সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (সুপ্রিম কোর্ট বার) নির্বাচনে ভোটের দুদিন আগে গত সোমবার রাতে পদত্যাগ করেছেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মুনসুরুল হক চৌধুরী। তার পদত্যাগের খবরে মুহূর্তেই নির্বাচনের আমেজ অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। বেড়েছে নির্বাচন নিয়ে নানা আশঙ্কা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষই অনেকটা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। যেমনটি হয়েছিল গত বছর নির্বাচনে। পূর্বঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে দুদিনের ভোটগ্রহণের কথা রয়েছে।
নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মুনসুরুল হক চৌধুরী তার পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করেছেন। গতকাল দিনভর সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে নানা আলোচনা হয়। সুপ্রিম কোর্টে তার চেম্বারে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি তার জন্য নির্বাচনের আগে-পরে বিব্রতকর হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীরা।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুই পক্ষই নির্বাচন পরিচালনা করতে পাল্টাপাল্টি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্যে সমিতির বর্তমান কমিটিতে থাকা সভাপতি, সম্পাদকসহ সরকারপন্থিরা অ্যাডভোকেট মো. মনিরুজ্জামানকে আহ্বায়ক ঘোষণা করেছে এবং বিএনপিপন্থিরা সমিতির সাবেক সহসভাপতি অ্যাডভোকেট এ এস এম মোক্তার কবিরকে আহ্বায়ক করে নির্বাচন পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে। সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের দোতলায় মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে দুই পক্ষ সেøাগান পাল্টা সেøাগান দেয়।
এদিকে রাত ৯টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান মনির অভিযোগ করেন, নীল প্যানেলের কিছু আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের তৃতীয়তলায় একটি কক্ষে থাকা ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে নীল প্যানেলের সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাড়া পাওয়া যায়নি। আর সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজলের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বিগত ২০২২-২৩ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পর সরকারপন্থিদের ভোট পুনঃগণনার দাবি ও বিএনপিন্থিদের ফল ঘোষণার দাবির উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করেছিলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ ওয়াই মসিউজ্জামান। এবার ভোটের আগেই অ্যাডভোকেট মুনসুরুল হক চৌধুরীর পদত্যাগে নির্বাচন নিয়ে নানা আশঙ্কা, জটিলতা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।
আইনজীবীদের একাধিক সূত্র জানায়, গতকাল দুপুরে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী দুই পক্ষকে ডেকে সমস্যা সমাধান ও মুনসুরুল হক চৌধুরীকে অনুরোধ করে আহ্বায়ক পদে রাখা যায় কি না এমন চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এ ক্ষেত্রে সাদা প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী মোমতাজ উদ্দিন ফকির সাড়া দেননি।
অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেও দুই পক্ষকে আস্থায় আনতে পারিনি। আমি মোমতাজ উদ্দিন ফকিরকে ফোন করলেও সাড়া দেননি। এখন তারা যদি একমত না হন তাহলে তো কিছুই করার নেই।’ তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি শোভনীয় নয়। একটা বিতর্কিত নির্বাচন হবে। তবে, অপেক্ষায় আছি দেখি কোনো সমাধান হয় কি না।’
এদিকে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বিএনপিপন্থি দুই শতাধিক আইনজীবী। তাদের অভিযোগ, সরকারপন্থি আইনজীবীরা নীলনকশার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। যার ফলে মুনসুরুল হক চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে সরকারপন্থি আইনজীবী ও প্রার্থীরা বলছেন, তাদের অভিযোগ ভিত্তিহীন। আজ নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন হবে।
এ বিষয়ে জানতে সাদা প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী মোমতাজ উদ্দিন ফকিরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিয়েও সাড়া মেলেনি। একই প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী আবদুন নূর দুলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বারের প্যাডে আহ্বায়কের নাম লেখা হয়েছে। তারা যে নাম দিয়েছেন এর কোনো ভিত্তি নেই। আজকে নির্বাচন হবে এবং সুষ্ঠু ভোট হবে।’
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় রাজনীতি ও নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় দুঃখজনকভাবে এটার আছর সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনেও লেগেছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপচেষ্টা চলছে। আমরা একটি সুষ্ঠু স্বাভাবিক পরিবেশে নির্বাচন চাই।’
২০২২-২৩ মেয়াদে (গত বছর) নির্বাচনে সরকারপন্থি আইনজীবীদের ভোট পুনঃগণনার দাবি এবং বিএনপিন্থিদের ফলাফল ঘোষণার দাবি নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা উপকমিটির আহ্বায়ক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ ওয়াই মসিউজ্জামান পদত্যাগ করেন। এরপর নানা ঘটনায় প্রায় দেড় মাস ফল ঘোষণা বন্ধ থাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারপন্থি ও বিএনপিপন্থিদের মধ্যে একাধিকবার হট্টগোল, হাতাহাতি, মারামারি, হাতুড়ি নিয়ে হামলা ও রক্তারক্তির ঘটনা ঘটে।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আহ্বায়কের পদত্যাগে একটি বিতর্কযুক্ত পরিবেশ ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেল। ঘোরতর কোনো সমস্যা বা মতানৈক্য না হলে তিনি পদত্যাগ করার মতো লোক নন। এখন নির্বাচনে যাই ফল হোক এটা একটা পরস্পরবিরোধীর দিকে যাবেই।’ তিনি বলেন, ‘আইনজীবীদের রাজনীতি করতে বাধা নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের নির্বাচন নিয়ে কয়েক বছর ধরে যে পরিস্থিতি তা প্রচণ্ড বিব্রতকর ও হতাশার। এর কারণ আইনজীবীদের অনেকেই এখন নীতিবিহীন ভোটের রাজনীতিতে ব্যস্ত, যার ফলাফল এই।’
এবার সমিতির প্রায় ৯ হাজার আইনজীবী ভোটার ভোট দেবেন। সরকারপন্থিরা সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ (সাদা প্যানেল) নামে এবং বিএনপিপন্থিরা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য পরিষদ (নীল প্যানেল) নামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবারের নির্বাচনে সাদা প্যানেল থেকে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন ফকির এবং সম্পাদক পদে আবদুন নূর দুলাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যদিকে নীল প্যানেল থেকে সভাপতি পদে ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ প্যানেল থেকে সম্পাদক পদে সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল নির্বাচনে লড়ছেন।
