয়। সে যাই হোক, সরকার অবশ্য সংকট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতগতিতে বেশ কিছু প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি অনুসরণ।

সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতির অনুসরণে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প পরিহার, গাড়ি কেনা ও জ্বালানি খরচ কমানো, কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ওপর একাধিকবার যতি টানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদেশে ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’-এর যে সংস্কৃতি চালু রয়েছে, সে পটভূমিতে স্বাভাবিক সময়েও এই জাতীয় নির্দেশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বোধ করি কেউ প্রশ্ন তুলবে না। তবে বর্তমানে মাথা মোটা আমলাতন্ত্রে তাদের স্বার্থবিরোধী এই রকম নির্দেশ কতটুকু কার্যকর করা যাবে, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। অপচয় আর অপব্যয়ের সংস্কৃতি শুধু সরকারি খাতে যে সীমাবদ্ধ, তা বলা যাবে না। সরকারি ও বেসরকারি যে পর্যায়েই অপব্যয় ও অপচয় হোক না কেন, তা জাতীয় সম্পদকে কমিয়ে ফেলে এবং নাগরিকদের কর্মদক্ষ হতে নিরুৎসাহিত করে। কাজেই সরকারি কাঠামোর বাইরেও বৃহত্তর পর্যায়ে যাতে সম্পদের অপব্যয় ও অপচয় না হয়, তার জন্য প্রয়োজন জরুরি নির্দেশনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ। 

কয়েক দিন আগে এক বন্ধুর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি ছিল লোকে লোকারণ্য বলতে যা বোঝায় তাই; দ্বিতীয় ব্যাচেও খাবার টেবিলে জায়গা পেতে কষ্ট হচ্ছিল। এই জাতীয় অনুষ্ঠানে সাধারণত যা হয়, তাই ঘটল; এক বন্ধুর শখের মহামূল্যবান একটি সেলফোন সেট লাপাত্তা হয়ে গেল। দুই বন্ধু তখন ছুটলেন সিসিটিভি নিয়ন্ত্রিত কক্ষের কন্ট্রোল রুমে; চোরের টিকিটা দেখা যায় কি না, তা পরীক্ষা করতে। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে তারা বীক্ষণ যন্ত্রের সংরক্ষিত ডিজিটাল পর্দায় তস্কর ও তার হাত-সাফাই কাজের সন্ধান করতে সমর্থ হলেন। কিন্তু ঐ যন্ত্রটি তো কেবল ছবি তুলতে ও তা কিছুকালের জন্য সংরক্ষণে সক্ষম; আটকের ক্ষমতা সে এখনো প্রাপ্ত হয়নি। চোরের ছবি দেখেও তাকে পাকড়াও করতে না পেরে আমাদের সবার মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু তারপর মনটা আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল খাবার টেবিলে মানুষের আচরণ দেখে। টেবিলে খাবার বিস্তর, খাদকেরা পাতে নিচ্ছে এন্তার, কিন্তু অধিকাংশই চালাচ্ছে স্বেচ্ছাচার; খোদাই খাসির মতো একটু করে চেখে পছন্দ না হলে সামনে রাখা হাড়ের পাত্রে মাংস নিক্ষেপ করছে। আবার পছন্দ মতো গোস্ত পেতে বেয়ারাকে নতুন গামলা ভরে ভোজ্য আনার আদেশ দিচ্ছে। এ যেন মাংস খাওয়া ও ছোড়ার এক হোলিখেলা; একেক জনের উচ্ছিষ্টে অন্তত দুজন বুভুক্ষুর সহজেই উদর পূর্তি হতে পারে। এর আগেও বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে একই খামখেয়ালিপনার পুনরাবৃত্তি লক্ষ করেছি। এই শ্রেণির লোকজনের খাওয়া-দাওয়ার বাহার দেখে বুঝতে বাকি থাকে না, এই সর্বব্যাপী অপুষ্টির দেশে স্থূলতায় ভোগা আদম সন্তানদের মধ্যে হার ৪০ শতাংশের কাছাকাছি কেন? এই বিলাসিতা দেশের এই পরিস্থিতিতে একেবারেই বেমানান। 

কভিড-১৯ ও তৎপরবর্তী ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বময় যে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়, সে পটভূমিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং এক ইঞ্চি ভূমিও পতিত না রাখা। তার এই নীতি পর্যাপ্ত ফল দেয়; দেশ খাদ্য ঘাটতির কবল থেকে রক্ষা পায়। খাদ্য নিরাপত্তায় উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদিত খাদ্যের অপচয় রোধ করা; এতে তেমন খরচ নেই বললেই চলে। এই কারণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের অপচয় রোধ করা একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। আমাদের ধর্মেও অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন গণজমায়েতে খাদ্যপণ্যের অপচয় রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

বিয়ের অনুষ্ঠানে খাদ্য অপচয় রোধকল্পে সরকার The Guest Control Order, 1984 জারি করে। প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল অনুষ্ঠানে অতিথির সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিয়ে খাদ্যের ব্যয় ও অপচয় কমিয়ে আনা। কিন্তু আদেশ জারির মাধ্যমে অতিথি নিয়ন্ত্রণ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তখন সরকার ‘If you can not beat them, join them’ তত্ত্বের ভিত্তিতে অনুমোদিত সংখ্যার অতিরিক্ত অতিথিদের জন্য মাথাপিছু যৎসামান্য ফি আদায়ের ব্যবস্থা করে ফ্লাড গেইট খুলে দেয়। প্রথম প্রথম অনেকেই সরকারি আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনার্থে অতিরিক্ত ১০০ জনের ফি জমা দিয়ে ১০০০ জন অতিরিক্ত অতিথির ভূরিভোজন সম্পন্ন করিয়ে দিত। কিন্তু এখন এই জাতীয় আদেশের কোনো অস্তিত্ব আছে বলে কেউ জানে না। ফলে সরকারের আয়ও হচ্ছে না, আবার খাদ্যের অপচয় ও অপব্যবহার বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এটা বন্ধ হওয়া দরকার, আর তা করা যেতে পারে উল্লিখিত আদেশ সংশোধনের মাধ্যমে। 

বিয়েসহ গণজমায়েতগুলোতে খাদ্যের অপচয় রোধকল্পে খোলা গামলা ও কারি ডিশের পরিবর্তে প্যাকেটে খাদ্য পরিবেশন করা যেতে পারে এবং তাতে অপচয়ের মাত্রা ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসতে পারে। মহানগরী ও শহরাঞ্চলে বিভিন্ন দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, মজলিশ, মৃত্যুবার্ষিকী, চল্লিশা প্রভৃতি আয়োজনে প্যাকেটে তবারক সরবরাহ করা হয়ে আসছে। এসব অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা থেকে এটা লক্ষ করা গেছে যে, এ ব্যবস্থায় অপচয় ন্যূনতম পর্যায়ে থাকে। বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতেও একই ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। প্যাকেটের বিষয়বস্তু ও পরিমাপ এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে অপচয়ের সুযোগ না থাকে। আর আদেশ সংশোধনের মাধ্যমে এটা করা হলে সাশ্রয়ী হওয়ায় অনুষ্ঠানদাতারাও খুশি হবেন। আর খাদকদেরও বিনা পয়সায় স্থূলতার চিকিৎসা শুরু হয়ে যাবে। তাদের কেউ কেউ অবশ্য প্রথম দিকে কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করতে পারেন। তবে সামাজিক চাপ এখন খাদকদের বিরুদ্ধে। কাজেই তাদের পালে বেশি হাওয়া লাগার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

এরকম আরও অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে অপচয়ের মাধ্যমে অনেক উঠতি বিগ শট তাদের সম্পদের প্রদর্শনী করতে ভালোবাসেন। শহরের অভিজাত এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিকায় বড় অট্টালিকা নির্মাণ বা ফ্ল্যাট গড়ন এ রকম উন্নাসিক কাজের একটা দৃষ্টান্ত। ধানমন্ডির যে বাসায় আমি থাকি, তার পাশে নতুন একটি ফ্ল্যাট বাড়ি নির্মিত হচ্ছে। এ বাড়ির প্রতিটা ফ্ল্যাটের আয়তন ৪,৩০০ বর্গফুট। টাকা থাকলেই ভূমি-বুভুক্ষু এই দেশে কেন চার পরিবারের স্থলে এক পরিবারকে এত জায়গা দেওয়া হবে, তা আমার বোধগম্য নয়। এটাও অপচয়ের আরেক রূপ। চীন ও ভিয়েতনামে দেখেছি জন-ঘনত্ব আমাদের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু তাদের বাড়ির সাইজ অনেক ছোট। কিন্তু গড়পড়তা তারা আমাদের চেয়েও ধনী। ভূমি সৃষ্টিকর্তার দেওয়া এক সসীম সম্পদ। বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার রক্ষায় এর ওপর সমমাত্রিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

দেশে এক দিকে মুক্তবাজার অর্থনীতির চর্চা চলছে। আবার উল্টো দিকে অনেক কিছু চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারণ না হয়ে সরকার কর্র্তৃক নির্ধারিত হয়ে আসছে। জ্বালানির মূল্য, সারের মূল্য, ডলারের মূল্য এই মিশ্র ব্যবস্থার কয়েকটি উদাহরণ। বাণিজ্যমন্ত্রীও সম্প্রতি পাঁচ ছয়টি পণ্যের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন বিয়েসহ যে সব গণজমায়েতে খাদ্য সরবরাহ করা হয়, সেখানে যদি প্যাকেটে তা সরবরাহ করা এবং পরিবারপ্রতি বাসস্থানের জন্য সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষের এ দুইটি মৌলিক চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্র প্রসারিত হবে। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা ও কাজ শুরু করবেন।

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত