ঘুচাও এ দৈন্য হাহাকার

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৩, ১০:১৬ পিএম

সুশীল বাবু ছিলেন কলেজ শিক্ষক। সদ্য অবসর নিয়েছেন। এক পুত্র ও এক কন্যাসন্তান নিয়ে সুখের সংসার। কদিন ধরে দারুণ চিন্তিত তিনি ও তার পত্নী। প্রতিবেশী কারণ জানতে চাইলে সুশীল বাবুর স্ত্রী জানালেন, তার কন্যা সন্তানসম্ভবা। প্রতিবেশী মহিলা সান্ত¡না দিলেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। আরও কিছু দিন কেটে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আরেক দিন দেখা তাদের মধ্যে। প্রতিবেশী মহিলা জানতে চাইলেন, ‘কী ব্যাপার দিদি, মেয়ের কথা তো কিছুই জানালেন না।’ সুশীল বাবুর স্ত্রী যেন লজ্জাই পেলেন; বললেন, ‘আসলে নাতনি হয়েছে তো, কে কী বলবে, তাই জানাইনি।’ শুনে তাজ্জব বনে যান প্রতিবেশী। বর্তমান সময়ে চারদিকে যখন সভ্যতার বোল ফুটছে, সেই উন্নত আধুনিক সমাজে একজন কলেজ শিক্ষক পতœীর এমন চিন্তাধারা আমাদের কী জানায়?

বেগম রোকেয়ার আর্তনাদ কানে বাজে, ‘আপনারা হয়তো শুনিয়া আশ্চর্য হইবেন যে, আমি ২২ বৎসর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্টজীবের জন্য রোদন করিতেছি। সে জীব নারী। এই জীবগুলোর জন্য কাহারও কখনো প্রাণ কাঁদে নাই। পশুর জন্য চিন্তা করিবারও লোক আছে। তাই যত্রতত্র পশুক্লেশ নিবারণী সমিতি দেখিতে পাই। পথে কুকুরটা মোটরচাপা পড়িলে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পত্রিকাগুলিতে ক্রন্দনের রোল দেখিতে পাই। কিন্তু আমাদের অবরোধ বন্দিনী নারী জাতির জন্য কাঁদিবার একটি লোকও এ ভূ-ভারতে নাই।’

নারীরা কখনোই তাদের অবস্থানের ব্যাপারে সজাগ হয়নি কিংবা তাদের অবস্থানের ব্যাপারে সচেতন হয়নি কিংবা তাদের পুরুষ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিপ্লবী হয়ে উঠতে পারেনি। বাস্তবে নারী মুক্তির সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। নারী-পুরুষের এই প্রান্তিক অবস্থান বরাবরই নারীকে নির্ভরশীল রেখেছে। এমনকি আজও নারী নানাভাবে মানস প্রতিবন্ধী। যদিও হালে নারীর সামাজিক অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেছে। তবুও এখনো নারীর সামাজিক অধিকার পুরুষের সমকক্ষ নয়। কখনো কোথাও নারীর সামাজিক অধিকার স্বীকৃত হলে পুরনো প্রথা এসে তা বাস্তবায়নে বাদ সাধে।

আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে বক্তৃতা প্রদানকালে এলিজাবেথ ক্যাডিস্টেন্টন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘অদ্যাবধি নারীরা পুরুষের প্রতিধ্বনি মাত্র। আমাদের আইন ও সংবিধান, আমাদের মতবিশ্বাস ও নীতিমালা, সামাজিক জীবনের রীতিনীতি সবকিছুই পুরুষ উৎসজাত। যথার্থ নারী আজও একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আর বাস্তবের নারী-পুরুষ প্রণীত পুরাণ।’

পুরুষের একটি অতি প্রচলিত বিশ্বাস যে, নারী সব সৌন্দর্যের আধার। এই ধরাধামে যা কিছু সুন্দর, সবই তার অধিকারভুক্ত। সে সৃষ্টির মুকুট, শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। এই শৈল্পিক স্তাবকতা রোমান্টিক পুরুষের কল্পনায় নারীর অবস্থানের সাক্ষ্য দেয়। এই স্তব কল্পনানির্ভর, খেয়ালি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। চিত্রকর্মে নারীর অবস্থান সর্বাগ্রে।

বুক অব জেনেসিস পুরুষের একটি হাড় থেকে নারী সৃষ্টির ধারণাটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ‘কতিপয় গুণের ঘাটতির কারণে নারী হয়েছে নারী’ বলেছেন অ্যারিস্টটল। প্লেটো ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছেন- তাকে নারী হিসেবে সৃষ্টি না করার জন্য। করিনথিয়ানদের উদ্দেশে লেখা বক্তব্যে জন পল বলেছেন, ‘প্রত্যেক পুরুষের প্রভু খ্রিস্ট আর প্রত্যেক নারীর প্রভু হলো পুরুষ।’

কীভাবে নারী অধস্তনতার সূচনা হয়েছিল? কেবল এ কারণেই কি প্রকৃতিগতভাবে নারী দুর্বল, তার বাহুবল কম, কম তার শারীরিক শক্তি, সে অপেক্ষাকৃত ধীরে চলে, অপেক্ষাকৃত কম ভার বইতে পারে, কদাচিৎ পুরুষের সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, কোনো যুদ্ধে সে পুরুষের সঙ্গে দাঁড়াতে পারে না? এসব দুর্বলতার যোগফলই কি তার নতজানু নিষ্কৃতির মূল কথা? এ জন্যই কি নারী চিরবন্দিত্ব ভোগ করছে?

কিন্তু পুরুষদের নিজেদের ভেতর তো পৈশিক সামর্থ্যরে তারতম্য আছে। তাই বলে তা তো তাদের মধ্যে অবস্থার তারতম্যের নিয়ামক হচ্ছে না। তা ছাড়া যে মস্তিষ্ক আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে, তাতে নারী-পুরুষ তারতম্যের বিষয়টি বিজ্ঞান স্বীকার করে না। তাই নারী অধস্তনতার কারণ খুঁজতে হবে সমাজব্যবস্থার অসম বিকাশের মাঝে।

পরিবারের মধ্যে স্বামী বুর্জোয়া এবং স্ত্রী প্রলেতারিয়েতের প্রতিনিধিত্ব করে। সময় এসেছে নারী-পুরুষের আন্তঃসম্পর্কের বিষয়গুলো নতুন আঙ্গিকে ভেবে দেখার। ভোর হয়নি, আজ হলো না, কাল হবে কিনা তা-ও জানা নেই। তবে এ কথা সত্য, পরশু ভোর ঠিকই আসবে। সে ভোরের আলো দেখার প্রত্যাশায় নারী-পুরুষ উভয়ে হাতে হাত রেখে চলো সবে গাই ‘সনাতন জীর্ণ কুআচার, চূর্ণ করে জাগো জনগণ, ঘুচাও এ দৈন্য হাহাকার, জীবন মরণ করে পণ।’

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত