জাতিসংঘ মহাসচিবও যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে!

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৩, ০২:১৬ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ফাঁস হওয়া নথিসূত্রে এবার বেরিয়ে এলো এক বিস্ফোরক তথ্য। ফাঁস হওয়া ‘অতি গোপনীয়’ নথি বলছে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ওপরও গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অনলাইনে ফাঁস হওয়া নথি থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রাশিয়ার স্বার্থ মেটাতে খুবই আগ্রহী ছিলেন বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। ওইসব নথি থেকে বোঝা গেছে, গুতেরেসের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়েছে ওয়াশিংটন। বেশ কয়েকটি নথিতে গুতেরেস ও তার সহকারীর একান্ত ব্যক্তিগত কথোপকথনেরও বর্ণনা রয়েছে। গুতেরেসকে যে ওয়াশিংটন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে নথিগুলো তা-ই প্রমাণ করে। নথিগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধ ও কয়েকজন আফ্রিকান নেতার সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিবের কথোপকথনের বিষয়েও পর্যবেক্ষণ রয়েছে। 

গোপন নথিতে ‘জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায়’ রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে হওয়া কৃষ্ণসাগর শস্য চুক্তির কথা বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের আশঙ্কায় গত বছরের জুলাইয়ে জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় ওই চুক্তি হয়। বিবিসি বলছে, ফাঁস হওয়া নথিতে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, চুক্তিটি টেকাতে বেশ আগ্রহী গুতেরেস। এমনকি, এ জন্য তিনি রাশিয়ার স্বার্থ ঘেঁষে চলতেও প্রস্তুত ছিলেন। চুক্তির স্বার্থে রাশিয়ার রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চেয়েছিলেন গুতেরেস। নথির পর্যবেক্ষণ বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গুতেরেসের কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ‘ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর জবাবদিহির বিষয়টিকে আড়াল করে দিয়েছে। তাছাড়া, বিশ্বের শীর্ষ এ কূটনীতিক মস্কোর প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোয় জাতিসংঘের অনেক কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছেন।

তবে ফাঁস হওয়া এসব নথি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মহাসচিবের পদক্ষেপ সম্পর্কে জাতিসংঘের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ‘যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব যেন গরিব দেশগুলোর ওপর না পড়ে, গরিব দেশগুলো যেন প্রয়োজনীয় খাবার ও সার পায় সেটি নিশ্চিতেই শস্য চুক্তি নিয়ে এতটা তৎপর ছিলেন গুতেরেস।’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিশ্ব আসরের একজন শীর্ষ কূটনীতিকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের নথিতে অসন্তুষ্ট জাতিসংঘের অধিকাংশ কর্মকর্তা। তাদের দাবি, জাতিসংঘ মহাসচিব যুদ্ধে মস্কোর বিরুদ্ধে তার স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করে আসছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, মধ্য ফেব্রুয়ারির আরেক নথিতে গুতেরেস ও তার সহকারী আমিনা মোহাম্মদের খোলামেলা কথাবার্তার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। আমিনার সঙ্গে গুতেরেস ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন দার লিয়েনকে নিয়ে কথা বলেছিলেন। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করার পর উরসুলা বলেছিলেন, ইউরোপের উচিত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো। সহকারীর (আমিনা) সঙ্গে কথোপকথনে গুতেরেস মন্তব্য করেন, উরসুলার এমন সিদ্ধান্তে তিনি ‘হতাশ’। অপরদিকে আমিনা মোহাম্মদ গুতেরেসকে আফ্রিকার নেতাদের একটি সম্মেলনের কথা বলেন। তিনি জানান, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুতো ‘দয়ামায়াহীন’ এবং তাকে তিনি ‘বিশ্বাস করেন না।’

বিবিসি বলছে, জাতিসংঘের ওপর নিয়মিত নজরদারি চালায় এমন দেশগুলোর মধ্যে যে যুক্তরাষ্ট্রও আছে, তা মোটামুটি সবারই জানা। কিন্তু তাদের সে নজরদারির বিষয়টি যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন তা বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়, আর নজরদারি যদি হয় বিশ্বের নেতৃস্থানীয় কূটনীতিকের ওপর, তাহলে তা সম্ভাব্য ক্ষতিও ডেকে আনতে পারে।

বিবিসি যে নথিগুলো যাচাই করতে পেরেছে, প্রথমে সেগুলোর স্ক্রিনশট গেমারদের কাছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ডে পোস্ট করা হয়, পরে তা অন্যান্য মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। গত বুধবার ডিসকর্ড জানায়, নথি ফাঁসের তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করছে তারা। বুধবারই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা মুখপাত্র জন কারবি বিবিসিকে জানান, ফাঁসের আদ্যোপান্ত বের করতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। তিনি বলেন, ‘ধারাবাহিক এই নথি ফাঁস বিপজ্জনক। কারা এর জন্য দায়ী, কেন ফাঁস হয়েছে, তা জানি না। আমরা জাতীয় নিরাপত্তায় এর প্রভাব খতিয়ে দেখছি, এ নিয়ে ফৌজদারি তদন্তও চলছে। আমরা এর শেষ দেখতে চাই। কারা, কেন করেছে তা বের করতে চাই আমরা।’

নথি ফাঁসের সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশ : যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসকারী ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম সিবিএস। গতকাল সিবিএস নিউজকে দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, সন্দেহভাজনের নাম জ্যাক টেক্সেইরা। তিনি একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে কাজ করতেন। গতকালই ম্যাসাচুসেটসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, ওই ব্যক্তি তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদানের প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ডের একটি গ্রুপে ওই গোপনীয় নথিগুলো শেয়ার করেন। গ্রুপটিতে থাকা দুই ডজন পুরুষ ও কিশোর নিজেদের মধ্যে ‘বন্দুক, সামরিক সরঞ্জাম ও ঈশ্বরের প্রতি পারস্পরিক ভালোবাসার কথা’ শেয়ার করতেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত