থমথমে পঞ্চগড় সতর্ক অবস্থানে পুলিশ-বিজিবি

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৩, ০৬:০৮ এএম

আহমদিয়া জামাত (কাদিয়ানি) আয়োজিত সালানা জলসা বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের পর পঞ্চগড় জেলা শহরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গত শুক্রবারের ওই সংঘর্ষের পর গতকাল শনিবার সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও বিজিবির বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিল। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করে আজানা আতঙ্ক। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরজুড়ে স্ট্রাইকিং ফোর্সের টহল দেখা গেছে।

শুক্রবারের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও আহমদিয়াদের বাড়িঘরে হামলায় দুই যুবকের মৃত্যু হয়। পুলিশ-বিজিবির সদস্য, সাংবাদিকসহ আহত হন অর্ধশতাধিক মানুষ। শুক্রবার রাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সালানা জলসা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর গতকাল সকাল থেকে প্রশাসনের সহায়তায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জলসায় আসা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এদিকে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের সময় তা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বিকেলে সালানা জলসা মাঠে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন আহমদিয়া মুসলিম জামাতের বহিঃসম্পর্ক, গণসংযোগ ও প্রেস বিভাগের প্রধান আহমদ তবশির চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘বাদ জুমা জলসা শুরু হলে আক্রমণ শুরু হয়। প্রথম তিন ঘণ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সহায়তা পাইনি, যা আমাদের ব্যথিত ও বিস্মিত করেছে। হামলাকারীরা আমাদের এক তরুণকে হত্যা করেছে। এ ছাড়া ৭০ জনকে আহত করেছে। দুষ্কৃতকারীরা ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে চড়াও হয়। ইটপাটকেল ছোড়ে। বারবার পুলিশ ও প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের আশ্বস্ত করে বলা হয়, পুলিশ-বিজিবি আছে সমস্যা হবে না। পুলিশ-বিজিবি ছিল, কিন্তু কোনো কারণে তারা নিষ্ক্রিয় ছিল জানি না।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এত বেশি হতো না দাবি করে আহমদ তবশির চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমে তারা (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) ২০/২০ জন ছিল। পুলিশ-বিজিবি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে এতগুলো বাড়িঘর পুড়ত না, লুটপাট হতো না। দুটি গ্রামে দেড়শর বেশি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করেছে। পঞ্চগড় বাজারে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কয়েকটি দোকান ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। পুরো আহমদিয়া সম্প্রদায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বাদ এশা প্রশাসনের অনুরোধে আহমদিয়া সম্প্রদায় সালানা জলসা স্থগিত করার পরও অনেক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়েছে।’

শুক্রবারের হামলার ঘটনায় আহমদিয়া জামাতের পক্ষে ওসমান আলী নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করে পঞ্চগড় সদর থানায় লিখিত অভিযোগ (এজাহার) জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে গতকাল বিকেল পর্যন্ত পুলিশ তা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেনি। অবশ্য হামলা-সংঘর্ষের ঘটনায় ১২ জনকে আটকের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে পঞ্চগড় সদর থানার ওসি আবদুল লতিফ মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা নথিভুক্তের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। ১২ জনকে আটক করা হয়েছে।’

আরিফকে দাফন, জাহিদের লাশ পাঠানো হলো নাটোরে : গত শুক্রবার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার সময় মাথায় গুলি লেগে নিহত মো. আরিফুজ্জামান আরিফের (২৭) জানাজা গতকাল বিকেল ৩টায় পঞ্চগড় শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে শহরের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। অন্যদিকে আহমদনগরে কুপিয়ে হত্যা করা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের জাহিদ হাসানের (২২) মরদেহ বাদ জোহর জানাজা শেষে গ্রামের বাড়ি নাটোরের বনপাড়া পৌর এলাকার চিরইল গ্রামে পাঠানো হয়। এর আগে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। নিহত জাহিদ সালানা জলসার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। তাকে ধরে টেনেহিঁচড়ে করতোয়া নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সেখানেই তার লাশ পড়েছিল। রাতে উদ্ধার করে জলসাস্থলে আনা হয়।

পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার এস এম সিরাজুল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুক্রবারের ঘটনায় দুজন মারা গেছেন, তবে কীভাবে মারা গেছেন তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। শহর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে।’

গত শুক্রবারের সহিংসতার ঘটনা তদন্তে গতকাল পঞ্চগড়ে আসেন পুলিশের রংপুর রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক রশিদুল ইসলাম। এ সময় পঞ্চগড় থানায় সাংবাদিকরা সহিংসতার বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘জলসা স্থগিতের পর পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক।’

পঞ্চগড়ের ঘটনা সরকারের অপকৌশল দাবি বিএনপির : দেশ ও দেশের বাইরের সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিভ্রান্ত করতে কৃত্রিমভাবে ধর্মীয় বিরোধের ইস্যু উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এমন অভিযোগ করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সালানা জলসাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে হতাহতের নিন্দা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব এ ধরনের সংঘাতের জন্য ক্ষমতাসীন সরকারের উদাসীনতা ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে বলে দাবি করেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকে সম্প্রীতি বহুকাল থেকেই বিরাজমান। আজ জনগণ দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনের দুর্ভোগের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং ভোটাধিকার তথা গণতন্ত্রের জন্য মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। এ অবস্থায় জনগণের দৃষ্টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্যই শাসকগোষ্ঠীর মদদে এ ধরনের ঘটনা সংঘটিত করা হচ্ছে। এটি সরকারের দীর্ঘদিনের অপরাজনীতির কৌশলমাত্র।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত