সংস্কৃতি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৩, ১২:৩৮ এএম

মানুষ নিয়মিত জীবনযাপন করে বেঁচে থাকার জন্য। পৃথিবীর সমগ্র সম্পদের পঁচানব্বই ভাগ মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষের হাতে বন্দি বলে আমরা জানি আর বাকি পঁচানব্বই শতাংশ মানুষ সাধারণভাবে বা দরিদ্রতার মধ্যে বা অতি-দরিদ্রভাবে জীবনযাপন করছে। তাদের অনেকে হয়তো বোঝেই না বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যটা কী? পৃথিবীর বিশাল সংখ্যক মানুষ শুধুমাত্র দুবেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করে, মাথার ওপর একটা ছাদের জন্য সংগ্রাম করে, জীবন যে অর্থপূর্ণ, আনন্দময় হতে পারে সেটা তাদের বোধের মধ্যেই নেই। তারপরও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, আর্থিকভাবে মোটামুটি সচ্ছল, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা অসচ্ছল মানুষ সবসময় চেষ্টা করেছে জীবনকে কোনো না কোনো ভাবে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য। সেজন্যই এসেছে প্রতিদিনের নিয়মিত সংগ্রামের সঙ্গে অন্য কিছু করে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার প্রচেষ্টা। এই অর্থপূর্ণতা বা আনন্দদানের জন্যই শিল্প ও সংস্কৃতি, সাহিত্য, খেলাধুলা, ভ্রমণ, ভিন্ন রকমের খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি বহু কিছু মানুষকে আকর্ষণ করেছে। খাদ্যসংস্থান,

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসুস্থতা এগুলোর সঙ্গে সংগ্রামের জন্য সংঘবদ্ধ জীবনযাপন এবং শিক্ষা যে জরুরি ছিল সেটা মানুষ অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল। সেজন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চলেছে, সংঘবদ্ধ হওয়ার, শিক্ষিত হওয়ার। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে। এবং সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করবার জন্য রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা সুস্থ সংস্কৃতি ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জানতে পেরেছি। মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন খেলাধুলা দেখেছি, খেলাধুলার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। তবে মিডিয়া এক সময় ছিল এলিট ক্লাসের হাতে। মোটামুটিভাবে বলা যায় যে এই এলিট ক্লাসের উদ্দেশ্য ছিল মিডিয়ার মাধ্যমে মানসম্পন্ন সংস্কৃতির প্রকাশ এবং বিকাশ যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রুচির বিকাশ ঘটে। আমার ছোটবেলার কথা মনে করলেও দেখি যে আমাদের আনন্দ বা বিনোদন ছিল বাইরে খেলাধুলা করা, গান শোনা এবং বিভিন্ন ধরনের বই পড়া। এই বই পড়াতে আমাদের চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটত তুলনামূলকভাবে বেশি, আমাদের স্বাস্থ্য কিছুটা শক্ত ছিল এখনকার ছেলেমেয়েদের তুলনায় যেহেতু আমরা মাঠে-ঘাটে দৌড়াদৌড়ি করে খেলতাম। কিন্তু করোনা সংকট এসে মানুষকে গৃহবন্দি করে ফেলল। মানুষ আর্থিক সমস্যা সমাধানে ও আনন্দ সংগ্রহের নতুন রাস্তা খুঁজল। প্রযুক্তির বিপুল বিকাশ তাকে সমাধানের রাস্তাও দেখিয়ে দিল। রেডিও টেলিভিশন প্রাইভেটাইজেশনের ফলে সেগুলোতে যেমন অনেক নতুন কনসেপ্ট, অনেক উন্নয়ন ঘটল তেমনি স্থূল ব্যবসায়িক স্বার্থে অনেক কিছুর মান আগের থেকে কমেও এসেছিল। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ব্যবসায়িক কারণে ক্রমান্বয়ে জনগণের হাতে ছেড়ে দিল রুচি নির্মাণের কাজ। অর্থাৎ রুচি নির্মাণের জন্য তারা নিজের ভূমিকা থেকে সরে এসে জনগণের চাহিদার কাছে আত্মসমর্পণ করল। এভারেজ মানুষের চিরকালই সস্তা জিনিসে আগ্রহ বেশি। তার ফলে শিল্প-সংস্কৃতির অবনমন শুরু হলো। এখন যে কেউ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গান, কবিতা, টিকটক বা ভিডিও ক্লিপ তৈরি করছে যার অধিকাংশই অশ্লীল, মানহীন। এগুলোই সমানে আপলোড হচ্ছে যার ওপর কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এইসব সস্তা জিনিসে অধিকাংশ মানুষের আগ্রহ প্রবল এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এই বিশাল সংখ্যক সাধারণ মানুষকেই টার্গেট করেছে। তারা শুধুমাত্র দেখছে যে কতটা বেশি ভিউ হয়। কারণ যত বেশি ভিউ তত বেশি ব্যবসা। মাননিয়ন্ত্রণ নেই, রুচি তৈরির প্রয়াস নেই ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সূক্ষ্ম রুচি সৃষ্টির ব্যাপারটা বা বিকাশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এই জায়গাটায় শুধু বাংলাদেশ নয় আমার মনে হয় সারা পৃথিবীর শিক্ষিত সমাজ এবং রাষ্ট্রনেতাদের তাদের দেশ এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্কৃতিকে সুস্থভাবে রক্ষা করবার জন্য শুধু সচেতনতা নয় নতুন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা মানুষের অধিকারের কথা বলি, গণতন্ত্রের কথা বলি সব ঠিক আছে কিন্তু মিডিয়ার ওপর সবার অধিকার দিলে যে সবকিছু একদম সস্তা হয়ে একটা বিপর্যয় ডেকে আনবে সেটা আমাদের বুঝতে হবে। কিছু মানুষ হয়তো মানসিক শান্তি বা তৃপ্তি পাবেন এই ভেবে যে আমাদের পূর্ণ অধিকার আছে, আমরা নিজেদের ইচ্ছামতো যা খুশি প্রকাশ করতে পারি কিন্তু এই ইচ্ছামতো প্রকাশ যে আমাদের ভিতটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে সেটা আমাদের বুঝতে হবে। আমার মনে হয় বুঝতে আমরা বেশ দেরি করে ফেলেছি। আরও দেরি হতে থাকলে সভ্যতার সংজ্ঞাই হয়তো আমাদের পাল্টে ফেলতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত